• শনিবার, অক্টোবর ১৯, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩৮ রাত

বন্দুকযুদ্ধে নিহত রোহিঙ্গা ডাকাতের নামে বাংলাদেশি স্মার্ট কার্ড!

  • প্রকাশিত ১০:০৩ রাত সেপ্টেম্বর ১, ২০১৯
রোহিঙ্গা ডাকাতের স্মার্ট কার্ড
বন্দুকযুদ্ধে নিহত রোহিঙ্গা ডাকাত নুর মোহাম্মদের ভুয়া বাংলাদেশি স্মার্ট কার্ড। ঢাকা ট্রিবিউন

রোহিঙ্গা ডাকাত নুর মোহাম্মদের বাংলাদেশে ৪টি বাড়ি রয়েছে

কক্সবাজারে যুবলীগ নেতা হত্যার মূল আসামি রোহিঙ্গা ডাকাত নুর মোহাম্মদ টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। তার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নুর মোহাম্মদের নামে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রের (স্মার্ট কার্ড) একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে তুমুল আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, নুর মোহাম্মদ মিয়ানমারের নাগরিক হলেও এই স্মার্ট কার্ড দেখিয়ে সারা বাংলাদেশ ঘুরতেন। এই স্মার্ট কার্ডের জোরেই তিনি ইয়াবার ব্যবসায় নামতে সক্ষম হন। এক পর্যায়ে ইয়াবা ব্যবসার পাশাপাশি একটি সন্ত্রাসী দল গঠন করে ডাকাতি শুরু করেন তিনি। এরমাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আয় করে নুর মোহাম্মদ।

তার এই স্মার্ট কার্ডের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য জেলা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করে ঢাকা ট্রিবিউন। সেখান থেকে নুর মোহাম্মদের নামে বাংলাদেশি স্মার্ট কার্ড নিবন্ধনের সত্যতা পাওয়া যায়। তবে, চালাকি করে তিনি তার স্মার্ট কার্ড কক্সবাজার থেকে না করিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে করিয়েছেন এবং স্মার্ট কার্ডে নিজের নাম কিঞ্চিৎ বদলে দিয়েছেন। এর কারণ কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থাকার কারণে ভোটার তালিকাভুক্তির সময় এখানে ব্যাপক যাচাই-বাছাই করা হয়।

নুর মোহাম্মদের স্মার্ট কার্ডের নম্বরের সূত্র ধরে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে অনুসন্ধান চালানো হলে বেরিয়ে আসে নানা তথ্য। সেখানে দেখা যায়, নুর মোহাম্মদ ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীনে বাংলাদেশি স্মার্ট কার্ড তৈরি করিয়েছেন। এই কার্ডে তার জন্ম তারিখ দেখানো হয়েছে ২৫ নভেম্বর, ১৯৮৩ এবং নাম বদলে নুর আলম করা হয়েছে। তার ভোটার এলাকা (এরিয়া কোড) হিসেবে বার্মা কলোনীকে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশি স্মার্টকার্ডে তার স্থায়ী ঠিকানা হলো- পশ্চিম ষোলশহর পার্ট-২, হিলভিউ রোড, ৪২১১ পাচঁলাইশ, চট্টগ্রাম।

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার শিমুল শর্মা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "অনেক রোহিঙ্গা নানাভাবে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে চায়। কিন্তু কক্সবাজার নির্বাচন অফিসে ভোটার হতে অনেক বেশি তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সম্মুখীন হতে হয় বলে এখানে সুবিধা করতে পারে না রোহিঙ্গারা। তাই চট্টগ্রামে গিয়ে কোনো না কোনোভাবে এই রোহিঙ্গা বাংলাদেশি ভোটার হয়েছে।"

চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মনির হোসেন খানকে এবিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের ভোটার হওয়ার জন্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে চেষ্টা করছে। এবিষয়ে আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। ইতোমধ্যে স্মার্টকার্ড পেয়েছে এমন কিছু রোহিঙ্গাকে আমরা তালিকাভুক্ত করেছি। তবে, রোহিঙ্গা নুর মোহাম্মদের স্মার্টকার্ডটি ভুয়াও হতে পারে। এই ব্যাপারটিও তদন্ত করে দেখতে হবে।"

একজন রোহিঙ্গা ডাকাতের বাংলাদেশি সম্পদের পাহাড়

এদিকে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রাশেদ মাহামুদ আলীর সাথে কথা বলে এই রোহিঙ্গা ডাকাতের ব্যক্তিগত জীবন, উত্থান ও সম্পদের একটি হিসাব পাওয়া যায়।

ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদ মাহামুদ জানান, ১৯৯১ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসেন নুর মোহাম্মদ। হ্নীলা ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডে জাদিমুরা এলাকায় প্রথমে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন তিনি। পরে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের নিয়ে তিনি একটি ডাকাতির দলে গড়েন এবং বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি শুরু করেন। ডাকাতির জন্য ২ বছর জেলও খাটেন তিনি। পরে ডাকাতি করে পাওয়া টাকা দিয়ে তিনি জাদিমুরা এলাকায় একটি জমি কিনে বাড়ি বানান। বর্তমানে বাংলাদেশে নুর মোহাম্মদের ৪টি বাড়ি রয়েছে বলেও জানান ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদ মাহামুদ। এসব বাড়ির মধ্যে একটি পাকা ভবন, একটি দু’তলা ভবন, একটি টিনের ঘর এবং একটি বাগান বাড়ি।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরও জানান, ২ বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসা শুরুর করলে তার তৎপরতা বেড়ে যায়। প্রতিটি রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে কাউকে না কাউকে বিয়ে করেন তিনি। পরে ক্যাম্পগুলোতে আধিপত্য বাড়াতে শুরু করেন তিনি। প্রতিটি ক্যাম্পে স্ত্রী থাকায় এই কাজটিও তার জন্য অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়।

সর্বশেষ চলতি বছরের ২২ আগস্ট টেকনাফের যুবলীগ নেতা ওমর ফারুককে হত্যা করে আলোচনায় আসেন নুর মোহাম্মদ। এই হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষিতে রবিবার ভোরে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন তিনি।