• সোমবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩১ রাত

শিশুর লাশ নিয়ে চার ঘণ্টা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিনয়

  • প্রকাশিত ০৬:৩৬ সন্ধ্যা এপ্রিল ৯, ২০১৯
বগুড়া শিশু মৃত্যু
সোমবার বগুড়ার এই ক্লিনিকে অপারেশনের সময় এক শিশুর মৃত্যু ঘটে। ঢাকা ট্রিবিউন

অপারেশনের সময় শিশুটির মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে হাসপাতালে পুলিশ আসলে পালিয়ে যান চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্যরা।

বগুড়া শহরের সুত্রাপুর এলাকায় মালেকা নার্সিং হোমে টনসিল অপারেশনের সময় ৬ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। অপারেশনের বিল আদায় ও চার ঘণ্টা অভিনয়ের পর সোমবার রাত সাড়ে ৮ টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটির নিথর দেহ সিরাজগঞ্জের একটি হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। 

বাবা, মা ও স্বজনরা অন্য হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার চিকিৎসকরা শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। অতঃপর শিশুটির লাশ নিয়ে তারা মালেকা নার্সিং হোমে ফিরে আসেন। অবস্থা বেগতিক দেখে চিকিৎসক, নার্স ও ক্লিনিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাতি নিভিয়ে পালিয়ে যান। ঘটনা জানাজানি হলে স্থানীয় জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ক্লিনিকে ভাংচুর চালায়। রাত ১টার দিকে সদর থানা পুলিশ শিশুটির লাশ উদ্ধার করে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই ক্লিনিকে এর আগেও টনসিল এবং মুসলমানির অপারেশনের সময় আরও দু'টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের 'ম্যানেজ করায়' তাদের শাস্তি ভোগ করতে হয়নি।

জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার নলকা কায়েমগ্রামের কৃষক হারুনার রশিদের ৬ বছর বয়সী মেয়ের টনসিলে সমস্যা ধরা পড়লে গত শনিবার বগুড়া শহরের শেরপুর সড়কে সুত্রাপুর এলাকায় মালিকা নার্সিং হোমে আনা হয়। সেখানে তাকে দেখেন নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. সাইদুজ্জামান।

শিশুটির মামা আলমগীর তালুকদার জানান, ওই চিকিৎসক সোমবার বিকাল ৩টায় অস্ত্রোপচারের সময় নির্ধারণ করেন। ফি ধরা হয় সাড়ে ১১ হাজার টাকা। ওইদিন বেলা সাড়ে ১০টার দিকে শিশুটিকে ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়। বিকাল ৩টায় তাকে অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) নেওয়া হয়। 

বিকাল ৪টায় চিকিৎসক বাইরে এসে জানান, অপারেশন সাকসেসফুল। এরপর নার্সরা শিশুটিকে বেডে দিয়ে যায়। 

কিন্তু হৃদস্পন্দন বা শ্বাস-প্রশ্বাসের সাড়া না পাওয়ায় স্বজনদের সন্দেহ হয়। তারা চিকিৎসক ও নার্সদেরকে বিষয়টি জানালে তারা বলেন, রোগী ভালো আছে, শিগগিরই জ্ঞান ফিরবে। 

মৃত শিশুটির স্বজনরা জানান, আগে থেকেই অপারেশন ফি নিয়ে নেওয়া হয়। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত শিশুটির জ্ঞান না ফেরায় তারা অস্থির হয়ে ওঠেন। 

পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে চিকিৎসক জানান, রোগীর অবস্থা ভাল নয়, তাকে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হবে। 

এদিকে, সিরাজগঞ্জে নেওয়ার আগে স্বজনরা প্রথমে বগুড়া শহরের মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে এবং পরে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। শজিমেকের পর চিকিৎসক ইঙ্গিতে বোঝান শিশুটি মারা গেছে। 

এরপর লাশ নিয়ে মালেকা নার্সিং হোমে ফিরে আসেন স্বজনরা। ভুল অপারেশনে শিশু মৃত্যুর খবর জানাজানি হলে বিক্ষুব্ধ জনতা ক্লিনিকে ভাংচুর চালায়। এ সময় চিকিৎসক, নার্স, ক্লিনিকের ম্যানেজার বাতি নিভিয়ে পালিয়ে যান। কেউ কেউ ক্লিনিকের ভেতরেই লুকিয়ে থাকেন। খবর পেয়ে সদর থানা পুলিশ ক্লিনিকে আসে। 

তখন রাস্তায় দাঁড় করানো অ্যাম্বুলেন্সে শিশুটির নিথর দেহ পড়েছিল। পাশে বাবা-মা আহাজারি করছিলেন। 

শিশুর মামা আলমগীর তালুকদার বলেন, অপারেশনের সময় তার ভাগ্নির মৃত্যু হলেও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ চার ঘণ্টা তাদের সঙ্গে অভিনয় করেন। শিশুটি বেঁচে আছে; শিগগিরই জ্ঞান ফিরবে বলে ক্লিনিকের বিলও আদায় করে নেওয়া হয়। এরপর সবাই পালিয়ে যান। এমনকি রোগীর চিকিৎসার বিভিন্ন কাগজপত্র ও 'রেফার্ড লেটারও' গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।

রাত সাড়ে ১২টার দিকে সদর থানার ওসি এসএম বদিউজ্জামান এবং ওসি (তদন্ত) কামরুজ্জামান মিয়া ক্লিনিকে ঢোকেন। এ সময় তারা পুরো ক্লিনিক খুঁজে শুধু ইন্টার্ন চিকিৎসক রাফি হাসানকে পান। 

ডা. রাফি জানান, এ ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিরাজুল ইসলাম ও ম্যানেজার বেলাল হোসেন। তবে তিনি তাদের ফোন নম্বর জানেন না। তিনি রাতে কাজে আসার পর জানতে পেরেছেন, ডা. সাইদুজ্জামান এক শিশুর টনসিল অপারেশন করেছেন। শিশুর অবস্থা ভালো না হওয়ায় তাকে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। এর বাইরে তিনি কিছু জানাতে পারেননি। এনেসথেয়েটিস্ট কে ছিলেন তাও তিনি জানেন না। ফোন বন্ধ থাকায় ডা. সাইদুজ্জামান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাত ১টার দিকে সদর থানা পুলিশ শিশুর লাশ উদ্ধার করে। 

এ বিষয়ে ওসি এসএম বদিউজ্জামান ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, শিশুটির পরিবার মামলা দিলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশ চলে যাওয়ার পর ক্লিনিকের ভেতর লুকিয়ে থাকা চিকিৎসক ও অন্যরা দ্রুত বাইকে চেপে সরে পড়েন। তবে কিছু প্রভাবশালী ঘটনাটিকে চাপা দিতে ও ভুল অপারেশনকারী চিকিৎসক এবং অন্যদের বাঁচাতে তদবির করছিলেন।