• বুধবার, অক্টোবর ২৩, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৭ রাত

ইউজিসির সিদ্ধান্ত মানছে না শাবি, অনেক বিভাগে পড়ানো হয় না বাংলা

  • প্রকাশিত ১২:৪৩ দুপুর সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৯
শাবিপ্রবি
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন।

এর উদ্দেশ্য ছিল মানবিক শিক্ষা দিয়ে জঙ্গিবাদের পথ থেকে শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনা। তবে দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাবিতেই এ সিদ্ধান্ত মানা হচ্ছে না

বাংলাদেশের ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে ধারণা দিতে দেশের সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা বিষয়ক কোর্স চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। তবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ বিভাগই ইউজিসির এ সিদ্ধান্ত মানছে না। ইউজিসির নির্দেশনা বাস্তবায়নে বিভাগগুলোর উদাসীনতাকে নিজ ভাষার প্রতি অবজ্ঞার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট ইউজিসির পূর্ণ কমিশনের ১৪৪তম সভায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব বিভাগে ১০০ নম্বরের ৩ ক্রেডিটের বাংলা কোর্স চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই কোর্সের মাধ্যমে ‘বাংলা ভাষা ও ধ্বনি, উচ্চারণ রীতি, প্রমিত বাংলা বানান ও উচ্চারণ, ভাষার অন্তর্নিহিত গুণ, বাংলা লিখন দক্ষতা ও ব্যবহারিক বাংলাসহ বাছাইকৃত কবিতা ও প্রবন্ধ’ পড়ানোর কথা ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল মানবিক শিক্ষা দিয়ে জঙ্গিবাদের পথ থেকে শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনা। তবে দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাবিতেই এ সিদ্ধান্ত মানা হচ্ছে না। খবর বাংলা ট্রিবিউনের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৯১-৯২ শিক্ষাবর্ষ থেকে তিনটি বিভাগ নিয়ে শাবি যখন পথচলা শুরু করে, তখন সব বিভাগের জন্যই বাংলা কোর্স বাধ্যতামূলক ছিল।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮টি বিভাগ থাকলেও বাংলা বিভাগসহ আটটি বিভাগে বাংলা ভাষা কোর্স নন-মেজর সাবজেক্ট হিসেবে পড়ানো হয়। এরমধ্যে লোকপ্রশাসন, নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, সমাজকর্ম, ইংরেজি, পলিটিক্যাল স্টাডিজ ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগেই কেবল বাংলা কোর্স রয়েছে। বাকি ২০টি বিভাগে বাংলা কোর্স পড়ানো হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ আজম সম্প্রতি শাবিতে অনুষ্ঠিত ‘উপনিবেশিকতা, বাংলা ভাষা পরিস্থিতি ও রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামের এক সেমিনারে বলেন, “বাংলার প্রতি অবজ্ঞা ও ইংরেজির প্রতি বাধ্যবাধকতা প্রমাণ করে আমরা এখনও উপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি। অন্যদিকে, বিশ্বের সব সফল জাতিই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে তাদের মাতৃভাষায়।”

এদিকে, বাংলা কোর্স না পড়ানোর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও বিভাগীয় প্রধানরা পরস্পরকে দায়ী করছেন। কোর্স চালু বিষয়ে ডিনরা বলছেন— এ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিভাগের। অন্যদিকে বিভাগীয় প্রধানরা বলছেন— কোর্স অন্তর্ভুক্তির দায়িত্ব ডিন অফিস ও একাডেমিক কাউন্সিলের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে কয়েক বছর আগেও বাংলা পড়ানো হতো। তবে বর্তমানে কোর্সটি সিলেবাস থেকে বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরিসংখ্যান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আহমেদ কবীর চৌধুরী বলেন, “যেকোনো কোর্স পড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও ডিন অফিস থেকে তা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। আমাদের বিভাগে দীর্ঘদিন বাংলা কোর্স পড়ানো হয়নি, তাই পরে সিলেবাস থেকে তা বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আলম বলেন, “এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ একাডেমিক কাউন্সিল ও অনুষদের ডিনের ওপর নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে বিভাগের কোনও এখতিয়ার নেই।”

তবে অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবুল মুকিদ মোহাম্মদ মোকাদ্দেস বলেন, “প্রত্যেক বিভাগের একটি সিলেবাস কমিটি আছে, সেখানে বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও দু’জন শিক্ষক থাকেন। তারা মিলে একটি সিলেবাস তৈরি করে ডিন অফিসে পাঠান— যা পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদন দেওয়া হয়।”

তিনি আরও বলেন, “কোনো কোর্স আবশ্যিক হিসেবে পড়ানোর সিদ্ধান্ত একাডেমিক কাউন্সিলই দিয়ে থাকে। কোন বিভাগে কোন কোর্স বাদ দেওয়া বা অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তার সুপারিশ করে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। কেবল এরপরই একাডেমিক কাউন্সিল অনুমোদন দেয়।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল করিম বলেন, “কোনো কোর্স পড়নোর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলই অনুমোদন দেয়। একাডেমিক কাউন্সিল ডিন অফিস ও বিভাগীয় সিলেবাস কমিটিকে একটি কোর্স গাইডলাইন দেয়, সেখানে কোন কোন কোর্স সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত থাকবে সে বিষয়ে ধারণা থাকে। তবে বেশিরভাগ সময় বিভাগের সিলেবাস কমিটি যে কোর্স আউটলাইন দেয়, সেটাই একাডেমিক কাউন্সিল অনুমোদন দিয়ে দেয়।”

তিনি আরও বলেন, “তবে বাংলা মানবিক কোর্স হিসেবে যদি কোনো বিভাগ পড়াতে চায়, তাহলে পড়াতে পারবে। কেননা, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমে শুরু থেকে বাংলা কোর্স পড়ানো হতো। তবে কেন জানি বর্তমানে বিভাগগুলো এ কোর্স সিলেবাসে রাখছে না। সবাই এ কোর্স থেকে বিমুখ হয়ে গেছে।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আশ্রাফুল করিম বলেন, “আমরা ভাষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে সমৃদ্ধ। বাঙালি হিসেবে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ইতিহাস সবার জানা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাংলা ভাষা কোর্স পড়ানোর সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই।” সব বিভাগে এ কোর্স পড়ানো উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, “সব বিভাগে বাংলা ভাষা কোর্স চালুর বিষয়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু এ নিয়ে কোনো উদ্যোগ এখনও নেওয়া হয়নি।”

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “২০১৬ সালে আমি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম না, এক্ষেত্রে বিষয়টি আমি অবগত নই। আমি শিগগিরই এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবো।”