• শনিবার, আগস্ট ২৪, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৫ রাত

‘সচিবের লজ্জিত হওয়া উচিত’

  • প্রকাশিত ০৬:১২ সন্ধ্যা জুলাই ২৫, ২০১৯
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ও ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক এবিএম ফারুক। ছবি: সংগৃহীত

‘দুধে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক, ডিটারজেন্ট ও ফরমালিন পাওয়া গেছে’, গবেষণার পর এমনটি দাবি করায় অধ্যাপক এবিএম ফারুকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াসি উদ্দিন

হাইকোর্ট নির্দেশিত ৬টি ল্যাবে পাস্তুরিত দুধ পরীক্ষার পর ১১টি নমুনাতে অতিরিক্ত মাত্রায় সীসা, বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম, মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ইত্যাদি পাওয়া গেছে। ঘটনায় ১০টি দুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। ২৪ জুলাই, বুধবার সংস্থাটির নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক কামরুল হাসান ঢাকার বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে এই মামলা করেন। 

কামরুল হাসান বলেন, “দুধে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ভারী ধাতবের উপস্থিতি পাওয়ায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ মামলা করার ক্ষমতা প্রদান করেছে। তাই আমি মামলাটি দায়ের করেছি। ১০টি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে। আগামী মাসের বিভিন্ন দিনে মামলার শুনানির দিন ধার্য করেছেন বিচারক।”

মামলা দায়ের করা ১০টি কোম্পানি হচ্ছে-বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড (মিল্কভিটা), বারো আউলিয়া ডেইরি মিল্কের (ডেইরি ফ্রেশ), ইগলু, আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ (ফার্ম ফ্রেশ মিল্ক), আফতাব মিল্ক, শিলাইদহ ডেইরি (আল্ট্রা মিল্ক), আড়ং ডেইরি, প্রাণ মিল্ক, ইছামতি ডেইরি লিমিটেড (পিওর), সেইফ মিল্ক।

দুধের নমুনা পরীক্ষার ফল ও মামলা দায়েরের মাধ্যমে দুধে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতির বিষয়টিই সমর্থন করে। যদিও দুধে ভেজালের উপস্থিতি প্রমাণ করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক এবিএম ফারুকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়েছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াসি উদ্দিন।

দুধে সীসা, ক্যাডমিয়ামসহ বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি বিষয়ক গবেষণার সত্যতা পাওয়ার বিষয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক এবিএম ফারুক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমি খুবই আনন্দিত যে, এটা প্রমাণিত হয়েছে আমাদের গবেষণা সঠিক ছিল। আমাদের গবেষণা দল বার বার এ কথাটিই বলে এসেছে। আমরা বলেছি আমরা সঠিক, আমাদের গবেষণা নির্ভুল। গবেষকেরা যে স্বীকৃতি পেয়েছেন, তারা সঠিক প্রমাণিত হয়েছেন, এটা অবশ্যই আনন্দের।” 


ঢাকা ট্রিবিউনে আরো পড়ুন -

দুধে ভেজাল ধরায় অধ্যাপক ফারুককে হয়রানির অভিযোগ

ঢাবি উপাচার্য: অধ্যাপক ফারুকের পক্ষে সমগ্র জাতি থাকবে

মিল্ক ভিটা, আড়ং, প্রাণসহ ১১ ব্র্যান্ডের দুধে মাত্রাতিরিক্ত সিসা, বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম


মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াসি উদ্দিনের হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ফারুক বলেন, “গবেষণা ফল প্রকাশ করার পর সেবিষয়ে কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তিনি আমাদেরকে আক্রমণ করেছেন। কোনো কোম্পানিও এবিষয়ে কিছু বলেনি কিন্তু তিনি কোম্পানির পক্ষ নিলেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি যে কদর্য ভাষা ব্যবহার করেছেন, তাতে তাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। তারা ভুল স্বীকার করলেই আমরা খুশি।”

পাস্তুরিত দুধে ক্ষতিকর উপাদানের বিষয়ে তিনি বলেন, “কোম্পানিগুলোর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি রয়েছে। কিন্তু শুধু ব্যবস্থাপনার ত্রুটির জন্যই দুধে ব্যাকটেরিয়াসহ অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান রয়ে যাচ্ছে। তাদের উদ্দেশে আমি বলব, নিরাপদ দুধ উৎপাদনে বিনামূল্যে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা করতে আমরা প্রস্তুত। তবুও দেশের মানুষ যেন নিরাপদ দুধ খেতে পারে অন্তত সে ব্যবস্থা তারা করুক।” 

