• রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৮ রাত

মাদ্রাসার বিশাল সম্পদের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ

  • প্রকাশিত ০৯:৩৭ রাত এপ্রিল ১১, ২০১৯
এস এম সিরাজ উদ দৌলা
নুসরাত হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলা। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

লোপাট করা মাদ্রাসার টাকা দিয়ে নিজের পোষা বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন বহিস্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ

নুসরাত হত্যা চেষ্টা মামলার প্রধান আসামি  সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলা ঐ মাদ্রাসার বিপুল সম্পদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় জনগণ এবং শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে এবং সরেজমিন অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে ফোকাস বাংলা জানিয়েছে।

জানা যায়, ফেনীর সোনাগাজী পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসাটি ঐ উপজেলার সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা। এমপিওভুক্ত এই মাদ্রাসার রয়েছে মার্কেট, পুকুর, জমিসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ। প্রাতিষ্ঠানিক ফি থেকে আয় ছাড়াও মাদ্রাসার সম্পদ থেকে প্রতি মাসে আসে লাখ লাখ টাকা। পরিচালনা কমিটির সঙ্গে আঁতাত করে অধ্যক্ষ সিরাজ এসব সম্পদের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন।

মাদ্রাসা থেকে প্রাপ্ত আয়ের টাকা লোপাট করে সেই টাকা দিয়ে পরিচালনা কমিটিকে হাত করার পাশাপাশি 'বেয়াদব' বলে পরিচিত কিছু জ্যেষ্ঠ ছাত্রকে নিজের অনুসারী হিসেবে গড়ে তোলেন সিরাজ। এসব ছাত্রদের ছাত্রাবাসে ফ্রি খাওয়ানো, নগদ টাকা দেওয়া, ফ্রি গাইড বইসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতেন তিনি।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, অধ্যক্ষ সিরাজ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর খোলস পাল্টে হন আওয়ামী লীগের সমর্থক। এরই ধারাবাহিকতায় মাদ্রাসায় একটি স্বঘোষিত ছাত্রলীগ কমিটি গঠন করেন তিনি। অন্যদিকে সুবিধা পেতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিকে মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেন বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ।  

এছাড়াও অবৈধ সুবিধায় পালন করা অন্তত এক ডজন সহযোগী আছে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজের। তাদের দিয়েই নিজের বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ধামাচাপা দেন তিনি। এদিকে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের চাপা দ্বন্ধ দেখা দেয়। এর সুযোগ নিয়ে মাদ্রাসা পরিচালনায় একক আধিপত্য বিস্তার করেন সিরাজ। 

সূত্রগুলো জানায়, এর আগে মাদ্রাসার আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষণের সময় ৩৯ লাখ টাকা লোপাটের অভিযোগ ধরা পড়লেও ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন সিরাজ। তার বিরুদ্ধে সনদপত্র জালিয়াতি ও চেক জালিয়াতির মাধ্যমে আরেকটি মাদ্রাসার টাকা আত্মসাতের অভিযোগও আছে। এর আগে মামলায় জেল খেটেও ধামাচাপা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে স্বপদে বহাল থেকেছেন তিনি। 

সোনাগাজী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আব্দুল হালিম মামুন আগের পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি বলেন, "১২৫ শতক জমির ওপর মাদরাসার তিনতলা ভবনে মার্কেট, ব্যাংকসহ অনেক কিছু আছে। ভাড়া আসে লাখ টাকার মতো। পুকুর, কাশ্মীরবাজার এলাকার ২০ শতক জমিসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় পাঁচ একর জমিও আছে মাদ্রাসার। বিভিন্ন ধরনের দানের টাকাও আসে। সব সম্পদের আয় তছরুপ করেন অধ্যক্ষ সিরাজ। গত বছর নিরীক্ষার সময় ৩৯ লাখ টাকার হিসাব দিতে পারেননি তিনি। এছাড়াও ২৮ হাজার টাকা ইসলামী ব্যাংকের ভাউচারে জালিয়াতি ধরা পড়ে। এসব কারণে রেজুলেশন করে দুই হাজার টাকার বেশি খরচ করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয় সিরাজের। কমিটি বদল হলে তিনি সেই রেজুলেশনই বাদ দিয়ে দেন"। 

আব্দুল হালিম মামুন আরো বলেন, "কেউ মুখ খুলতে না চাইলেও গত বছরই আমরা চার-পাঁচটি মেয়ের কথা জেনেছি। যাদের বই দেবে, প্রশ্ন দেবে বা অন্য সুবিধা দেবে বলে রুমে ডেকে হয়রানি করেন সিরাজ। অভিযোগ উঠলেও তদন্ত হয়নি। আগের কমিটি মাদরাসায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত দিলেও নিজের অপকর্ম ধরা পড়বে বলে সিরাজ তা বসায়নি। সিনিয়র কিছু বেয়াদব টাইপের ছেলেকে সুবিধা দিয়ে পোষেন সিরাজ। এরা ফরম ফিলাপ করায়। ফ্রি ছাত্রাবাসে খায়। টাকাও পায়। এরাই তার পক্ষে মাঠে নেমেছে বলে শুনেছি"।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এবার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন হয়রানির অভিযোগে ধরা পড়লেও এর আগেও এমন অনেক অভিযোগ উঠেছে সিরাজের বিরুদ্ধে। তবে নিজের তৈরি করা বাহিনী সেসব অভিযোগ ধামাচাপা দিয়েছেন তিনি। এসব ধামাচাপার কাজে তার প্রধান অস্ত্র ছিল তার টাকা দিয়ে পোষা অনুসারীরা। তবে সিরাজের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা রাফির পরিবারকে হুমকি দিয়েও এবারের ঘটনা চাপা দিতে পারেনি।  হুমকি সত্ত্বেও নুসরাতের পরিবার সিরাজের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। তাই তারা নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে রাফিকে শ্লীলতাহানির মামলায় সিরাজকে গ্রেপ্তারের পর এসব সহযোগী তার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন এবং মাদরাসায় দফায় দফায় সভা করে।

অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্যরাও জানান, পরীক্ষার আগে প্রশ্ন দেওয়া এবং গাইড দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ছাত্রীদের যৌন নিপীড়ন করতেন সিরাজ। তার বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ মুখ খুলতেই সাহস পেত না। দু'য়েকজন অভিযোগ করলেও পোষা বাহিনী দিয়ে সেটি চাপা দিয়ে দেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত ২৭ মার্চ আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে মামলা করেন তাঁর মা। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে আছেন তিনি। এর প্রেক্ষিতে টাকা দিয়ে পোষা অধ্যক্ষ সিরাজের অনুসারীরা নুসরাতের শরীরে আগুন দিয়ে হত্যা চেষ্টা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় নুসরাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার রাত সাড়ে ৯ টায় নুসরাত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।