• সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৫:১৫ সন্ধ্যা

রেলপথের জীর্ণ দশা, রেলমন্ত্রী আসছেন সড়ক পথে

  • প্রকাশিত ০৪:৫৯ বিকেল মার্চ ২২, ২০১৯
জরাজীর্ণ রেলপথ
২০১৭ সালের ১৪ আগস্ট বন্যার পানির স্রোতে কুড়িগ্রাম-তিস্তা রেলপথের টগরাইহাট রেল স্টেশনের কাছে বড়পুলের পাড় নামক স্থানে রেলের একটি সেতুর পায়ার দেবে গেলেও এখন পর্যন্ত ওই সেতুটির স্থায়ী সংস্কারে তেমন কোন উদ্যোগ এখনও পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন।

বন্যার পানির স্রোতে কুড়িগ্রাম-তিস্তা রেলপথের একটি সেতুর পায়ার দেবে গেলেও এখন পর্যন্ত ওই সেতুটির স্থায়ী সংস্কারে তেমন কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি

সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের উদ্যোগে কুড়িগ্রামে বেশ কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হলেও রেল যোগাযোগে তেমন কোন উন্নয়নের চিত্র লক্ষ্য করা যায়নি।

২০১৭ সালের ১৪ আগস্ট বন্যার পানির স্রোতে কুড়িগ্রাম-তিস্তা রেলপথের টগরাইহাট রেল স্টেশনের কাছে বড়পুলের পাড় নামক স্থানে রেলের একটি সেতুর (১৭জে/৪৫৫-০২) পায়ার দেবে গেলেও এখন পর্যন্ত ওই সেতুটির স্থায়ী সংস্কারে তেমন কোন উদ্যোগ এখনও পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। 

এদিকে, তিস্তা-কুড়িগ্রাম-রমনা রেলপথের জীর্ণ দশা দেখতে এবং রেল যোগাযোগ উন্নয়নে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে রেলমন্ত্রী অ্যাডভোকেট  নুরুল ইসলাম সুজন শুক্রবার কুড়িগ্রাম সফরে আসছেন।

তবে, দুর্দশাগ্রস্ত রেলপথের কারণে রেলমন্ত্রী আসছেন সড়ক পথে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোছা.সুলতানা পারভীন রেলমন্ত্রীর সড়ক পথে কুড়িগ্রাম সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, "রেলমন্ত্রী মহোদয় কুড়িগ্রামের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিদর্শনের জন্য আসছেন। তিনি সড়ক পথেই কুড়িগ্রাম আসছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কুড়িগ্রামের রেল যোগাযোগ উন্নয়নের জন্য মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে প্রস্তাবনা রাখবো"।

জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার রমনা থেকে জেলা সদর হয়ে তিস্তা ও রংপুরের সাথে রেল সংযোগ থাকলেও পঙ্গুত্বের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা রেলযোগাযোগ ব্যবস্থা জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় তেমন কোনও ভূমিকা রাখতে পারছে না। 

বিভিন্ন সময় রেল লাইন সংস্কার এবং চিলমারী হতে ঢাকা গামী ‘ভাওয়াইয়া এক্সপ্রেস’ ট্রেনের দাবিতে আন্দোলন ও একই দাবিতে রেলমন্ত্রণালয় বরাবর গণসাক্ষর জমা দেওয়া হলেও কোনও ফল পাওয়া যায়নি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও আজও বঞ্চিত রয়েছে জেলার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। অন্যদিকে রংপুর থেকে ঢাকাগামী রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের সাথে কুড়িগ্রামের সংযোগ স্থাপনকারী একটি শাটল ট্রেন দেওয়া হলেও কুড়িগ্রামের জন্য বরাদ্দকৃত আসন সীমিত থাকায় তার সুফলও ভোগ করতে পারছেনা জেলাবাসী।

