• সোমবার, অক্টোবর ২১, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:১৮ দুপুর

‘স্যার আমার নাম লিখেন, স্যার আমার নাম লিখেন’

  • প্রকাশিত ০৯:৩৬ রাত জুলাই ২২, ২০১৯
গাইবান্ধা
রাস্তার দু’পাশে সারি সারি পলিথিনের ছাউনিতে আশ্রয় নিয়েছে শত শত পরিবার। সৈয়দ জাকির হোসাইন/ঢাকা ট্রিবিউন

‌বিধবা ফুলবানুর (৬৫) এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলে বিয়ের পর আলাদা হয়ে গেছে। ফুলবানু বলেন, ‌ছেলে ভাত দেয় না, ঘরে চাল নেই। আমার নামটা য‌দি না লিখেন তবে কি খেয়ে বাঁচবো বাবা?

গাইবান্ধা শহর থেকে বালাসী ঘাট ৫ কিলোমিটারের পথ। তিন কিলোমিটার যেতেই দেখা গেল, রাস্তার দু’পাশে সা‌রি সা‌রি প‌লি‌থিনের ছাউনি, সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন শত শত পরিবার, বন্যায় সীমাহীন দুর্দশার মুখোমুখি হওয়া হাজারো মানুষ। বালাসী ঘাট যেতে বা‌কি দুই কি‌লো‌মিটারের পুরোটা জুড়ে কেবলই বানভাসীদের বাস। বালাসী ঘাট থেকে দ‌ক্ষি‌ণে ভাসার পাড়া বেড়িবাঁধের পুরোটা জুড়ে আশ্রয় নিয়েছেন বন্যায় ক্ষ‌তিগ্রস্ত আরো হাজারো মানুষ।

‌নিচে প‌লি‌থিন, ছাউনিও প‌লি‌থিন, প্যারালাইজড স্বামীকে বিছানায় রেখে এমন এক ঘর থেকে ছুটে এলেন রাহেলা বেগম (৫০)। প্রতিবেদককে দেখেই বললেন, স্যার আমার নামটা লিখেন। আমার তো কিছুই নাই আমার নাম টা তবে নিবেন না কেন?

“আমরা ত্রান দেব না, আমরা এসেছি প‌ত্রিকার জন্য রিপোর্ট  লিখ‌তে”, তবুও পেছন পেছন ছুটছেন রাহেলা বেগম।

রাহেলা বেগমের বা‌ড়ি ভাষারপাড়া গ্রামে। বন্যার পা‌নির তোড়ে তার কুঁড়ে ঘর‌টি ভেসে গেছে। হারিয়ে গেছেন ৪টি হাঁসের সবগুলো। এখন তার কোনো ঘর নেই, এক মু‌ঠো চালও নেই রান্না করার মতো।

রা‌হেলা বেগ‌মের পথ ধ‌রে নাম লেখা‌তে ব্যাকুল হ‌য়ে উঠেন অনেক নারী-পুরুষ।

ফুলছ‌ড়ি উপ‌জেলার কৈত‌কি গ্রা‌মের ব‌বিতা বেগমও (৪০) আশ্রয় নি‌য়ে‌ছেন ভাসারপাড়া বেড়ীবাঁধে। ব‌বিতা ব‌লেন, সরকার এন‌জিও, কা‌রো কাছ থে‌কেই কিছু পাইনি। কেউ আসেনি খবর নি‌তে। দয়া‌ ক‌রে আমার নামটা লি‌খেন।

জানা গে‌ছে বালাসী রোড ও ভাসারপাড়া বাঁধে যারা আশ্রয় নি‌য়ে‌ছেন তারা কেউই কোনো ধর‌নের ত্রান পাননি।

‌বিধবা ফুলবানুর (৬৫) এক ছে‌লে এক মে‌য়ে। মে‌য়ের বি‌য়ে দি‌য়ে‌ছেন, ছে‌লে বি‌য়ের পর আলাদা হ‌য়ে গে‌ছে। ফুলবানু ব‌লেন, ‌ছে‌লে ভাত দেয় না। ঘ‌রে চাল নেই। আমার নামটা য‌দি না লি‌খেন ত‌বে কি খে‌য়ে বাঁচ‌বো বাবা?

