• শুক্রবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৬ রাত

পর্যটকদের কাছে আর্কষণীয় হয়ে উঠছে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল

  • প্রকাশিত ১০:১৭ রাত অক্টোবর ৩, ২০১৯
টাঙ্গুয়ার হাওর
টাঙ্গুয়ার হাওরের অপার সৈন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে অসচেতন পর্যটকেরা হাওরটিকে আরো বিপন্ন করে তুলছেন। সৈয়দ জাকির হোসাইন/ঢাকা ট্রিবিউন

প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক দল টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে আসছেন। মাঝে মধ্যে আসছেন বিদেশি পর্যটকরাও। বিলাহবহুল ট্রলার থাকায় পর্যটকদের অনেকেই হাওরে এখন রাত্রি যাপনও করে থাকেন

টাঙ্গুয়ার হাওর, হাসন রাজা মিউজিয়াম, ঐতিহ্য জাদুঘর, বারেকের টিলা, লাউড়ের রাজবাড়ী, গৌরারংয়ের জমিদার বাড়িসহ নানা ঐতিহ্যবাহী ও দৃষ্টিনন্দন এলাকাকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল পর্যটকদের কাছে দিন দিন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। গত দশবছরে প্রতি মাসেই পর্যটকদের সংখ্যা বেড়েছে। পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের স্থান হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে টাঙ্গুয়ার হাওর। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক দল টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে আসছেন। মাঝে মধ্যে আসছেন বিদেশি পর্যটকরাও। বিলাহবহুল ট্রলার থাকায় পর্যটকদের অনেকেই হাওরে এখন রাত্রি যাপনও করে থাকেন। উপজেলা সদরে আবাসিক হোটেল থাকলেও হাওর দেখতে আসা ৯৫ ভাগ পর্যটকই নৌকায় রাত্রিযাপন করেন।

প্রতিটি দলে থাকছেন ১৫ থেকে ২০ জন করে পর্যটক। সাধারণত ছুটির দিনেই পর্যটকদের আগমন বেশি হয়। টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে এসে পর্যটকরা মেঘালয় সীমান্ত সংলগ্ন দেশের বৃহত্তম শিমুল বাগান, শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রী লেক), লাকমা ছড়া, চাঁনপুর ঝর্ণা, বড়গোপ টিলা (বারেক টিলা), যাদুকাটা নদী ছাড়াও হাওর, সীমান্তে বসবাসকারী পরিবার এবং আদিবাসীদের জীবনযাপন দেখে মুগ্ধ হন। পর্যটকদের সুবিধার্থে এসব এলাকায় নানা ধরনের কাজে স্থানীয়রা সম্পৃক্ত আছেন। হাওরে ঘুরে বেড়ানো ও রাত্রিযাপনের একমাত্র ব্যবস্থা নৌযান হওয়ায় অনেক বাহারী ও বিলাসবহুল নৌযান গড়ে উঠেছে তাহিরপুর উপজেলায়। বিলাসবহুল অন্তত ২০টি নৌযান পর্যটকদের ভ্রমণকে নিরাপদ ও আনন্দময় করতে ভাড়ায় চলছে। এ ছাড়াও ছোট বড় আরো শতাধিক নৌযান রয়েছে ভাড়ায় চালিত।

তাহিরপুর উপজেলার রতনশ্রী গ্রামের আতাউর রহমান তালুকাদার জানান, হাওর দেখতে আসা পর্যটকদের জন্য তিনিই প্রথম বিলাসবহুল নৌযান নির্মাণ করেন। এ নৌযানে দিনের বেলায় ১৫০ থেকে ২শ’ পর্যটক ঘুরে বেড়াতে পারেন। রাত্রি যাপনের জন্য ২২ জন পর্যটকের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এতে আলাদা কেবিন আছে, দুইটি খাট আছে। আছে বালিশ, লেপ, তোষক ও মশারির ব্যবস্থা। নৌযানটিতে তিনটি টয়লেট রয়েছে, এর মধ্যে একটি হাই কমোড আর দুইটি ফ্ল্যাট কমোড। ফ্লাট কমোডের একটি নৌকার স্টাফদের জন্য। নিজস্ব পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য আলাদাভাবে বেসিন দেওয়া আছে। বেসিন ও টয়লেটে পানি সরবহরাহের জন্য তিনশ’ লিটার পানি ধারণ ক্ষমতার ট্যাংকি রয়েছে নৌযানটিতে। নৌযানের নিজস্ব মোটরে রিজার্ভ ট্যাংকিতে পানি উঠানো হয়। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবাহের জন্য আইপিএস এর ব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে ল্যাপটপ মোবাইল সবই চার্জ দেওয়া যায়। আর আলোর ব্যবস্থাতো আছেই। আইপিএসটি নৌকার ইঞ্জিন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জ হয়ে থাকে। ইঞ্জিনের শব্দদুষণ ঠেকাতে থাই গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে। শক্তিশালী ইঞ্জিনে চলা নৌযানটির গতি কমানো বাড়ানোর জন্য অটো গিয়ারের ব্যবস্থা রয়েছে। নৌযানটির ছাদে এক সাথে দেড় শ’ লোক যে কোন অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারে।