কুড়িগ্রাম রেল স্টেশন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে কুড়িগ্রামে একটিমাত্র ট্রেন চলাচল করছে। এই একটি ট্রেন ভিন্ন নামে দুই বার কুড়িগ্রামে যাতায়াত করছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুর হতে সকালে একটি ট্রেন '৪২২ আপ' নামে কুড়িগ্রাম হয়ে চিলমারীর রমনা স্টেশনে গিয়ে '৪১৫ ডাউন' নামে সেটি আবার তিস্তা পর্যন্ত ফিরে যায়। এই ট্রেনটিই আবার তিস্তা থেকে '৪১৬ আপ' নাম ধারণ করে পূনরায় কুড়িগ্রাম হয়ে চিলমারীর রমনা স্টেশনে যায় এবং '৪২১ ডাউন' নামে রমনা স্টেশন থেকে কুড়িগ্রাম হয়ে পার্বতীপুর ফিরে যায়। কিন্তু তিস্তা থেকে চিলমারীর রমনা স্টেশন পর্যন্ত রেল পথের বেহাল দশার কারণে এই পথে বেশ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে ট্রেন। আর সময়মত ট্রেন যাতায়াত না করায় নানা ভোগান্তি আর বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। রেল লাইনের স্লিপার, পাথর এবং কোনও কোনও স্থানে মাটি ও গাইড ওয়াল সরে যাওয়ায় নির্ধারিত গতির চেয়ে অনেক কম গতিতে ট্রেন চলাচল করছে। ফলে কুড়িগ্রাম থেকে চিলমারীর রমনা স্টেশন পর্যন্ত মাত্র ৩৩ কিলোমিটার পথ যেতেই সময় লাগছে প্রায় পৌনে দুই ঘন্টা। 

দীর্ঘ সময় ধরে রেল লাইনের সংস্কার না হওয়ায় নষ্ট হয়ে যাওয়া স্লিপার ও পাথরের অভাবে রেলপথটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন।রেল স্টেশন সূত্রে আরও জানা গেছে, তিস্তা-কুড়িগ্রাম-রমনাবাজার সেকশনের ৫৬ কিলোমিটার রেলপথে ৮টি রেলওয়ে স্টেশন রয়েছে। এরমধ্যে তিস্তা থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার রেলপথটি ব্রিটিশ আমলে এবং কুড়িগ্রাম থেকে রমনা বাজার (চিলমারী) পর্যন্ত রেলপথটি ১৯৬৮ সালে নির্মিত হয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে রেল লাইনের সংস্কার না হওয়ায় নষ্ট হয়ে যাওয়া স্লিপার ও পাথরের অভাবে রেলপথটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এতে নির্দিষ্ট গতিতে ট্রেন চলাচলও করতে পারছে না। ফলে ট্রেনের সময় সূচী কোনও ভাবেই ঠিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের দেড়-দুই ঘন্টা পর ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে।

সূত্র জানায়, কুড়িগ্রাম হতে রংপুর মাত্র  ৫০ কি.মি সড়ক পথের বাস ভাড়া ৮০ টাকা। কিন্তু ট্রেনে এই ভাড়া মাত্র ১৫ টাকা। আর রমনা থেকে রংপুর রেল পথের ভাড়া মাত্র ২৫ টাকা। ফলে বিলম্ব হলেও দারিদ্রতার কারণে সাধারণ যাত্রীরা ঝুঁকি  নিয়েই ট্রেনে ভ্রমণ করতে বাধ্য হন। 

কুড়িগ্রাম থেকে পার্বতীপুর গামী '৪২১ ডাউন' ট্রেনের একজন সহকারী লোকোমাস্টার নাম প্রকাশ না শর্তে প্রতিবেদককে জানান, "তিস্তা থেকে রমনা পর্যন্ত রেল পথে পর্যাপ্ত পাথর নেই। অন্যদিকে কুড়িগ্রাম থেকে রমনা পর্যন্ত রেলপথে পাথর নেই বললেই চলে। এই রেলপথে মেয়াদোত্তীর্ণ স্লিপার ব্যবহার করা হয়েছে। রেল লাইনের সংযোগস্থলের ফিসপ্লেটে নেই প্রয়োজনীয় নাট বোল্ট। রেল লাইনও বিভিন্ন জায়গায় বাঁকা। আমরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চালিয়ে যাচ্ছি"।

রেলমন্ত্রীর সড়ক পথে কুড়িগ্রাম সফর নিয়ে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক দুলাল বোস বলেন, "এটা দুঃখজনক। রেলমন্ত্রী ট্রেন যোগে কুড়িগ্রাম আসতে পারতেন। অন্তত তিনি রেল পথে ট্রলি যোগে কুড়িগ্রামের রেলপথ দেখতে পারতেন। আসলে এই রেলপথ ঝুঁকিপূর্ণ জেনেই তিনি হয়তো সড়ক পথে কুড়িগ্রাম সফর করছেন। কিন্তু তিনি রেলপথে আসলে এই রুটের সমস্যা দেখার পাশাপাশি সমৃদ্ধ রেল যোগাযোগ তৈরিতে ভূমিকা   রাখতে পারতেন আর তাতে জেলাবাসী উপকৃত হতো"।

এদিকে রেলপথে না এসে মন্ত্রীর সড়ক পথে কুড়িগ্রাম সফর করার বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ে লালমনিরহাট বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।