• বুধবার, জুলাই ১৭, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৩৬ রাত

অশ্রুসজল চোখে রোহিঙ্গাদের ঈদ উদযাপন

  • প্রকাশিত ০৫:৫২ সন্ধ্যা আগস্ট ২২, ২০১৮
rohingya
কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা শরনার্থীরা ঈদ-উল-আযহার নামাজ শেষে মোনাজাতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ছবি- রয়টার্স

‘গত বছর কোরবানির ঈদের নামাজ আদায় করতে পারিনি। আজকের এই দিনে আমরা ছিলাম রাখাইনের একটি পাহাড়ি জঙ্গলে। তবে কোরবানির মাংস খেতে না পারলেও ভাল লাগছে। কারণ, বাংলাদেশে এসে অন্তত ভাল করে ঈদের নামাজটি আদায় করা সম্ভব হয়েছে’

নিজ দেশের বাইরে প্রথমবার কোরবানির ঈদ কাটল রোহিঙ্গাদের। গত বছর এই সময়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর বর্বর নির্যাতনের মুখে রোহিঙ্গারা দেশের সীমানা পেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে আসে বাংলাদেশে। রোহিঙ্গা নিধনের সময়ে কেউ হারিয়েছেন স্বজন, কেউ আবার ধর্ষিতা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন । সহায় সম্বল হারানো এসব রোহিঙ্গারা এখন আশ্রয় নিয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে। 

বর্বর নির্যাতনের শিকার এসব রোহিঙ্গারা আজ ঈদুল আযহার ঈদ আদায় করেছে অশ্রুসজল চোখে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঈদের নামাজ আদায়ের পর কাঁন্নায় ভেঙ্গে পড়েন অধিকাংশ ইমাম ও মুসল্লিরা। মসজিদগুলোতে মোনাজাতে অংশ নেয় হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠি। নিরাপদ প্রত্যাবাসন ও মর্যাদার সাথে রাখাইনে যেন তারা ফিরে যেতে পারে তা মোনাজাতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। অপ্রতুল সংখ্যক গরু কোরবানি দেওয়ার কারণে ঈদে পরিমাণ মত মাংসও পায়নি এসব রোহিঙ্গারা। এজন্য তাদের অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেন।

উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আয়ুব আলী মাঝি জানান, ‘আজকে ঈদের নামাজ শেষে শুধু ইমাম, মৌলভীরা নয়, মসজিদে উপস্থিত কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নাই। রাখাইনে আমরা কেউ বাবা-মা, বোনকে হারিয়েছি, আবার কেউ ভাই ও স্বজনকে হারিয়েছি। কবরে পড়ে রয়েছে আমার মা। অন্তত তাদের জন্য হলেও কিছু একটা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।  কারণ, গত এক বছর হয়ে যাচ্ছে আমরা বাংলাদেশে এসেছি। এখনও পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কোন সংস্থা আমাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি’।

কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং টিভি টাওয়ার সংলগ্ন বটতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, ‘এক ব্যক্তি আমাদের দুই মাঝির জন্য একটি ছোট কোরবানির পশু দান করেছেন। এই পশু জবাইয়ের পর আনুমানিক ৮০ কেজি মাংস পাওয়া যায়। এসব মাংস গুলো প্রায় ৪শ’ পরিবারের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হয়। এতে প্রতি পরিবার আড়াই শ’ গ্রাম করে পেয়েছে’।

একই ক্যাম্পের আরেক রোহিঙ্গা মাঝি মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘গত বছর কোরবানির ঈদের নামাজ আদায় করতে পারিনি। আজকের এই দিনে আমরা ছিলাম রাখাইনের একটি পাহাড়ি জঙ্গলে। তবে কোরবানির মাংস খেতে না পারলেও ভাল লাগছে। কারণ, বাংলাদেশে এসে অন্তত ভাল করে ঈদের নামাজটি আদায় করা সম্ভব হয়েছে’।

