• সোমবার, অক্টোবর ২১, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৩ রাত

পা জড়িয়ে শিশু গৃহকর্মীর বাঁচার আকুতি, তবুও পেটাচ্ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা

  • প্রকাশিত ০৮:৪৬ রাত অক্টোবর ৭, ২০১৯
পুলিশ
প্রতীকী ছবি

মায়ের সামনেই শিশুটিকে পেটাতে থাকেন এসআই জুবায়ের। এ সময় শিশুটি বার বার বলছিল, “আমি চুরি করিনি”। তারপরও কোনো কথা শোনেননি ওই পুলিশ কর্মকর্তা

স্বর্ণের চেইন চুরির অভিযোগে সিলেটে হোমিও চিকিৎসক দম্পতি ও পুলিশ উপপরিদর্শকের (এসআই) নির্যাতনের শিকার হয়েছে এক গৃহপরিচারিকা শিশু। কেবল শিশুটিই নয়, তার মা ও ভাইকেও নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ কর্তৃক নির্যাতনের অভিযোগের ঘটনা খতিয়ে দেখতে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে একটি সূত্র। 

রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর পর্যন্ত সিলেট কোতোয়ালী থানায় আটকে রেখে ১৩ বছর বয়সী এই মেয়ে শিশুকে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন শিশুটির মা।  

নির্যাতিতা শিশুটির মায়ের অভিযোগ, কেবল তার মেয়েটিই নয়, সাথে তার দুই ছেলেকেও আটক করে থানায়ি নিয়ে আসা হয়েছে। 

তিনি জানান, তাদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ হওয়ায় পরিবারের অন্য সদস্যরাও বাসা-বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন, পুরুষ সদস্যরা কাজ করেন বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয়। ৬ মাস আগে ডা. সাবিহা সুলতানার বাসায় কাজ করতে পাঠান তার মেয়েকে। রবিবার দুপুরে খবর পান, তার মেয়েকে নির্যাতন করছেন ডাক্তার সাবিহা ও তার স্বামী। খবর পেয়ে প্রথমে তিনি নিজে না গিয়ে তার এক আত্মীয় মহিলাকে পাঠান ওই বাসায়। তার ঐ আত্মীয় ভিক্ষাবৃত্তি করে চলেন। ততক্ষণে  ‘৯৯৯’-এ ফোন দিয়ে কোতোয়ালী থানার পুলিশ ডেকে নিয়ে যান ডাক্তার সাবিহা। পুলিশ আসার খবর পেয়ে তিনি নিজে (মেয়েটির মা) ও পরিবারের কয়েকজন সদস্য ওই বাসায় যান। এ সময় শিশুটির মা ও পরিবারের সদস্যদের সামনেই ‘বাসার স্বর্ণের চেইন চুরি’র অজুহাতে মেয়েটিকে পেটাতে থাকেন কোতোয়ালী থানার এসআই জুবায়েদ খান। মেয়েটি ও তার পরিবারের সদস্যরা বহু কাকুতি-মিনতি করছিলেন, তাকে মারধর না করতে। এ সময় শিশুটি বার বার বলছিল, “আমি চুরি করিনি”। তারপরও কোনো কথা শোনেননি এসআই জুবায়ের।    

শিশুটির মা আরো অভিযোগ করেন, পুলিশ আসার আগেও ডা. সাবিহা ও তার স্বামী মুসলিম আলীও নির্যাতন করেন মেয়েটিকে। তবে পুলিশের এসআই তার চোখের সামনেই মেয়েকে পেটান। এ সময় তার মেয়েটি পুলিশ অফিসার জুবায়েরর পায়ে জড়িয়ে ধরলেও তিনি পেটাতে থাকেন। পুলিশের লাঠির আঘাতে মেয়েটির উরুতে দগদগে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফুলে গেছে। 

অন্যদিকে, মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়ার সময় তার দুই ভাইকেও ধরে নিয়ে যায় ও তাদেরও বেধড়ক মারধর করেন ওই পুলিশ সদস্য। 

মেয়েটির মা অভিযোগ করে বলেন, মেয়েটি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ওই বাসায় কাজ করতো। এ ছাড়া গত ৬ মাসের বেতনও আটকা (বকেয়া) ছিলো তাদের কাছে। বড় হলে বিয়ে দিতে কাজে লাগবে অজুহাতে বেতন দিচ্ছিলেন না তারা। পরে রবিবার সকালে মেয়েটি আর ঐ বাসায় কাজ করবে না জানিয়ে বেতন চাইলে তারা ঐ চুরির নাটক সাজায়। 

