• শনিবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩২ রাত

নুসরাতের মামলার পর থানা সামলানোর দায়িত্ব নেন আওয়ামী লীগ নেতা

  • প্রকাশিত ০১:১৫ দুপুর এপ্রিল ১৫, ২০১৯
নুর উদ্দিন এবং শাহাদাত হোসেন শামীম
নুসরাত হত্যা মামলার প্রধান দুই আসামি নূর উদ্দিন (বামে) এবং শাহাদাত হোসেন শামীম (ডানে)। ছবি: ফোকাস বাংলা

রবিবার দীর্ঘ সাড়ে ৯ ঘন্টাব্যাপী স্বীকারোক্তি দিয়েছে মামলার দুই প্রধান আসামি নুর উদ্দিন এবং শাহাদাত হোসেন শামীম

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যায় জড়িতদের তালিকায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের নামও যুক্ত হয়েছে । এছাড়াও এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরও অন্তত ১২ জন জড়িত রয়েছেন। রবিবার মামলার অন্যতম দুই প্রধান আসামি নুর উদ্দিন এবং শাহাদাত হোসেন শামীম আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জড়িতদের নাম উল্লেখ করেছে।

রবিবার রাত একটার দিকে ফেনীর অতিরিক্ত সিনিয়র ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট জাকির হোসেন এর  আদালতে তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক  জবানবন্দিতে জড়িতদের নাম প্রকাশ পেয়েছে । এর আগে বিকাল সাড়ে তিনটা থেকে দীর্ঘ সাড়ে নয় ঘন্টা সময় ধরে দুই আসামীর জবানবন্দি রেকর্ড নেন আদালতের বিচারক। 

এই মামলার তদন্তকারী সংস্থার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) আবু তাহের সোহান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "নুর উদ্দিন ও শাহদাত হোসেন শামীম এই ঘটনায় নিজের দায় স্বীকার করে সিনিয়র জুডিশিযাল ম্যাজিষ্ট্রেট জাকির হোসেন খাস কামরায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি শেষে আসামীদেরকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত"। 

এই মামলার ৪ নং আসামী নুর উদ্দিন জবানবন্দিতে সোনাগাজীর সিনিয়র ইসলামীয়া ফাজিল মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পুরো পুরো ঘটনা বর্ণনা দিয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

আন্দোলনের জন্য ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলম

তিনি বলেন, "যৌন হয়রানির মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা গ্রেফতার হওয়ার পর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের নির্দেশে নুর উদ্দিন ও শাহাদাত অধ্যক্ষ মুক্তির জন্য আন্দোলন শুরু করে। এজন্য সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলম তাদের ১০ হাজার টাকাও দিয়েছিলেন। এছাড়া, মাদ্রাসার আরেক শিক্ষকও আন্দোলন ও নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার জন্য পাঁচ হাজার টাকা দেন"। 

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে শামীম জানায়, "নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর সে দৌড়ে নিচে নেমে উত্তর দিকের প্রাচীর টপকে বের হয়ে যায়। বাইরে গিয়ে সে রুহুল আমিনকে ফোনে বিষয়টি জানায়। রুহুল আমিন বলেন, আমি জানি। তোমরা চলে যাও। এছাড়াও নুসরাত মামলা দায়ের করার পর রুহুল আমিন থানা ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন"।

নুসরাতকে বার বার প্রেমের প্রস্তাব দিয়েও প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল ঘাতক শামীম

নুসরাতের প্রতি নিজের ক্ষোভ থাকার কথা উল্লেখ করে শাহদাত হোসেন শামীম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আরো বলেছে, "দেড় মাস আগেও সে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু নুসরাত তা প্রত্যাখান করার পাশাপাশি তাকে অপমানও করে। এ কারণে সে নিজেও নুসরাতের প্রতি ক্ষুদ্ধ ছিল। যে কারণে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়"।

অন্যদিকে জবানবন্দিতে আসামি নুর উদ্দিন জানায়, গত ৪ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে ফেনী কারাগারে দেখা শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদেরসহ আরও কয়েকজন। সেখানে মামলা দায়ের করার কারণে নুসরাতকে কঠিন সাজা দেওয়ার জন্য অধ্যক্ষ সিরাজের অনুমতি চায়। এসময় শামীম নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেন। তখন অধ্যক্ষ সিরাজ তাতে সায় দেন এবং এই কাজ হাসিলের জন্য তার অনুসারীদের পরামর্শও দেন।

নুর উদ্দিন তার জবানবন্দিতে আরো বলেন, এতে শামীম বেশী উৎসহ বোধ করেন। কারণ সে রাফিকে দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত ও অপমানিত হয়েছে। সে নিজেও তার বন্ধুকে রাফির এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে অনেক দিন ধরেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। 

নুর উদ্দিনের জবানবন্দিতে আরও জানা যায়, সে ও তাঁর সহযোগীরা ওস্তাদের (সিরাজ উদ দৌলা) নির্দেশনা পাওয়ার পর ৫ এপ্রিল মাদ্রাসার পাশের পশ্চিম হোস্টেলে বৈঠকে বসে। সেই বৈঠকে গোনীয়তা রক্ষা করে কীভাবে হত্যা করা হবে এই নিয়ে ও তারা এক বিশদ পরিকল্পনা করা হয়। পরের দিন ৬ এপ্রিল তারা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। তবে ঘটনার সময় সে ভবনের নিচে ছিল। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী উম্মে সুলতানা পপি গিয়ে নুসরাতকে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যায়। ওই সময় ছাদে কামরুন নাহার মণি ছিল। সে এবং হাফেজ আবদুল কাদেরসহ অপর পাঁচজন আগে থেকেই গেটে পাহারা দিচ্ছিল।