জানা গে‌ছে, ক‌য়েক‌টি গ্রাম থে‌কে বন্যা কব‌লিত সহস্রা‌ধিক মানুষ আশ্রয় নি‌য়ে‌ছে ভাসারপাড়া বাঁধে। এ‌তগুলো মানুষ জন্য নি‌জেরাই তৈ‌রি ক‌রে‌নছে এক‌টি ট‌য়ে‌লেট। আর এক‌টি মাত্র টিউবও‌য়েল র‌য়ে‌ছে যার পা‌নি খাবার উপযুক্ত।

ছকু মিয়া (৩৮) ব‌লেন, আমা‌দের নাম লি‌খে নেন, এক‌টি টিউবও‌য়েল দি‌য়েন । এ‌তগু‌লো মানুষ একটা টিউবও‌য়ে‌লে লাইন ধ‌রেও পা‌নি পাওয়া যায় না।

কিন্তু যতই ব‌লি, আমরা কিছু দি‌ব না তবু কেউ পিছু ছা‌ড়ে না।

জেলা ত্রান অফিসের তথ্যম‌তে, এ পর্যন্ত ক্ষ‌তিগ্রস্ত‌দের ম‌ধ্যে ১০৭০ মেট্রিক টন চাল, ১৮৫০,০০০ টাকা, ২৫০ টি তাবু ও ৬০০০ প‌রিবার‌কে শুক‌নো খাবার সহায়তা দেওয়া হ‌য়ে‌ছে। ‌জেলার মোট ক্ষ‌তিগ্রস্ত মানু‌ষের সংখ্যা ৫৮২,৯৯৭ জন। স‌বোর্চ্চ ক্ষ‌তিগ্রস্ত মানু‌ষের সংখ্যা ফুলছ‌রি উপ‌জেলায়, ১৫৯,৪৯৮ জন। জেলার মোট ক্ষ‌তিগ্রস্ত প‌রিবা‌র ১৪৫,০০০ এর বে‌শি। ‌মোট ১৯৭টি আশ্রয় কে‌ন্দ্রে ৭৯,৯৯৭ জন‌কে আশ্রয় দেওয়া হ‌য়ে‌ছে। মোট ৯৬৩৪ টি টিউবও‌য়েল ক্ষ‌তিগ্রস্ত বিশুদ্ধ পা‌নির সংকট তৈ‌রি হ‌য়ে‌ছে।

ক্ষ‌তিগ্রস্ত হ‌য়ে‌ছে ১৪,০২১ হেক্টর জ‌মির ফসল। মৃত হাস মুরগীর সংখ্যা ৩৭২০ টি। ৩৯টি ব্রিজ ও কালভার্ট এবং ৮৩৩ কিলোমিটার রাস্তা আং‌শিক ক্ষ‌তিগ‌্রস্ত হ‌য়ে‌ছে।

গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আলমগীর কবির ব‌লেন, “‌যেখা‌নেই খবর পা‌চ্ছি সেখা‌নেই ত্রান দেওয়া হচ্ছে। উপ‌জেলা ইউনিয়ন প‌রিষ‌দের মাধ্য‌মে। আশ্রয় কেন্দ্রগু‌লো‌তে প্র‌তি‌দিন ১০০০০ রু‌টি বিতরণ করা হ‌চ্ছে। এ পর্যন্ত এক লাখ পা‌নি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হ‌য়ে‌ছে। আমরা সাধ্যম‌তো ত্রান সহায়তা দি‌য়ে যা‌চ্ছি। কিছু এন‌জিও ও ত্রান সামগ্রী বিতরণ কর‌ছে।”