• বুধবার, জুন ২৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:০৫ দুপুর

ছাত্রদলের অভ্যন্তরীন বিরোধে বিপাকে সিলেটের নতুন মেয়র আরিফুল

  • প্রকাশিত ০৯:১৫ রাত আগস্ট ১৩, ২০১৮
মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত

অভ্যন্তরীন বিরোধে  গত ২৬ বছরে ১৩ নেতা কর্মী খুন, দলের সিনিয়র নেতারা পরামর্শ দিলেন ছাত্রদলকে এড়িয়ে চলার।

সিলেটে ছাত্রদলের বিদ্যমান বিরোধ ও সংঘাত নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ অবস্থায় দলের সিনিয়র নেতারা তাকে (আরিফ) ছাত্রদলকে এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। গত ২৬ বছরে সিলেটে অভ্যন্তরীন বিরোধে ছাত্রদলের ১৩ নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা । 

গত ১১ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আরিফুল হক চৌধুরীকে বেসরকারিভাবে মেয়র ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এ ঘটনার দুই ঘন্টার মাথায় আরিফুল হক চৌধুরীর কুমারপাড়ার বাসার সামনে খুন হন সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সহ-প্রচার সম্পাদক ফয়জুর রহমান রাজু। জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এখলাছুর রহমান মুন্না ও মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রকিব চৌধুরী দলের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধের জেরে রাজু খুন হয়েছেন বলে ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিলেট বিভাগ বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা জানান, সিলেটে ছাত্রদলের কর্মকান্ডে তারাও অনেকটা বিরক্ত। এখানে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের কার্যক্রম অনেকটা সীমা লঙ্ঘনের মতো। এ অবস্থায় মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে ছাত্রদলকে এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলে জানান এ নেতা। 

গত রবিবার ওসমানী মেডিকেল কলেজ মর্গ এলাকায় রাজুর ময়না তদন্ত চলাকালে রাজুর স্বজন ও ছাত্রদল নেতাদের তোপের মুখে পড়েন আরিফ। আরিফুল হককে দেখেই নিহত রাজুর চাচা দবির আলী কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, ‘আপনাদের প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার আমার ভাতিজা। আপনার ও খন্দকার মুক্তাদিরের (বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা) জিন্দাবাদ রাজনীতির শিকার সে। আমি অনেক ধৈর্য্য ধরেছি। আর পারছি না।’ এ সময় আরিফুল হক চৌধুরীকে বেশ বিমর্ষ দেখা যায়। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ভাইরালও হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। 

সংবাদ মাধ্যমের সাথে আলাপকালে নবনির্বাচিত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, হত্যাকারী যেই হোক, তাকে গ্রেফতার করতে হবে। অবশ্য, তিনি এও বলেছেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল তার বিজয়কে কলুষিত করতে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। 

ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে

ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা জানান, কোনো ধরণের সম্মেলন কিংবা কাউন্সিল ছাড়াই গত ১৩ জুন সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। আলতাফ হোসেন সুমনকে সভাপতি ও দেলোয়ার হোসেন দিনারকে সাধারণ সম্পাদক করে সিলেট জেলা এবং সুদীপ জ্যোতি এষকে সভাপতি ও ফজলে রাব্বী আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে সিলেট মহানগর ছাত্রদলের আংশিক কমিটি গঠন করা হয়। রমজানের শেষ সময়ে কমিটি ঘোষণার পরই সিলেট ছাত্রদলে তুমুল ক্ষোভ উত্তেজনা দেখা দেয়। কমিটিকে টেকাতে নগরীতে নামে বিদ্রোহীরা। নবগঠিত কমিটির নেতৃবৃন্দ যাতে নগরীতে নামতে না পারে সেজন্যে পদ বঞ্চিত বিভিন্ন বলয়ের নেতাকর্মীরা এক প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ান। তারা কমিটির বিরুদ্ধে নানা কর্মসূচী পালন করেন। কমিটি ঘোষণার পরদিন ১৪ জুন কমিটির পদবীধারী ৯ নেতা তাদের পদ থেকে পদত্যাগ করে কমিটি দ্রুত বাতিলের দাবী জানান। তাদের অভিযোগ, বিএনপি চেয়ারপার্সনের এক উপদেষ্টার মদদে মৎস্য ব্যবসায়ী, অছাত্র, বখাটেদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। যা কখনো সিলেট ছাত্রদল মেনে নেবে না। একটি সূত্র জানায়, সিলেট ছাত্রদলে বর্তমানে ১৫টি দলে সক্রিয় রয়েছে। 

আমির খসরুর প্রেস ব্রিফিং বাতিল এবং....

সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে গত ৯ জুলাই দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সিলেটে আসেন। সিলেটে এসে ঐদিন বিকেলে উপশহর পয়েন্টস্থ অভিজাত হোটেলে প্রেস ব্রিফিং-এর আয়োজন করে বিএনপি। এতে আমির খসরুর বক্তব্য দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছাত্রদলের পদ বঞ্চিতরা হোটেলের বাইরে সংঘাতে জড়ালে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সেখানে ছুটে যায়। এসময় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের হামলায় কমিটি দলের দুজন আহত হন। চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসময় কোনোমতে বিদ্রোহীদের কাছ থেকে রক্ষা পান। পরে প্রেস ব্রিফিং হোটেলের পরিবর্তে আরিফের বাসায় করেন আমির খসরু। 

আকরামের শেষ চেষ্টা

সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন চলাকালে আমির খসরুর সামনে সংঘটিত এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নড়েচড়ে বসে। ১৪ জুলাই শনিবার ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান সিলেটের পদবঞ্চিত বিদ্রোহী নেতাদের নিয়ে রাজধানী ঢাকায় বৈঠকে বসেন। বৈঠকে বলা হয়, ৩০ জুলাই সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর সিলেট ছাত্রদলের সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। সিটি নির্বাচনে দলের প্রার্থীর পক্ষে সকলকে মাঠে নামতে হবে। আকরামের নির্দেশের পরও অনেক নেতাকে নির্বাচনের মাঠে দেখা মিলেনি। তবে দলভিত্তিক রাজনীতিতে সকল দলই ছিল সক্রিয়। এ অবস্থায় শনিবার রাতে নিজ দলের কর্মীদের হাতে খুন হন রাজু। রাজুর সুরতহাল প্রতিবেদনে ৩৫টি আঘাতের কথা বলা হয়েছে। মাথার পেছনে, দু’হাতে, পায়ে, কানে, কপালসহ অসংখ্য স্থানে আঘাত আর আঘাত। পুলিশের এক কর্মকর্তা  নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আঘাতের ধরণ না দেখলে বুঝানো যাবে না, কত নির্মমভাবে রাজুকে খুন করা হয়েছে।

২৬ বছরে ১৩ নেতা-কর্মী খুন

নিজেদের মধ্যে বিরোধের জের ধরে  গত ২৬ বছরে সিলেটে ছাত্রদলের ১৩ নেতা কর্মী খুন হয়েছেন। জন্মলগ্ন থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত সিলেটে ছাত্রদলে কোন বিরোধ ছিলো না। বিএনপি পুণরায় ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯১ সাল থেকে বিরোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ওই বছর ছাত্রদলের অভ্যন্তরিণ দ্বেষে বিশ্বনাথ কলেজে বিধান নামে এক কর্মী খুন হন। এরপর সিলেট মহানগরীসহ গোটা জেলায় টানটান উত্তেজনা দেখা দেয়। ঘটতে থাকে সংঘাত সংঘর্ষ। বাড়তে থাকে হতাহতের  সংখ্যা। জাসদ ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা দলে দলে ছাত্রদলে যোগদানের পর সিলেটে যে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিলো তার রেশ এখনো চলছে। 

সিলেটে এখনো ছাত্রদলের একাধিক দল রয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রদলের অভ্যন্তরীন কোন্দলের কারণে সংঘর্ষের ঘটনা কমে এলেও খুন হয়েছেন একাধিক নেতা কর্মী। সর্বশেষ গত শনিবার খুন হন ফয়জুর রহমান রাজু। গত ১ জানুয়ারী সিলেটে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর শোভাযাত্রায় ধাক্কাধাক্কির জের ধরে আবুল হাসনাত শিমু (২৫)  নামের এক ছাত্রদল নেতা খুন হন। এর আগে ২০১৪ সালের ২৭ জুন নিজ দলের ক্যাডারদের হামলায় নিহত হন জিল্লুল হক জিলু  নামের মহানগর ছাত্রদলের এক নেতা। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে নগরীর শিবগঞ্জে নিজ দলের ক্যাডারদের হামলায় খুন হন ছাত্রদল নেতা সজিব আবদুল্লাহ। একই সালের ২২শে মার্চ ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে খুন হন ছাত্রদল নেতা মাহমুদ  হোসেন শওকত।  ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিপক্ষ দলের হামলায় খুন হন ছাত্রদল কর্মী সৌরভ। ওই বছরের  ৬ মে নগরীতে অভ্যন্তরিন কোন্দলে মারা যান ছাত্রদল কর্মী সাজু আহমদ।  ২০০৫ সালের ১৪ জুলাই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যন্তরিন বিরোধের জের ধরে প্রাণ হারান ছাত্রদল নেতা রফিকুল ইসলাম লিটন। সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অনার্সের শেষ পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার সময় নিজ দলের প্রতিপক্ষের নেতা কর্মীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করে। 

এছাড়া, ১৯৯৩ সালের ২৩ মে সরকারী কলেজে দুলাল, ১৯৯৪ সালে এনামুল হক মুন্না, ১৯৯৫ সালে মুরাদ চৌধুরী সিপার ও মুহিন খান নিহত হন।