আরো পড়ুন - পর্যটকদের অসচেতনতা: হুমকির মুখে টাঙ্গুয়ার হাওর


টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে আসা পর্যটকরা সুনামগঞ্জ শহরের মরমি কবি হাসন রাজার বাড়ি’র হাসন রাজা মিউজিয়াম, ঐতিহ্য জাদুঘর ও গৌরারং জমিদার বাড়ির প্রাচীন ঐতিহ্যও দর্শন করছেন। টাঙ্গুয়ার হাওরে আসা পর্যটকেরা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পরিবেশ বিশুদ্ধ রাখা এবং নৌযান আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বললেন তিনি।

তাহিরপুরের বাসিন্দা, লেখক, সাংবাদিক ও শিক্ষক নেতা গোলাম সরোয়ার লিটন জানালেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে বিলাসবহুল অন্তত ২০টি নৌযান পর্যটকদের ভ্রমণকে নিরাপদ ও আনন্দময় করতে ভাড়ায় চলছে। এছাড়াও ছোট-বড় আরো শতাধিক নৌযান রয়েছে, পর্যটকদের নিয়ে হাওরে ভাড়ায় চালিত।

স্টিলের পাটাতনে নির্মিত ছয়টি আকর্ষণীয় নৌযান তাহিরপুর উপজেলা সদর থেকে পর্যটকদের নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই হাওর ঘুরছে এবং পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দে রাত কাটাচ্ছেন এসব নৌযানে।

ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা সোহান রহমান বললেন, “টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ লেক, বারেকের টিলা ও যাদুকাটায় আসলে যে কারো মন জুড়িয়ে যাবে। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভরপুর এ সীমান্তজোন দেশের বৃহত্তম পর্যটকজোন হতে পারে। এই হাওর ঘুরে মনে হয়েছে, এখানকার সুবিধাজনক স্থানে পর্যটন মোটেল, কিংবা একটু ভালো মানের রেস্টুরেন্ট বা আবাসিক হোটেল বা কটেজ হতে পারে। রাতে পুলিশি নিরাপত্তা আরেকটু বেশি থাকলে ভালো হয়।”

টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে গিয়ে শহরের আরপিননগরের মেহেদী হাসান বলেন, “হাওরের প্রকৃতি-পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের সচেতন করতে হবে। টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকরা প্রবেশের সময়ই টাঙ্গুয়ার হাওরের অবস্থান এবং পর্যটকদের করণীয় শীর্ষক ছোট প্রকাশনা অর্থের বিনিময়ে তুলে দেওয়া যেতে পারে।”

ঢাকার বনানীর বাসিন্দা ক্রিস্টিনা গোমেজ বললেন, “টাঙ্গুয়ার হাওর দর্শনের জন্য সুবিধাজনক স্থানে আরও কয়েকটি পর্যটক টাওয়ার করা জরুরি।”


আরো পড়ুন - প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে খাঁচার পাখি অবমুক্ত করে সমালোচনায় মেয়র খোকন


তাহিরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম জানালেন, পর্যটকরা তাহিরপুর, টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক, বারেকের টিলা, যাদুকাটা ভ্রমণ করে ফিরতে চান, সেই অনুযায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নয়ন চান। ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তাহিরপুর উপজেলা সদরের সমাবেশে বলেছিলেন, তাহিরপুরের হাওর, লাউড়ের রাজবাড়ী ও সীমান্ত এলাকাকে ঘিরে পর্যটকজোন গড়ে তোলা হবে। আমাদের প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়ন হবে।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হায়াতুননবী টাঙ্গুয়ার হাওরে আসা পর্যটক ও নৌযান প্রসঙ্গে এই প্রতিবেদককে বলেন, “টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকবাহী নৌযানগুলোর উপর তাহিরপুর থানা ও ট্যাকেরঘাট পুলিশ ফাঁড়ির কড়া নজরদারি রয়েছে। হাওরে সময়ে সময়ে পুলিশ টহলও দিচ্ছে। সকল নৌযান চালকদের স্থানীয় থানা ও ফাঁড়ির পুলিশ অফিসারদের এমনকি, জেলা পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের মুঠোফোন নম্বরও দেওয়া আছে।”

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, “টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটক আকর্ষণীয় নৌকা বাড়ানো ও ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে নৌ-মালিকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। টাওয়ার বাড়ানোর জন্যও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলা হবে।”

গত ২১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের পর্যটন সম্ভাবনাময় সকল স্থাপনা ও স্থান সরেজমিনে ঘুরে দেখে পর্যটন কর্পোরশেনের চেয়ারম্যান রাম চন্দ্র দাস জানান, পর্যটক আকর্ষণীয় সকল স্থাপনাকে একটি নেটওয়ার্কে এনে যোগাযোগ, থাকাসহ সকল উন্নয়নের চিন্তা করা হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী ইকবাল আহমদ বলেন, “সুনামগঞ্জ এলজিইডি’র পক্ষ থেকে এখনো জেলার কোনো অঞ্চলকে ঘিরে পর্যটন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। পর্যটন কর্পোরেশন ও সুনামগঞ্জ এলজিইডি’র যৌথ কোনো আলোচনাও এনিয়ে হয়নি।”