• শনিবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩২ রাত

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিত যাত্রার ১ বছর

  • প্রকাশিত ১১:৩১ সকাল আগস্ট ২৫, ২০১৮
File photo of Kutupalong Rohingya Refugee camp in Ukhiya, Cox's Bazar
উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ফাইল ফটো। ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন

‘প্রত্যাবাসন কি আমরা জানি না। তবে আমরা টেলিভিশন ও রেডিও’র খবরে শুনেছি যে যত দ্রুত সম্ভব আমাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিবে। কিন্তু, কখন, কিভাবে, কোন সময়ে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে এর সঠিক কোন খবর কেউ দিতে পারেন না’।

অনিশ্চিত যাত্রা নিয়ে বাংলাদেশে পাড়ি দেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিদের মাঝে এখনও অনিশ্চিয়তা কাটছে না। আজ (২৫ আগস্ট) ভিন দেশের মাটিতে পাহাড়ি ঝুপড়ি ঘরে তাদের এক বছর পূর্ণ হলো। গত এক বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসন আদৌ হবে কিনা জানে না কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পে নিয়োজিত দাতা সংস্থা, এনজিও, রোহিঙ্গা নেতা এবং সরকারি কোন সংস্থাদের কাছ থেকেও প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কোন সূ-উত্তর পাওয়া যায়নি। এরপরও নিরাপদ আশ্রয়, নিজের ভিটে বাড়ি ফিরে পেলে এবং নাগরিকত্ব নিশ্চিত হলে খুব দ্রুত ফিরতে চায় রোহিঙ্গারা।    

গত বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার পর বাস্তুহারা রোহিঙ্গারা প্রাণ ভয়ে আশ্রয়ের জন্য পালিয়ে আসে বাংলাদেশে। এই পর্যন্ত নতুন করে যোগ হওয়া ৭লাখ রোহিঙ্গাসহ  নিবন্ধনকৃত রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১১ লাখ ১৬ হাজার ৪১৭জন। যারা অবস্থান করছেন কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ১২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।

গত এক বছরে বিশ্বের নানান দেশের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, ইউরোপিয়ন ইউনিয়ন, ওআইসি থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদল একাধিকবার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। সর্বশেষ পরিদর্শনে আসেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এবং বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। কিন্তু, বিশ্বের মহা ক্ষমতাবান নেতা আর বড় নেতারাদের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের পরও ভাগ্য ফিরেনি মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের। 

শুক্রবার (২৪ আগস্ট) বিকালে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৫ ব্লকের বাসিন্দা হামিদা বেগম (৪৫) রাখাইনে তার দু:সহ স্মৃতির কথা বর্ণনার এক পর্যায়ে বলেন, ‘আমার দেশ মিয়ানমার। আমরা মিয়ানমারের পূর্ণ নাগরিকত্ব চাই। চাই জীবনের নিরাপত্তা। নিজ দেশে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে চাই। সন্তানদের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চাই। এসব সুবিধা নিশ্চিত করলে আমরা দ্রুত মিয়ানমারে ফিরে যাব। না হয় বাংলাদেশেই জীবন দিয়ে দিব’।

প্রত্যাবাসনের বিষয়ে জানতে চাইলে উখিয়ার মধুরছড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-২ ব্লকের সিরাজ মিয়া বলেন, ‘প্রত্যাবাসন কি আমরা জানি না। তবে আমরা টেলিভিশন ও রেডিও’র খবরে শুনেছি যে যত দ্রুত সম্ভব আমাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিবে। কিন্তু, কখন, কিভাবে, কোন সময়ে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে এর সঠিক কোন খবর কেউ দিতে পারেন না’।

 উখিয়ার টিভি টাওয়ারের পশ্চিমে বটতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ-১ ব্লকের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, ‘মিয়ানমারের কথা বিশ্বাস করতে নেই। তারা ধোকাবাজ। আজ এক কথা, আবার পরে আরেক কথা। মুহুর্তে তাদের রূপ পাল্টায়। আন্তর্জাতিক মহলের এত চাপের মুখেও তারা এখনও মাথা নত করেনি। আমার বিশ্বাস হয় না যে তারা আমাদের ফিরিয়ে নিবে। যদি আমাদের ফিরেও নেয়া হয়, তাহলে নাগরিকত্ব তো দূরের কথা, রাখাইনে ক্যাম্পের মধ্যেই বন্দি জীবন কাটাতে হবে আমাদের’। 

উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা আবুল ফয়েজ মাঝি বলেন, ‘আজ এক বছর কেটে যাচ্ছে, আমাদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন দেখছি না। রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এত মানুষ মারল অথচ তাদের কোন বিচার হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আজ অনেকটা নিরব’।

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ষাটোর্ধ রোহিঙ্গা বৃদ্ধা নারী রজিমা খাতুন বলেন, ‘রাখাইনের দীর্ঘ জীবনে এত ভয়াবহতা আর কখনও দেখিনি। মিয়ানমারের দু:সহ স্মৃতি মনে হলে বাকি জীবনটা এই ঝুপড়ি ঘরে কাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। এরপরও নিরাপদ পরিবেশ ও নাগরিকত্ব পেলে আমার দেশে ফিরে যাব। কারণ, অন্তত কবরটি আমার দেশে পাব’।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো: কামাল হোসেন জানান, ‘রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের তরফ থেকে সব ধরণের প্রস্তুতি রয়েছে। তবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, জীবিকা, অবাধ চলাচল, শিক্ষা সহ এক নাগরিকের যে মৌলিখ অধিকার গুলো রয়েছে, সেসব বিষয় গুলো করতে মিয়ানমার বিলম্ব করছে। অবশ্য, মিয়ানমারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে মিয়ানমারের একটি দল বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন এবং দ্রুত অনুকুল পরিবেশ তৈরী হলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে’।