• শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৬:৫৪ সন্ধ্যা

তিস্তার পানি বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপরে, পানিবন্দি ১৫হাজার পরিবার

  • প্রকাশিত ১২:০৪ দুপুর জুলাই ১৩, ২০১৯
তিস্তা
নীলফামারীতে বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে তিস্তার পানি ঢাকা ট্রিবিউন

‘উজানের ঢল সামাল দিতে খুলে রাখা হয়েছে তিস্তা ব্যারাজের সবকটি স্লুইস গেট’

টানা ভারী বর্ষণ আর উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানিবিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। 

শনিবার (১৩ জুলাই) সকাল ৬টায় ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার (৫২ দশমিক ৬০) ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানির প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোডের পানি পরিমাপক উপ-সহকারী প্রকৌশলী আমিনুর রশিদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “উজানের ঢল সামাল দিতে খুলে রাখা হয়েছে তিস্তা ব্যারাজের সবকটি স্লুইস (৪৪টি) গেট (জলকপাট)।”

ফলে, নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা প্রায় ১৫টি চর ও চরগ্রাম হাটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়েছে। এতে প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের ৭৫ হাজার মানুষ বন্যা-কবলিত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া তিস্তা বিপদসীমার ওপরে চলে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থানের বাঁধগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। 

জেলা প্রশাসনের পক্ষে তিস্তার বন্যায় ডিমলা উপজেলায় ৫০ মেট্রিকটন চাল, নগদ ৫০ হাজার টাকা ও ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ময়নুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। 

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গয়াবাড়ি ও জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ি, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের বিস্তীর্র্ণ এলাকার ১৫টি চর ও গ্রামের পরিবারগুলো বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে । 

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সর্তকীকরন কেন্দ্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) সকাল ৬টায় তিস্তার পানি বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও তা সন্ধ্যা ৬টায় ২৫ ও রাত ৯টায় আরও ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। 

শুক্রবার (১২ জুলাই) সকাল ৬টায় বিপদসীমার (৫২ দশমিক ৬০) ২৪ ও সন্ধায় ৩৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে তিস্তা পাড়ের মানুষজন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই হিসাব মানতে নারাজ। এলাকাবাসীর পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে ধারনা করছে তিস্তা নদীর পানি কম করে হলেও বিপদসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তাদের দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ড অজ্ঞাত কারনে নদীর পানির সঠিক হিসাব প্রকাশ করছে না। 

উপজেলার পূবর্ ছাতনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রভাষক আব্দুল লতিফ খান জানান, গত দুই দিনের বন্যার চেয়ে শুক্রবার উজানের ঢলে পানির গতিবেগ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এলাকার উঁচু, নিচু স্থানে নদীর পানি প্রবেশ করেছে। ইতিমধ্যে এলাকার ১ হাজার ১৪০ পরিবারের বসত বাড়ীতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এলাকার ঝাড়শিঙ্গেরশ্বর মৌজাটি তলিয়ে গেছে। হুমকীর মুখে পড়েছে সেখানকার মাটির রাস্তাগুলো। রাস্তার উপর দিয়ে নদীর পানি প্রবাহিত হওয়ায় এলাকাবাসী বালির বস্তা দিয়ে পানি ঠেকানোর চেস্টা করছে।পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়সিংশ্বর চরের বাসিন্দা বানভাসী হামিদুল ইসলাম বলেন, গত তিনদিন ধরে পরিবার পরিজন নিয়ে পানিবন্ধি হয়ে আছি। চাল চুলো জ্বালানোর কোন উপায় না পেয়ে শুকনো খাবার খেয়ে বেঁছে আছি। গবাদী পশুসহ অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বানভাসীদের জন্য বরাদ্দ হলেও এখনও তা বন্টন করা হয়নি।

ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান বলেন, ছাতুনামার চর,ফরেষ্টের চর, সোনাখুলীর চর ও ভেন্ডাবাড়ি চরে দেড় হাজার পরিবারের বসতবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। তিনি জানান, দক্ষিণ সোনাখুলী এলাকায় তিস্তা নদীর ডান তীরের প্রধান বাঁধের অদুরে ইউনিয়ন পরিষদের তৈরী করা মাটির বাঁধ হুমকীর মুখে পড়েছে। 

বাঁধের উপর দিয়ে তিস্তা নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় দক্ষিণ সোনাখুলী কুঠিপাড়া গ্রামের বসত ঘর ও আবাদি জমিগুলো তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। 

উপজেলার খালিশা চাপানি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান সরকার বলেন, পূর্ব বাইশ পুকুর ও ছোটখাতা মৌজার ৫ শতাধিক পরিবারের বসতবাড়ীতে বন্যার পানি বয়ে যাচ্ছে। টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ময়নুল হক বলেন তার এলাকার দক্ষিন খড়িবাড়ি ও পূর্ব খড়িবাড়ি, একতার চর, টাবুর চর মৌজায় তিস্তার বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। ইতিমধ্যে দুই সহস্রাধিক পরিবারের বসতবাড়ীতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। 

এদিকে, নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার শৌলমারী বান পাড়ায় ডানতীর গ্রাম রক্ষা বাঁধে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। 

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, উজানের ঢল ও বৃষ্টিপাতের কারণে আমরা সর্তকাবস্থায় রয়েছি। শুক্রবার তিস্তা নদীর পানি সকাল ৬টায় বিপদসীমা অতিক্রম করে ২৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হলে বিকাল ৩ টায় বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ও সন্ধ্যায় ৩৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। 

শনিবার (১৩ জুলাই) সকাল ৬টায় বন্যার পানি বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যারাজের সবকটি শ্লুইস (৪৪টি) গেট খুলে রাখা হয়েছে। 

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুন নাহার মুন বলেন, “কিছু মানুষজন নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে আর কিছু পানিবন্ধি অবস্থায় বাড়িতে রয়েছে। তবে বন্যা-কবলিত এলাকায় এখনও রেড এর্লাড জারি করা হয়নি।” এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “গতকালের বরাদ্দকৃত মালামাল আজকে বিতরণ করা হবে।” 

নীলফামারী জেলা ত্রান ও দুযোগ কর্মকর্তা এসএ হায়াত জানায়, শুক্রবার (১২ জুলাই) বিকালে ডিমলা উপজেলায় ৫০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ৫০ হাজার টাকা ও ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আজকে জেলা পর্যায়ে বৈঠকের পর কতটুটু বরাদ্দ বানভাসীদের দেওয়া হবে সেটা পরে জানানো হবে।