• বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৪:১৭ বিকেল

ইতিহাসের সাক্ষী টাঙ্গাইলের নবাব প্যালেস

  • প্রকাশিত ১২:১৬ দুপুর নভেম্বর ১, ২০১৯
টাঙ্গাইল ধনবাড়ী নবাব প্যালেস
টাঙ্গাইল ধনবাড়ী নবাব প্যালেস ঢাকা ট্রিবিউন

গোলাপের পাপড়ি, কামিনীর পাতা যেন গুণগুণ সুরে গেয়ে যায় রোমান্টিক কড়চা। ফুলের পাপড়িতে যেন আজও লেগে আছে রাজকুমারীর হাতের স্পর্শ

নেই জমিদারী প্রথা, কালের বিবর্তনে জৌলুস হারিয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জমিদারবাড়িগুলো। কিন্তু কালের সাক্ষী হয়ে জমিদারী প্রথার স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো। তেমনই একটি বাড়ি টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর “নবাব প্যালেস”। স্থানীয়দের কাছে এটি “নবাব মঞ্জিল” নামেও পরিচিত। শতবর্ষী এই বাড়ির নির্মাণশৈলী রীতিমতো মনোমুগ্ধকর।

ধনবাড়ীর “নবাব প্যালেস” এর ক্ষয়িষ্ণু চুন-সুরকির আস্তরে লুকিয়ে আছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ঐতিহ্য। এই বাড়ি সাক্ষী দেয় বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত জমিদারদের রুচির। দেয়ালের পরতে পরতে সৌন্দর্যের ছোঁয়া। এগুলো যেন শুধুই দেয়াল নয়, ইতিহাস বইয়ের প্রাণবন্ত পাতা। যেখান থেকে আমাদের নবীন চোখ সহজেই পড়ে নিতে পারে সুদূর অতীতের ইতিহাস। 

বাড়িটির সামনের সুবিস্তৃত বাগান যেন এখনও জমিদারদের বিলাসী জীবনের সুবাস ছড়ায়। গোলাপের পাপড়ি, কামিনীর পাতা যেন গুণগুণ সুরে গেয়ে যায় রোমান্টিক কড়চা। ফুলের পাপড়িতে যেন আজও লেগে আছে রাজকুমারীর হাতের স্পর্শ। তাই দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসু ও ইতিহাসপ্রেমী মানুষ বারবার ছুটে যায় ধনবাড়ীর জমিদারবাড়িতে।

আঠার শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই জমিদার বাড়িটির প্রতিষ্ঠা করেন জমিদার খান বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার অন্যতম প্রস্তাবক এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রথম মুসলিম মন্ত্রী। তারই অমর কীর্তি ধনবাড়ী জমিদারবাড়ি বা নওয়াব প্যালেস। 

এই জমিদারদের রয়েছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ইতিহাস। ধারণা করা হয়, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ধনপতি সিংহকে পরাজিত করে মোগল সেনাপতি ইস্পিঞ্জর খাঁ ও মনোয়ার খাঁ ধনবাড়ীতে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের কয়েক পুরুষ পরের নবাব ছিলেন সৈয়দ জনাব আলী। সৈয়দ জনাব আলী ছিলেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর বাবা। তিনি তরুণ বয়সে মারা যান।

নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বিয়ে করেন বগুড়ার নবাব আবদুস সোবহানের মেয়ে আলতাফুন্নাহারকে। এই দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান। আলতাফুন্নাহারের মৃত্যুর পর নবাব বিয়ে করেন ঈশা খাঁর শেষ বংশধর সৈয়দা আখতার খাতুনকে। নওয়াব আলী চৌধুরীর তৃতীয় স্ত্রীর নাম ছিল সকিনা খাতুন। ১৯২৯ সালে মারা যান নওয়াব আলী চৌধুরী। ওয়াকফ নামায় তিনি নিজের তৃতীয় স্ত্রীর একমাত্র ছেলে সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী এবং মেয়ে উম্মে ফাতেমা হুমায়রা খাতুনের নাম উল্লেখ করে যান।

নবাব প্যালেসের বাগান। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউনসৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী পরবর্তীকালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী নিযুক্ত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৮ সালেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে মারা যান তিনি। এই জমিদারবাড়ির বর্তমান উত্তরাধিকারী তার একমাত্র সন্তান সৈয়দা আশিকা আকবর।

দীর্ঘকাল পেরিয়েছে, পৃথিবী বদলেছে, বদলে গেছে শাসন ব্যবস্থা। ধনবাড়ীও তার ব্যতিক্রম নয়। জমিদার নেই, জমিদারি নেই কিন্তু নওয়াব প্যালেস তার ঐশ্বর্য ও ঐতিহ্য নিয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। 