ক্যাম্পে ঈদের জামায়াতে রোহিঙ্গা মুসল্লিরা। ছবি- প্রতিনিধি

উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মোহাম্মদ লালু মাঝি জানান, ‘রাখাইনে নির্যাতনের শিকার হলেও নিজ দেশের জন্য মায়া হয় আমাদের। আমরা চাই নিরাপদে রাখাইনে ফিরে যেতে। আজকে ঈদ জামায়াত শেষে আল্লাহর কাছে এই ছিল প্রার্থনা। কারণ, এই ছোট পরিসর আমাদের কাছে বিষাদের হয়ে উঠেছে। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। নেই আনন্দ উপভোগ করার কোন অবস্থা’।

উখিয়ার কুতুপালং মধুরছড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ৮ নম্বর ব্লকের বাসিন্দা খালেদা বেগম কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, ‘রাখাইন থেকে পালিয়ে আসার সময় আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি। আজ তিনি নেই। এই প্রথম আমার বাবাকে ছাড়া ঈদ করলাম। তাও নিজ দেশে করতে পারলাম না। আল্লাহ কেন আমাদের প্রতি এত অবিচার করেন’।

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গা যুবক আবু তাহের বলেন, ‘কোরবানির ঈদে আমরা খাওয়ার পরিমাণ কিছু মাংস পেলেও ক্যাম্প-১ এর সি-ব্লকের রোহিঙ্গারা মাংস বলতে চোখেও দেখেনি। কোন এনজিও এবং সংস্থা সেখানে গরুর মাংস বিতরণ করেনি’।

উৎসবের এই দিনে বৃষ্টি ভেজা সকালে ক্যাম্পে অবস্থিত ছোট মসজিদগুলোতে গাদাগাদি করে ঈদের নামাজ আদায় করেন রোহিঙ্গা মুসল্লিরা। নামাজ শেষে ঈদের জন্য বিতরণ করা পশুগুলো জবাই করা হয়।

কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনজার্চ মো: রেজাউল করিম জানান, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত এনজিওগুলোর রোহিঙ্গাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ কোরবানির পশু দান করার কথা ছিল। ধারণা করছিলাম যে, প্রতি রোহিঙ্গা পরিবার অন্তত ২ কেজি করে মাংস পাবে। কিন্তু, সময় মতো এনজিওগুলো কোরবানির পশু বিতরণ করতে পারেনি। যেসব এনজিও কোরবানির পশু দান করেছে তা অপ্রতুল। বেশী ছোট আকারের গরু হওয়ায় রোহিঙ্গাদের মাংস বিতরণে হিমশিম খেতে হয়েছে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নিকারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘এবারের কোরবানির ঈদ হচ্ছে দেশের বাইরে রোহিঙ্গাদের প্রথম কোরবানির ঈদ। কিন্তু, রোহিঙ্গাদের মাঝে যেভাবে কোরবানির পশু বিতরণ হওয়ার কথা ছিল, আমরা সেভাবে পারিনি। এর কারণ, এনজিওগুলোর কাছ থেকে তেমন কোনও সাড়া পাওয়া যায় নি। এরপরও আমরা সাধ্য মতো চেষ্টা করেছি’। 

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো: কামাল হোসেন বলেন, ‘আজকের কোরবানির ঈদে রোহিঙ্গাদের মধ্যে যথা সম্ভব মাংস বিতরণ করা হয়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত বিভিন্ন এনজিও, সংগঠন থেকে ও ব্যক্তিগত ভাবেও কোরবানির পশু দান করা হয়েছে। পশুগুলো কোরবানির নামাজের পর পরই জবাই করে পরিমাণ মত মাংস বিতরণ করা হয়েছে। তবে যেভাবে দেয়ার কথা ছিল, সেভাবে সম্ভব হয়ে উঠেনি’।

কক্সবাজারের ৩০টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এক হাজার ২০টি মসজিদ ও ৫৪০টি নুরানী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও টেকনাফের নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৫টি, অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৪৫টি ও ২০টি নুরানী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব মসজিদ ও নুরানী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঈদের জামায়াত আদায় করেছেন মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।