• সোমবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩১ রাত

ঈদ নেই নুসরাতের বাড়িতে

  • প্রকাশিত ১১:০৩ সকাল জুন ৫, ২০১৯
নুসরাতের পরিবার
বেঁচে থাকলে হয়তো এভাবেই ঈদের আনন্দ পরিবারের সবার সাথে ভাগ করে নিতো নুসরাত। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

'প্রতিবছর নুসরাত আমার ও মা এবং বাবার জন্য জামা পছন্দ করে কিনতো'

আজ পবিত্র ঈদুল ফিতর। সারাদেশে আজ পালিত হচ্ছে আনন্দ উৎসব। তবে ঈদ এলেও আনন্দ এসে পৌঁছাতে পারেনি নুসরাতদের বাড়িতে। প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে ঈদের আনন্দ থাকলেও নুসরাতের পরিবারের কোন আনন্দ নেই। থাকবে কি করে একমাত্র আদরের মেয়েটিই যে আর নেই। এই শোকে বিহ্বল ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির মা শিরিন আক্তার ও বাবা একেএম মুসা।

নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হানও ভুলতে পারছেন না বোনের এই বেদনা বিধুর শোক। তার মর্মান্তিক মৃত্যুর দুই মাস পার হয়ে গেলেও এখনো নুসরাতেই বসবাস করছেন তার পুরো পরিবার। পরিবারের সবাই এখনো শোকে কাতর, শয্যাশায়ী।

বুধবার ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয় নুসরাত জাহান রাফির মা শিরিন আক্তারের সঙ্গে। পরিচয় দিয়ে ‘ঈদ মোবারক’ বলতেই মুঠোফোনের অপর প্রান্ত থেকে শোনা যায় কান্নার শব্দ।

কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, "দুই ছেলে কিংবা নুসরাতের বাবা কেউই সারারাত ঘুমাতে পারছেনা। ছেলে দু'টো বোনের জন্য কাঁদছে। রাফির বাবা কোরান তেলাওয়াত করছেন আর কিছুক্ষন পর পর মা মা বলে; নুসরাত নুসরাত বলে ডাকছেন। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে?" মুঠোফোনেও শিরিন আক্তারের কথা ছাপিয়ে বারবার আসছিল কান্নার রোল।

নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "নুসরাতের কথা কোনোভাবে ভুলতে পারছে না মা ও বাবা এবং ছোট ভাই রায়হান। ঈদ বলে নুসরাতকে আরও বেশি মনে পড়ছে। কোনোভাবেই তাদের কান্না আমি থামাতে পারছি না। আসলে আমাদের বুকের ভেতরে আগুন জ্বলছে। আমাদের বুকটা আগুনে পুড়ছে। কি অসহ্য কষ্ট, আপনাকে বোঝাতে পারব না। আমাদের জীবনে আর কোনদিন ঈদ আসবে না"। 

কথায় কথায় স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান । তিনি বলেন, "প্রতিবছর রমজানে ইফতার তৈরী থেকে এক সঙ্গে সবাই মিলে ইফতার করার স্মৃতি কোন ভাবে আমরা ভুলতে পারছি না । প্রতি ঈদে নুসরাতকে নিয়ে ১০ রমজানের মধ্যে নতুন জামা কিনতে মার্কেটে যেতাম মায়ের সঙ্গে । তাঁর পছন্দের কাপড় প্রথম কিনে তার পর আমাদের জন্য ঈদ বাজার শুরু করতাম। প্রতিবছর নুসরাত আমার ও মা এবং বাবার জন্য জামা পছন্দ করে কিনতো। বাবা ও মা সাধ্য মতো নুসরাত ও রায়হানের আবদার মেটানোর চেষ্টা করতেন"। 

"আমাদের পরিবারে খুব বেশি স্বচ্ছলতা ছিল না। তবে সাধ্যমতো ঈদের আনন্দ করতাম। নতুন পোশাক কিনতাম। ঈদের দিন সকাল থেকে ভাই বোন মিলে দলবদ্ধ ভাবে বাড়িতে ঘরে ঘরে গিয়ে বড়দের বড়দের সালাম করে আসতাম। পরে বিকালে পরিবারের সবাই নিকট আত্মীয়দের বেড়াতে যেতাম। স্বচ্ছলতা না থাকলেও আমাদের পরিবারের আনন্দ-ভালোবাসায় কখনো ঘাটতি ছিল না", বলেন নোমান।

নুসরাতের বাবা মুসা বলেন, "পরিবারের স্বজনদের কাছে এবারের ঈদ শোকের ঈদে পরিণত হয়েছে। নুসরাতের শূন্যতা আমাকে অনেক কষ্ট দিচ্ছে। জানি না সামনে দিনগুলো কিভাবে এই শোক সামলাবো"।

"নিজে বেশী পড়ালেখা করতে পারিনি। খুব ইচ্ছে ছিল মেয়েটাকে মানুষ করবো। কিন্তু আর হলো না। সবাই পরিজন নিয়ে ঈদ করছে। আর আমি একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে কাঁদছি। আল্লাহ কেনো আমাকে এই শাস্তি দিলেন জানি না," বলেন নুসরাতের বাবা।

তিনি আরো বলেন, "আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার আগে নুসরাত পরীক্ষা শেষে ফেনীতে গিয়ে কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিল। ইংরেজিতে অর্নাস করার ইচ্ছে ছিলো তার। মৃত্যুর কিছু সময় আগেও এক লোককে সে গর্ব করে বলেছিল এই কথা"। এরপর আর কথা বলতে পারেননি তিনি। কান্নায় গলা বুজে আসে তার।

এবারের ঈদটা যেন নুসরাতের পরিবারের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।