অপূর্ব স্থাপত্যশিল্পের কারণে ধীরে ধীরে জমিদারবাড়িটি পর্যটকদের টানতে শুরু করে। তাই নবাবের উত্তরাধিকারীরা সেখানে গড়ে তুলেছেন পিকনিক স্পট, যা নবাব সৈয়দ হাসান আলী রয়্যাল রিসোর্ট হিসেবে বেশ খ্যাতি লাভ করেছে। রিসোর্টটি দেখাশোনার দায়িত্বে আছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাইট হাউস গ্রুপ। 

নবাব প্যালেসে যা দেখতে পাবেন

টাঙ্গাইলের বুক চিড়ে বয়ে যাওয়া বংশাই ও বৈরান নদীর মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থিত প্রাচীন এই জমিদারবাড়িটির স্থাপত্যশৈলী ও কারুকাজ সত্যিই মনোমুগ্ধকর। রিসোর্ট তৈরির পর এতে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। মুঘল স্থাপত্যরীতির বাড়িটিতে রয়েছে চারটি গম্বুজ। দক্ষিণমুখী বাড়িটিতে রয়েছে সুদীর্ঘ বারান্দা। ভবনের পূর্বপাশে রয়েছে বড় একটি তোরণ। তোরণের দুই পাশে প্রহরীদের কক্ষ। তোরণটি বানানো হয়েছিল তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। প্রাচীরঘেরা চত্বরে দুটি আবাসিক ভবন ছাড়াও রয়েছে বাগান, মিনি চিড়িয়াখানা, বৈঠকখানা, নায়েবঘর, কাচারিঘর ও পাইক-পেয়াদার বসতি। দর্শনার্থীরা প্রাসাদের ভেতরের বেশ কয়েকটি কামরা ঘুরে দেখতে পারেন। বারান্দায় শোভা পায় মুঘল আমলের নবাবী জিনিসপত্র। চাইলে সেগুলোতে একটু হাত বুলিয়েও আসা যায়। 

দীঘি

প্যালেসের পাশেই রয়েছে ৩০ বিঘা আয়তনের বিশাল, সুগভীর দীঘি। এর পাড়ে রয়েছে শান বাঁধানো ঘাট। ইচ্ছে করলে সৌখিন ভ্রমণপিপাসুরা এখানে নৌকা ভ্রমণ ও মাছ ধরতে পারেন। দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে দুটি সাম্পান। নবাবী ঢঙয়ে পুরো রিসোর্ট ঘুরে দেখার জন্য রয়েছে ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা। চাইলে দেখতে পারেন গারোদের সংস্কৃতি ও নাচ। তবে সেজন্য আপনাকে আগে জানিয়ে রাখতে হবে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে। আরও দেখা যাবে ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা।

যেভাবে যাবেন 

রাজধানীর মহাখালীর টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকা-ধনবাড়ী সরাসরি বাস সার্ভিস রয়েছে। এছাড়া আজমপুর, আবদুল্লাহপুর ও সায়েদাবাদ থেকেও বিভিন্ন পরিবহনের বাসে চড়ে যাওয়া যাবে। ধনবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে একেবারেই কাছে জমিদারবাড়ি। হেঁটে কিংবা রিকশায় যাওয়া যায়। রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে আগে থেকে বললে তারাও গাড়ি পাঠায়। টাঙ্গাইল সদর বাসস্ট্যান্ড থেকেও যেতে পারবেন। 

থাকার ব্যবস্থা

ধনবাড়ী নবাব প্যালেসে আপনি চাইলে নবাবী স্টাইলে। তবে সেটা নির্ভর করবে সামর্থ্যের ওপর। রয়েছে চার ধরনের আবাসন ব্যবস্থা। মঞ্জিল (মূল রাজপ্রাসাদ), প্যালেস (কাচারি ঘর), ভিলা (২০০ বছরের পুরোনো টিনশেড ভবন) এবং কটেজ (সম্প্রতি নির্মিত টিনশেড বাংলো)। মঞ্জিল এবং প্যালেসের খাট, সোফাসহ সব আসবাবপত্র সেই প্রাচীন আমলের যা নবাবরা ব্যবহার করতেন। কিন্তু ভিলা এবং কটেজে নবাবদের আসবাবপত্র পাওয়া যাবে না। ভাড়া এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা। দল বেঁধে গেলে পাওয়া যাবে বিরাট ছাড়। তাছাড়া থাকতে পারেন ধনবাড়ী নওয়াব প্যালেসের অদূরে মধুপুর উপজেলা সদরে অবস্থিত আবাসিক হোটেলগুলোতে।