• বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪০ রাত

বাবা কমলা নিয়ে আর এলো না

  • প্রকাশিত ১১:২৩ সকাল জানুয়ারী ২৬, ২০১৯
ক্যাপশন :  কুমিল্লার ঘোলপাশা ইউনিয়নে ট্রাক উল্টে নিহত শ্রমিক কনকের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। ছবি : ঢাকা ট্রিবিউন
ক্যাপশন : কুমিল্লার ঘোলপাশা ইউনিয়নে ট্রাক উল্টে নিহত শ্রমিক কনকের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। ছবি : ঢাকা ট্রিবিউন

কাঁদতে কাঁদতে বন্যা বলছিল, ‘বাবা মরি গেইছে, হামার এলা সংসারের খরচ, মোর আর ভাই এলা স্কুলোত পড়িমো কেমন করি।'

স্বামী হারানোর শোক আর সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তায় দিশেহারা কনক চন্দ্র রায়ের (৩৫) স্ত্রী ববিতা রাণি রায়। শুধু তাই না।  কনকের বৃদ্ধ বাবা ধৌলু রায়ও (৭০) ছেলের মৃত্যুর সংবাদে প্রলাপ বকছেন। এই বয়সে ছেলে হারানোর ব্যাথা যেন মেনে নিতে পারছেন না তিনি। 

গতকাল শুক্রবার ভোরে কুমিল্লার ঘোলপাশা ইউনিয়নের নারায়ণপুর গ্রামে ইটভাটায় কয়লা ভর্তি ট্রাক উল্টে নিহত হয় ১৩ জন। তাদের একজন কনক। নিহতদের সবার বাড়ি নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার শিমুলবাড়ি এবং মীরগঞ্জ ইউনিয়নের ঘুঘুমারী ও পাঠানপাড়া গ্রামে। তারা অধিকাংশই শিক্ষার্থী ও যুবক।

কনকের ছয় বছরের ছেলে কৌশিক রায়। তার জন্য কমলালেবু নিয়ে আসার কথা ছিলো কনকের। কিন্তু আবদারের কমলা ছাড়াই বাবা যে অন্য বেশে ফিরবেন সেটি এখনো বুঝতে পারেনি সে।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মোবাইলে কনক কথা বলেছিলেন তার চতুর্থ শ্রেণী পড়ুয়া মেয়ে বন্যা রাণী রায়ের সঙ্গে। সে খাতা কেনার জন্য ৫০ টাকা চেয়েছিল। শুক্রবার বিকালে ওই টাকা পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি।  কিন্তু তার আগেই মৃত্যু হয় কনকের। 

কাঁদতে কাঁদতে বন্যা বলছিল, ‘বাবা মরি গেইছে, হামার এলা সংসারের খরচ, মোর আর ভাই এলা স্কুলোত পড়িমো কেমন করি।'

কনকের বড়ভাই বিনয় চন্দ্র রায় (৩৯) জানান, গত ১৮-২০ দিন আগে কুমিল্লার ইটভাটায় কাজ করতে যান কনক। তিনি বলেন,‘ভাই বাড়িতে ফিরছে ঠিকই। কিন্তু লাশ হয়ে ফিরবে সেটি কোনোভাবে মানতে পারছি না।’

দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে শিমুলবাড়ি ইউনিয়নের পাঠান পাড়ার নিজপাড়া গ্রামের দশম শ্রেণীর ছাত্র মনোরঞ্জন রায় (১৫)। তার ছোটভাই নির্মল চন্দ্র রায় জানায়, অভাব অনটনে দুই  ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাতে দিনমজুরীর কাজ করতে হয়। 

নিহতদের মধ্যে আরও রয়েছে শিমুলবাড়ি ঘুঘুমারী গ্রামের অমল চন্দ্র রায়ের ছেলে মনোরঞ্জন রায় (১৫), মৃত জগদীশ চন্দ্র রায়ের ছেলে মৃনাল চন্দ্র রায় (১৬), মীরগঞ্জ ইউনিয়নে নিজপাড়া কুড়ারপাড় গ্রামের কেশব চন্দ্র রায়ের ছেলে শঙ্কর চন্দ্র রায় (১৬), অমল চন্দ্র রায়ের ছেলে প্রশান্ত রায় দীপু (১৫), মানিক চন্দ্র রায়ের ছেলে তরুণ চন্দ্র রায় (১৫), কামিক্ষা রায়ের ছেলে অমিত চন্দ্র রায় (১৯), রাম প্রসাদ চন্দ্রের ছেলে বিপ্লব কুমার রায় (১৫)। মিরগঞ্জ ইউনিয়নের পাঠানপাড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে মো. সেলিম (১৫), নুর আলমের ছেলে মোরসালিন (১৮),  ফজলুল হকের ছেলে মো. মাসুম (১৬) ও রাজবাড়ি গ্রামের খোকা চন্দ্র রায়ের ছেলে বিকাশ চন্দ্র রায় (৩২)। 

শুক্রবার বিকালে সরেজমিনে দেখা যায় ওই দুই ইউনিয়নে নিহতদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। এলাকাবাসী জানায়, প্রায়ই কুমিল্লায় গিয়ে দিনমজুরীর কাজ করে তারা। 

শিমুলবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হামিদুল ইসলাম বলেন,'শিমুলবাড়ি এবং মীরগঞ্জ ইউনিয়ন দুটি পাশাপাশি। তাই দলবদ্ধভাবে তারা একই সঙ্গে কাজের সন্ধানে যায়। শুক্রবার সন্ধ্যায় বাড়িতে রওনা দেওয়ার কথা শুনেছি পরিবারে সদস্যদের কাছে। বাড়িতে আসার দিনও ঠিক রয়েছে। তবে তারা ফিরছে লাশ হয়ে।'  

মীরগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হুকুম আলী বলেন,‘নিহদের নয় জনই আমার ইউনিয়নের। তাদের মৃত্যুতে গ্রামে শোকের ছায়া নেমেছে।

নীলফমারী জেলা প্রশাসক (ডিসি) নাজিয়া শিরিন নিহত ১৩ শ্রমিক পরিবারের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানিয়ে বলেন, 'মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় আমি মর্মাহত। প্রতিটি পরিবারকে নীলফামারী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনকে নিহত শ্রমিকদের সঠিক তালিকা করতে বলা হয়েছে।'  

নাজিয়া শিরিন আরও জানান,এরই মধ্যে ১৩ শ্রমিক পরিবারের জন্য কুমিল্লা জেলা প্রশাসন থেকে ২০ হাজার করে টাকা নীলফামারীতে পাঠিয়েছেন।