ক্ষতিকারক উপাদান থাকা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আদেশ দেওয়ায় হাইকোর্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে অধ্যাপক ফারুক বলেন, “হাইকোর্ট নির্দেশ না দিলে এমনটি সম্ভবত হতো না। আমি আশা করছি, জাতির স্বার্থে মহামান্য হাইকোর্ট যেন সরকারি দপ্তরগুলোকে এমন নির্দেশ দেন যাতে তারা কর্মক্ষম হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এধরণের গবেষণার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলে তাদের থাকবে না কেন? যন্ত্র নেই, প্রযুক্তি এমন কথা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ যেন তারা না পায়। একইসঙ্গে হাইকোর্ট যেন পশু খাদ্যে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক না মেশাতে নির্দেশ দেন। তাহলেই হয়তো ভেজালের লাগাম টেনে ধরা যেতে পারে।” 

এদিকে ১০টি কোম্পানির বিরুদ্ধে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মামলার বিষয়ে কনসাস কনজ্যুমার সোসাইটির (সিসিএস) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ ঢাকা ট্রিবিউনিকে বলেন, “মামলা তো অনেক আগেই করা উচিত ছিল। তাদের সুযোগ ছিল আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। নিজেদের যদি এসব দুধ পরীক্ষা করার সামর্থ না থাকতো তবে সেটা অন্য কোনো ল্যাবেও করাতে পারতো। কিন্তু তা তারা করেনি। কেন করেনি, কেন ব্যবস্থা নেয়নি, এটা তারাই ভালো বলতে পারবে।” 

কনসাস কনজ্যুমার সোসাইটির (সিসিএস) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদনিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ একটি সাধারণ মামলা দিয়ে বড় কোম্পানিগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার কৌশল নিয়েছে বলে অভিযোগ করে পলাশ মাহমুদ বলেন, “মামলা তো ইচ্ছাকরে দেয়নি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। হাইকোর্টের নির্দেশে তারা মামলা দিতে বাধ্য হয়েছে। এক্ষেত্রেও কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে তারা। একটি সাধারণ মামলা দিয়ে বড় কোম্পানিগুলোকে যে সুরক্ষা দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে সেটি স্পষ্ট। তাদের সুযোগ ছিল বিশেষ আইনে মামলা করার। কিন্তু তারা তা না করে সাধারণ প্রক্রিয়ায় মামলা করেছে। যেন বিষয়টি হালকা হয়ে যায়। এখন এমামলা বছরের পর চলতে পারবে। সেই সুযোগে ভোক্তাদের ঠকিয়ে কোম্পানিগুলোর হরিলুট চলতে থাকবে।”

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াসি উদ্দিনের হুমকির বিষয়ে পলাশ মাহমুদ বলেন, “দুধে ভেজালের বিষয়টি প্রমাণ করেছেন ফারুক স্যার। এঘটনায় কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, জনস্বার্থের পক্ষে না গিয়ে তিনি কোম্পানির পক্ষে গেলেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও কোম্পানির পক্ষ নিলেন, গবেষককে হুমকি দিলেন। এবিষয়টি অত্যন্ত সন্দেহজনক এবং তার সততা ও চাকরির প্রতি দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কেন তিনি এটা করলেন তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা উচিত।” 

প্রসঙ্গত, বাজারে পাওয়া যায় এমন পাস্তুরিত দুধ নিয়ে ২০১৮ সালের ১৭ মে ‘পাস্তুরিত দুধের ৭৫ শতাংশই নিরাপদ নয়’ উল্লেখ করে পত্রিকায় বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো আদালতে নজরে আনা হলে আদালত এবিষয়ে রিট আবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। এরপরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ২০ মে হাইকোর্টের রিট দায়ের করেন আইনজীবী তানভির আহমেদ।

ওই রিটের শুনানি নিয়ে বাজারে পাওয়া যায় এমন সব ব্র্যান্ডের পাস্তুরিত দুধের মান পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটিকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

পরে চলতি বছরের ২৫ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদ এবং বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের যৌথভাবে চালানো এক গবেষণায় দেশের পাঁচটি কোম্পানির উৎপাদিত পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিকের সন্ধান পান গবেষকরা। ওই গবেষণার নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক এবিএম ফারুক। তিনি জনস্বার্থে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করলে তা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে তাকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। 

পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশে বাজারে প্রচলিত ১৪টি ব্যান্ডের দুধ পরীক্ষা করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। ওই পরীক্ষায় ১৪টি ব্র্যান্ডের ১১টিতেই অতিরিক্ত মাত্রায় সীসা, বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম, মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক, ডিটারজেন্ট ইত্যাদি পাওয়া যায়। ঘটনায় ক্ষতিকারক উপাদান থাকা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা আগামী ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে জানাতে বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত।