• শুক্রবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৬ রাত

অধ্যক্ষ সিরাজের সমস্ত অপকর্মের ঢাল স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা

  • প্রকাশিত ০৪:১৬ বিকেল এপ্রিল ১১, ২০১৯
অধ্যক্ষ সিরাজ ফেনী
সোনাগাজীর মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

যখন যাকে দিয়ে যে অপকর্ম ঢেকে দেওয়া যায়, তখন তাকেই ব্যবহার করতেন অধ্যক্ষ সিরাজ।

ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সমস্ত অপকর্মে আড়াল থেকে সমর্থন ও মদদ দিয়ে যেত স্থানীয় একটি চক্র। এ চক্রে রয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের ১৫ জন প্রভাবশালী নেতা ও স্থানীয় প্রশাসন। 

যখন যাকে দিয়ে যে অপকর্ম ঢেকে দেওয়া যায়, তখন তাকেই ব্যবহার করতেন অধ্যক্ষ সিরাজ। এদের মাধ্যমেই দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তিনি মাদ্রাসা এবং মাদ্রাসার বাইরে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন। বিনিময়ে ওইসব নেতাকে নিয়মিতভাবে মাসোহারা কিংবাউপঢৌকন দিতেন সিরাজ।

সোনাগাজীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে । 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া নুসরাত জাহান রাফির ভাইয়ের দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কাউন্সিলর এবং মাদ্রাসা কমিটির সদস্য মোকসুদ আলম এবং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী আবদুল কাদের, নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীমসহ পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।

এদের মধ্যে আফছার উদ্দিন ও নুর উদ্দিনকে গ্রেফতার করা হলেও গা ঢাকা দিয়েছেন অভিযুক্তদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী কাউন্সিলর মকসুদসহবাকিরা।

নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পোড়ানোর পর মামলা হলেও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন সিরাজ উদ দৌলার অপকর্মের আরেক মদদদাতা হিসেবে পরিচিত মাদ্রাসা ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমীনসহ অন্যান্যরা। 

সূত্র আরও জানায়, নিজের অপকর্মগুলোকে বৈধতা দিতে উল্লেখিত চক্রের মাধ্যমে সোনাগাজীতে যখন যিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হয়ে আসেন তাকেই সুকৌশলে বশ করতেন সিরাজ। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদেরকে 'আগাম খেদমত' করতেন তিনি। আর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাজ ছিল সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ রক্ষা। 

অভিযোগ রয়েছে, এসবের বদৌলতে বিভিন্ন অজুহাতে এসব প্রভাব কাজে লাগিয়ে অপকর্মের প্রতিবাদকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হয়রানি করতেন সিরাজ। 

সিরাজকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ থাকা স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমীনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, অধ্যক্ষ সিরাজ একজন নষ্ট লোক। তিনি কখনোই তার পক্ষে ছিলেন না।

রাফিকে নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে সরব স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন আরেক আওয়ামী লীগ নেতা ও পৌর কাউন্সিলর মোকসুদ আলমের বিরুদ্ধে। তারা জানান,  গত ২৭ মার্চ নুসরাতের শ্লীলতাহানী ও গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করলে সিরাজের অনুগত লোকজনকে নিয়ে বাধা দেন মাকসুদ। মারধর করেন আরেক কাউন্সিলর মামুনকে।এতে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে সোনাগাজী সদরে আর কেউ প্রতিবাদ কর্মসূচি করতে সাহস পাননি। 

মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জানান, অধ্যক্ষের যে কোনও অপকর্মের দোসর তার দুই ছাত্র নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন।২০১৭ সালে একবার নুসরাতের গায়ে চুন ছুড়ে মেরেছিল নুর উদ্দিন।

ঘটনার পর গা ঢাকা দিয়েছে তারাও। মুঠোফোন বন্ধ থাকায় এসব অভিযোগের বিষয়ে তাদের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় শিক্ষকরা আরও জানান, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সিরাজের মদদদাতারাও এই বলয়ে সক্রিয়। তারা হচ্ছেন-  পৌর বিএনপি নেতা আলাউদ্দিন গঠন, জামায়াত নেতা গোলাম কিবরিয়া, ছালেহ আহমেদ ও মোহাম্মদ মোহসীন। বিভিন্ন সময়ে তাদের সহায়তায় নিয়েও অপকর্ম করে আসছিলেন সিরাজ। 

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা আলা উদ্দিন গঠন। তার দাবি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাদ্রাসার উন্নয়ন কাজে আমি হয়ত তাকে সহয়তা করেছিলাম। কিন্তু তার কোনও ধরনের অপকর্মে কখনোই আমার সমর্থন ছিল না। 

সোনাগাজী পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, মাদ্রাসার মালিকানাধীন দোকান ভাড়াসহ বিভিন্ন খাত থেকে প্রতি মাসে তিন লাখ টাকা আয় হয়। আয়ের বড় অংশ তার অনুগতদের জন্য ব্যয় করতেন সিরাজ।

এদের মধ্যে নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেনকে গ্রেফতার করতে পারলেই নুসরাতের ওপর হামলাকারী বোরকা পরা চারজনের পরিচয় এখনও খুঁজে পায়নি পুলিশ । 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসার এক শিক্ষক জানান, গত বছরের ৩ অক্টোবর অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা আলিম শ্রেণির আরেক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করেন। প্রতিকার চেয়ে মেয়েটির বাবা মাদ্রাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছে অভিযোগ দিয়েছিলেন। চিঠির অনুলিপি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছেও দেওয়া হয়। কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বরং যে তিনজন শিক্ষক অধ্যক্ষের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন তাদেরকেই কারণ দর্শানোর চিঠি দেন অধ্যক্ষ। ওই তিন শিক্ষক হলেন আরবি বিভাগের প্রভাষক আবুল কাশেম এবং জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বেলায়েত হোসেন ও মো. হাসান।

এ বিষয়ে আবুল কাশেম বলেন, মাদ্রাসার ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকতে অধ্যক্ষের কাছে তার ঘনিষ্ঠ লোকদের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু এতে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে আমাদের তিনজনের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর চিঠি দেন। ফলে তার অপকর্মের বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস পাই না। সে কারণেই তিনি রাফির সঙ্গেও এমন আচরণ করতে পেরেছেন।

সোনাগাজীর ইউএনও মো. সোহেল পারভেজ এ বিষয়ে ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, অধ্যক্ষ সিরাজের চরিত্র নিয়ে অনেক অভিযোগ উঠে আসছে।একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মামলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ পুলিশ তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেবে।

৬ এপ্রিল অগ্নিদগ্ধ ছাত্রী নুসরাতকে উদ্ধার করতে আসা দুজনের একজন হলেন মাদ্রাসার নৈশপ্রহরী মো. মোস্তফা। পুলিশের একজন সদস্যকে নিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন মোস্তফা। 

তিনি বলেন, অধ্যক্ষের কার্যালয় ছিল নিচতলায়। মেয়েদের সঙ্গে অশালীন আচরণের ঘটনা একাধিকবার আমার চোখে পড়েছে। বিষয়টি টের পেলে “সাপ ঢুকেছে, নিচতলার কার্যালয় নিরাপদ নয়”বলে পাশের ভবনের দ্বিতীয় তলায় তিনি কার্যালয় স্থানান্তর করেন।

ফেনীতে উম্মুল কুরা ডেভেলপার্স নামে কথিত একটি সমবায় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসাবে সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৪ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়।

আদালতে দায়ের হওয়া মামলায় (সিআর ৯৪/১৮) আদালত গত বছরের ১০ জুলাই তাকে কারাগারে পাঠান। পরে জামিনে মুক্ত হন তিনি। এছাড়া সিরাজের বিরুদ্ধে মাদ্রাসা তহবিলের ৪৩ লাখ টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে। ২০১৪ সালে নাশকতা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া এক মামলায় ২০১৭ সালে কারাভোগ করেছিলেন সিরাজ উদ দৌলা।