• রবিবার, অক্টোবর ২০, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:০০ রাত

শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ, জাবি ছাত্রীর ‘আত্মহত্যার’ চেষ্টা

  • প্রকাশিত ০৯:২৫ রাত সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৯
জাবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। ছবি: সংগৃহীত

গুরুতর অবস্থায় তাকে সাভারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নেওয়া হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সরকার ও রাজনীতি বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই বিভাগের ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিকার না পেয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ওই ছাত্রী ‘আত্মহত্যার’ চেষ্টা করেছেন বলেও জানা গেছে।

ভুক্তভোগী ছাত্রীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, বিভাগে গত এক বছর ধরে যৌন হয়রানির অভিযোগ করে লড়ে আসছিলেন তিনি। কিন্তু বিচার না পেয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে ২৬টি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ‘আত্মহত্যার’ চেষ্টা করেন। গুরুতর অবস্থায় তাকে সাভারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নেওয়া হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। 

বৃহস্পতিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ছাড় দিয়েছে।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সানওয়ার সিরাজের বিরুদ্ধে বিভাগীয় সভাপতি বরাবর যৌন হয়রানির লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। 

বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা জানিয়েছেন, অভিযোগটি গতকাল (২৫ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলে পাঠানো হয়েছে।

লিখিত অভিযোগে ওই ছাত্রী জানান, ২০১৮ সালে তিনি তার তৃতীয় পর্বের একটি কোর্সের মানোন্নয়ন পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য তিনি কোর্স শিক্ষক অভিযুক্ত সানওয়ার সিরাজের শরণাপন্ন হন। তিনি ওই ছাত্রীর ফোন নম্বর নেন এবং যেকোনো সমস্যায় যোগাযোগ করতে বলেন। পরদিন শিক্ষক নিজেই ওই ছাত্রীকে ফোন করে পরীক্ষা কেমন হয়েছে জানতে চান। সেদিন রাতে শিক্ষক সানওয়ার সিরাজ ছাত্রীর ফেসবুক মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করে তার সঙ্গে ঘোরাফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। 

ভুক্তভোগী ছাত্রী বলেন, ‘‘হঠাৎ করে তার এমন আচরণে আমি বিস্মিত হই। পরবর্তীতে আমি বিভাগে গিয়ে তার ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছিল কি না জানতে চাই। কিন্তু তিনি নিশ্চিত করেন, আইডি হ্যাক হয়নি। তিনি নিজেই ওসব মেসেজ পাঠিয়েছেন।’ ’ 

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘‘ওই শিক্ষক আমাকে তার সঙ্গে সময় কাটানো ও ঘোরাঘুরির প্রস্তাব দেন। তার এমন আচরণে আমি বিব্রত বোধ করতে থাকি। ফলে বারবার ফেসবুক আইডি ডিএক্টিভ করি। কিন্তু তিনি অব্যাহতভাবে আমাকে উত্যক্ত করতে থাকেন।’’

এসব ঘটনার পর ওই ছাত্রী শিক্ষক সানওয়ার সিরাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সিদ্ধান্ত নেন। ঘনিষ্ঠজনদের বিষয়টি জানালে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা সামনে রেখে তারা তাকে অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকতে বলেন এবং কৌশলে ওই শিক্ষককে এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন।   

ওই ছাত্রী বলেন, ‘‘পরীক্ষা চলাকালে ওই শিক্ষক আমাকে জামা উপহার, রেস্টুরেন্টে খাওয়া, রাতে একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়া এবং স্ত্রীর অনুপস্থিতে তার বাসায় রাত যাপনের প্রস্তাব দেন। তিনি চরম আপত্তিকর কথাবার্তা বলেন এবং কুপ্রস্তাব দেন। ব্যর্থ হয়ে তিনি তার কোর্সে আমাকে কম নম্বর দেন। আমি তার ধারাবাহিক অত্যাচারে মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি।’’ 

পরে তিনি মনরোগ বিশেষজ্ঞের শরনাপন্ন হন বলে জানান ওই ছাত্রী।

বিভাগে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত এক সেমিনারে নিজের যৌন হয়রানির বিষয়টি উত্থাপন করায় বিভাগের তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক সামসুন্নাহার খানম তার ওপর ক্ষিপ্ত হন বলে অভিযোগ করেন ওই ছাত্রী। 

অভিযোগমতে,  তৎকালীন সভাপতি ওই সেমিনারে তার বক্তব্যে বলেন, ‘‘এটি পাবলিক ফোরাম। একজন ছাত্রীর করা অভিযোগ বিভাগের মানসম্মানের সঙ্গে জড়িত। তথ্যপ্রমাণসহ তাকে লিখিত অভিযোগ করতে হবে। অন্যথায় আমি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেব।’’ 

ওই ছাত্রী বলেন, ‘‘আমি যৌন হয়রানির তথ্যপ্রমাণ বিভাগের তৎকালীন সভাপতির কাছে হস্তান্তর করলে তিনি আমাকে সহানুভূতি জানিয়ে এসব ভুলে গিয়ে ক্যারিয়ারের দিকে নজর দিতে বলেন। আর অভিযোগের গোপনীয়তা রক্ষা না করে তিনি বিষয়টি শিক্ষকদের মাঝে ছড়ান।’’

এ বিষয়ে বিভাগের সদ্য সাবেক সভাপতি অধ্যাপক সামসুন্নাহার খানম বলেন, ‘‘আমাকে কোনো ধরনের লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। আমার নামে বানোয়াট কথা বলা হচ্ছে।’’

এদিকে, অভিযুক্ত শিক্ষক সানওয়ার সিরাজের মন্তব্য জানতে তার সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। বৃহস্পতিবার ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে একাধিকবার বিভাগে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। দুপুর ও বিকেলে বিভাগে গিয়ে তার কক্ষ তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে। তার মুঠোফোন নম্বরটিও বন্ধ রয়েছে।

বিভাগের বর্তমান সভাপতি নাসরিন সুলতানা বলেন, ‘‘আমি গত ১৯ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্রটি হাতে পাই। সে কিছু তথ্যপ্রমাণ সরবরাহ করতে চেয়েছিল। পরবর্র্তীতে আমি গত ২৫ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেলে হস্তান্তর করি।’’

এ বিষয়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলের প্রধান নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আখতার বলেন, ‘‘অভিযোগপত্রটি পেয়েছি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই।’’