অভিযোগের বিষয়ে কোতোয়ালী মডেল থানার এসআই জুবায়েদ খান জানান, ‘৯৯৯’-এ কল পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। ডা. সাবিহা দম্পতি জানান, ওই মেয়েটি তাদের বাসায় কাজ করে ও স্বর্ণের চেইন চুরি করেছে। মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে উল্টাপাল্টা কথা বলে। এতে সন্দেহ আরো বেড়ে যায়। এ ছাড়া একজন ভিক্ষুক মহিলাকে মা বানিয়ে সে ছাড় পাওয়ার চেষ্টা করে। পরে ধরা পড়ে ওই মহিলা তার মা নয়। এ সময় মেয়ে শিশুটিকে মারধরের কথা অস্বীকার করেন এসআই জুবায়েদ। 

তিনি দাবি করেন, পুলিশ পৌঁছার আগে কেউ মারধর করলে তা জানা নেই। মেয়েটির সাথে দুই ভাইকে কেন ধরে নিয়ে এলেন এমন প্রশ্নের জবাবে এসআই জুবায়েদ বলেন, “অভিযোগকারীরা হুমকি মনে করছে, তাদের তিন সন্তান রয়েছে। দুই ভাই তাদের ক্ষতি করতে পারে বলে আশংকা করছে। এর জন্য তাদের আটক করা হয়েছে।”

এদিকে রবিবার রাতে কোতোয়ালী থানা হাজতে ‘নির্যাতনের শিকার’ শিশুটির সঙ্গে এই প্রতিবেদকসহ অন্যান্য সাংবাদিকদের কথা হয়। সাংবাদিকদের সাথে পুলিশের এসআই জুবায়েদ খানের সামনেই কথা হয় মেয়েটির। 

হাজতে কাঁথা মুড়িয়ে শুয়ে থাকা মেয়েটিকে ডাক দিলে সে কোনো রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়ে হেঁটে এসে সাংবাদিকদের সামনে আসে। এ সময় শিশুটি তার ফুলে যাওয়া হাতের কবজি ও পা দেখায়। 

কিভাবে এমন হলো জানতে চাইলে এসআই জুবায়েদ খানকে দেখিয়ে বলে, তিনি (এস আই জুবায়েদ) লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এমন অবস্থা করেছেন। এছাড়া দেখা যায়, হাজতখানার পাশাপাশি কক্ষে একটিতে দুই ভাই ও অপরটিতে ওই শিশুটিকে আটক করে রাখা হয়েছে।   

এ বিষয়ে কথা বলতে চাইতে প্রথমে ডা. সাবিহা আলম শিশু নির্যাতনের বিষয়ে কিছু বলতে চাননি। এরপর তিনি জানান, তার বাসায় মেয়েটি চুরি করেছে। এর জন্য ৯৯৯ কল করে পুলিশ ডেকে নিয়ে তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। শিশুটিকে নির্যাতন করা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার স্বামী বা তাদের কেউ নির্যাতন করেননি। 

মেয়ের শরীরে হাতে এবং পায়ে আঘাতের একাধিক চিহ্ন এলো কিভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেটা পুলিশ বলতে পারবে। আমরা কেবল পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি।”

থানায় কয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা কেবল মেয়েটিকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি, পরে শুনেছি ওর দুই ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। মামলার ব্যাপারে কিছু জানি না।”

নির্যাতিতা মেয়ের বাবা জানান, পুলিশ মেয়ের সাথে তার মাকে পিটিয়েছে। দেশের কোথাও এমন নজির আছে বলে জানা নেই। 

এদিকে কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিম মিঞা থানা হাজতে আটক শিশুটির বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। 

তিনি দাবি করেন, “ওই মেয়ের বয়স ১৯। তবে মেয়েটির কথিত মাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মেয়েকে আটকের সাথে তার মায়ের উপর নির্যাতনের বিষয়টি আমার জানা নেই।”

কোতয়ালী থানার সহকারী কমিশনার(এসি) মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, “শিশু ও তার দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে থানায় একটি চুরির মামলা হয়েছে। মেয়েটির বয়স ১৫/১৬ হবে।”