• শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:৫৫ দুপুর

কক্সবাজারে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পন নিয়ে সন্দেহে স্থানীয়রা

  • প্রকাশিত ০৫:৪০ সন্ধ্যা ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৯
ইয়াবা
শনিবার সকালে কয়েকজন মূল হোতাসহ ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত শতাধিক লোক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এবং পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাভেদ পাটোয়ারির উপস্থিতিতে শনিবার টেকনাফ পাইলট হাইস্কুলে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পন করবেন। ছবি: মাহমুদ হোসাইন অপু/ ঢাকা ট্রিবিউন

শনিবার সকালে কয়েকজন মূল হোতাসহ ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত শতাধিক লোক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এবং পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাভেদ পাটোয়ারির উপস্থিতিতে টেকনাফ পাইলট হাইস্কুলে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পন করবেন

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় শতাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ীর আত্মসমর্পনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে পুলিশ কর্তৃপক্ষ। তবে, পুলিশের এই পদক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সন্দেহ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকালে কয়েকজন মূল হোতাসহ ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত শতাধিক লোক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এবং পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাভেদ পাটোয়ারির উপস্থিতিতে শনিবার টেকনাফ পাইলট হাইস্কুলে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পন করবে।

ইতোমধ্যে আইজিপি জাভেদ পাটোয়ারি ৩ দিনের সফরে বৃহস্পতিবার বিকালে কক্সবাজারে পৌঁছেছেন।

স্থানীয়রা কি বলছেন?

সম্প্রতি দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযানে ব্যাপক সংখ্যক মাদক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হওয়ায় প্রাণভয়ে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা আত্মসমর্পন করছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় জনগণ, মানবাধিকার কর্মী এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, প্রাণভয়ে আত্মসমর্পনের পর যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়া হয় তাহলে এইসব মাদক ব্যবসায়ীদের আবার এই অবৈধ পেশায় ফিরে আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এই ধরণের ঘটনা প্রতিরোধে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সমন্বয় করা অত্যন্ত প্রয়োজন প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।

টেকনাফের এক মাদ্রাসা ছাত্র আব্দুর রহিম বলেন, "এখন এইসব ইয়াবা ব্যবসায়ীরা প্রাণ যাওয়ার ভয়ে আত্মসমর্পন করছে। তাদের যদি উপযুক্ত শাস্তি না দেওয়া হয় তাহলে তারা আবার এই অপরাধমূলক ব্যবসায় ফিরে আসবে"।

তিনি আরো বলেন, "তরুণ ও খুচরা মাদক ব্যবসায়ীরা যদি দেখে যে আত্মসমর্পন করার পর তেমন কোন শাস্তি হচ্ছেনা তাহলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে"।

কুতুপালংয়ের বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী দোকানী জাহিদুল আলম জানান, তিনি আত্মসমর্পনের ব্যাপারে পুলিশের পদক্ষেপের কথা শুনলেও এর সাথে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কিংবা র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যা ব)  কোন সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা তা জানেন না।

তিনি বলেন,"আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো যদি নিজেদের মধ্যে সমন্বয় না করে তাহলে এই পদক্ষেপ বেশিদিন টিকবে না"।

কক্সবাজার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংক লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ম্যানেজারআশরাফুল আলম জানান, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পন নিয়ে স্থানীয় মানুষ সম্পূর্ণ ধোঁয়াশায় রয়েছে।

"কক্সবাজারের যুবসমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছে।তাই হঠাৎ করেই এই মাদক নির্মূল করার পর তখনকার পরিস্থিতিতে কি করা হবে সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কোন নির্দেশনা নেই। এ অবস্থায় ইয়াবাসক্ত তরুণ সমাজ নিজেরাই এই ব্যবসার সাথে জড়িত হয়ে পড়তে পারে", যোগ করেন তিনি।

পালংখালি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর এ প্রসঙ্গে বলেন,"ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অনেকেই অনেক টাকার মালিক হয়েছেন। তাই আবার সর্বস্ব হারানোর পর তারা আবার মাদক ব্যবসায় প্রলুব্ধ হতে পারে"।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমানও মাদক ব্যবসায়ীদের যথার্থ পূনর্বাসনের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, "গত বছর সুন্দরবনের জলদস্যূদের পূনর্বাসন প্রক্রিয়া একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে এ ব্যাপারে। এইসব মাদক ব্যবসায়ীদের যাতে পরবর্তীতে আবার পুরনো পেশায় না ফিরতে হয় তার জন্য কর্তৃপক্ষকেএকটি যুক্তযুক্ত অর্থনৈতিক সমাধান বের করতে হবে"।

মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন বলেন, জনসাধারণকে এই প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত না করলে এই পদক্ষেপ সফল হবেনা। মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পন এবং পুনর্বাসনের এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা না থাকায় এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কি বলছে?

পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (অ্যাডমিন) হাবিবুর রহমান জানান সমাজের প্রতিটি স্তরে মাদকের ব্যবহার কমাতে সরকারের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে মাদক ব্যবসায়ীদের এই আত্মসমর্পনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে সুফল বয়ে আনবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। 

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এসপি) ইকবাল হোসেন জানান, আত্মসমর্পনকারী মাদক ব্যবসায়ীদের তাদের বিরুদ্ধে পূর্বের দায়ের করা মামলার জন্য বিচারের আওতায় আনা হবে। এ ব্যাপারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকেও অবহিত করা হবে।

বিজিবি-২ এর মহাপরিচালক আসাদুজ্জামান চৌধুরী এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, "বন্দুকের ব্যবহারের বদলে আত্মসমর্পন কর্মসূচি মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা কমানো উত্তম"। তবে এই প্রক্রিয়ার সাথে এখনও বিজিবিকে সম্পৃক্ত করা হয়নি বলেও তিনি জানান।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) নজরুল ইসলাম বলেন,  কর্তৃপক্ষ পুলিশকে এই দায়িত্ব দেওয়ায় আত্মসমর্পন কর্মসূচিতে তাদেরকে যুক্ত করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, আত্মসমর্পন কর্মসূচিতে তাদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে তারা জানতে পেরেছেন। তবে, এই পদক্ষেপ সুদূরপ্রসারী ফলাফল নিয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

উল্লেখ্য, এর আগেও ২০১৭ সালে মাদক ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিয়েছিল পুলিশ। সেসময় তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাদেরকে একটি করে গবাদিপশু এবং অর্থনৈতিক সাহায্য দেওয়া হয়েছিল।

তবে, তাদের অনেকেই পরবর্তীতে আবার মাদক ব্যবসায় প্রত্যাবর্তন করেন।