• মঙ্গলবার, আগস্ট ২০, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫০ রাত

জাবিতে ৪০০ কোটি টাকার টেন্ডার, ছাত্রলীগের ছিনতাই-বাধা, অনিয়মের অভিযোগ

জাবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। ছবি: সংগৃহীত

‘শিডিউল ছিনতাইয়ের সাথে ছাত্রলীগ কোনওভাবেই জড়িত নয়। টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং উন্নয়ন প্রকল্প সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে আমরা সহযোগিতা করছি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার জায়গা থেকে ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে ওসব করে থাকতে পারে।’

ছাত্রলীগের ছিনতাই-বাধা, প্রকল্প পরিচালকের অসহযোগিতা আর অনিয়মের অভিযোগের মধ্য দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০০কোটি টাকার টেন্ডারের শিডিউল বিক্রি শেষ হয়েছে।  

বিশ্ববিদ্যালয়টির অধিকতর উন্নয়নের জন্য গত ২৩ অক্টোবর ১৪৪৫ কোটি টাকা অনুমোদন দেয় একনেক। এই প্রকল্পের প্রথম ধাপে ছয়টি আবাসিক হল নির্মাণের জন্য গত ১ মে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল। হলগুলো নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।  

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসূত্র জানায়, মঙ্গলবার শেষদিন পর্যন্ত বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২৫টি শিডিউল ক্রয় করেছে। ২৯ মে, বুধবার টেন্ডার খোলা হবে।

গত কয়েকদিনে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শিডিউল ছিনতাই ও ভয় দেখিয়ে শিডিউল জমাদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

‘ইউনাইটেড কনস্ট্রাকশন কোম্পানী’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ২৬ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। অভিযোগপত্রে তারা বলেন, গত ২৩ মে শিডিউল কিনে ফেরার সময় ছাত্রলীগের পরিচয় দিয়ে ২০-৩০ জন যুবক তাদের কাছ থেকে শিডিউল ছিনিয়ে নিয়েছে।    

প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা জানান, ওইদিন দুপুর ২টার দিকে তাদের একজন প্রতিনিধি নির্ধারিত অগ্রণী ব্যাংকের ক্যাম্পাস শাখা থেকে শিডিউল ক্রয় করেন। ফেরার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের পাশে ২০-২৫ জনের একটি দল নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানা ও সাধারণ সম্পাদক এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চলের অনুসারী পরিচয় দিয়ে শিডিউল ছিনিয়ে নেয়। 

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দুদকে অভিযোগপত্রের অনুলিপি পাঠিয়ে এই টেন্ডার বাতিল করে ই-টেন্ডার ব্যবস্থার অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

এদিকে ছাত্রলীগ সভাপতি মো. জুয়েল রানার বিরুদ্ধে ‘মাজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে শিডিউল নিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।      

ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানায়, গত ২৩ মে প্রতিষ্ঠানটি ৬টি লটের শিডিউল ক্রয় করে। এ তথ্য জানতে পেরে ছাত্রলীগ সভাপতি জুয়েল রানা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে ক্যাম্পাসে ডাকেন। তাদের প্রতিনিধি ক্যাম্পাসে গেলে তাকে হুমকি দিয়ে শিডিউল ফেরত দিতে বলা হয়। পরে ২৬ মে রাতে জুয়েল রানা প্রতিষ্ঠানটির রাজধানীর কার্যালয়ে কয়েকজন অনুসারী পাঠিয়ে শিডিউল দিয়ে দিতে বাধ্য করেন। 

প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, “কোম্পানির পক্ষ থেকে ৬ টি শিডিউল কেনা হয়েছিলো। পরে ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানার ছেলেরা এসে সেগুলো নিয়ে গেছে।”

এদিকে গত ২৬ মে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের শিডিউল ছিনতাই হয়েছে বলে ছাত্রলীগ সূত্র দাবি করেছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শিডিউল কিনতে ক্যাম্পাসে গেলে তাদের ভয় দেখিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে।   

অভিযোগের বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা বলেন, “শিডিউল ছিনতাইয়ের সাথে ছাত্রলীগ কোনওভাবেই জড়িত নয়। টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং উন্নয়ন প্রকল্প সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে আমরা সহযোগিতা করছি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার জায়গা থেকে ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে ওসব করে থাকতে পারে।”

এদিকে প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অসহযোগিতা করার অভিযোগও উঠেছে। গত ২৬ মে বঙ্গ বিল্ডার্স লিমিটেডের কর্মকর্তারা সারাদিন অপেক্ষা করেও তার দেখা না পেয়ে ফিরে যান। পরদিন শিডিউল জমা দিতে সমর্থ হন তারা।  

অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) প্রকৌশলী নাসির উদ্দীনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার ফোনটি রিসিভ হয়নি।  

টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ

টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কয়েকটি অনিয়মের অভিযোগ তুলে কয়েকদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এবং সাংবাদিকদের কাছে একটি উড়ো চিঠি আসে। মঙ্গলবার ওই উড়ো চিঠির লিখিত জবাবে অভিযোগ ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘বানোয়াট’ বলে দাবি করেছেন প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) নাসির উদ্দিন।

উড়ো চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, টেন্ডার আহ্বানের ১৫ দিন পর্যন্ত ব্যাংকে কোনও ডকুমেন্ট সরবরাহ করা হয়নি।

এই অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে প্রকল্প পরিচালক বলেন, “বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ১৩ দিন অতিবাহিত হলেও কোন সংস্থা টেন্ডার ডকুমেন্ট সংগ্রহ করার জন্য প্রকল্প অফিসে আসেনি।”

উড়ো চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, কিন্তু কোনও বেসরকারি (এনজিও) সংস্থায় কাজ করাকে অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরা হয়নি।  

এর জবাবে পরিচালক বলেন, “এনজিওতে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরকারি অর্থায়নের কোনো প্রকল্পে নিয়োগ করা অস্বাভাবিক।”

এ ছাড়া বিজ্ঞপ্তিতে প্রকল্প পরিচালকের ফোন নম্বর দেওয়া এবং তার বরাবর আবেদন করে ডকুমেন্ট সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিময়বহির্ভূত বলে দাবি করা হয়েছে। এর জবাবে পরিচালক বলেছেন, “পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন মেনেই এ নিয়ম সংযুক্ত করা হয়েছে।” 

এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, “বেনামি চিঠিটা পড়েছি। আমরা সবকিছু নিয়মতান্ত্রিকভাবে করার চেষ্টা করেছি। অনেকেই নানাভাবে উন্নয়ন প্রকল্প বাধাগ্রস্থ করার চেষ্টা করবে। ওগুলো নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগ নেই। আমরা ভালোভাবে প্রকল্পের কাজ করতে চাই।”

ছাত্রলীগের শিডিউল ছিনতাই অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, “আমি এ ব্যাপারে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলবো।”