• মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:২০ রাত

পথশিশুদের কান্না শোনানো 'গাল্লি বয়' এর রূপকারদ্বয়!

  • প্রকাশিত ০৯:৫৭ সকাল সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৯
রানা তবীব
'গাল্লি বয়' রানা ও গানের লেখক, সুরকার মাহমুদ হাসান তবীব সাদ আল ফারাবী/ঢাকা ট্রিবিউন

রানার গাওয়া গানগুলো লিখেছেন এবং সুর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি সাহিত্য বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদ হাসান তবীব। ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তারা জানিয়েছেন গান ও ক্যামেরার পেছনের গল্প

চলতি বছরের মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা শহরের এক পথশিশুর গাওয়া একটি র‍্যাপ গান। 'গাল্লি বয়' টাইটেলের গানটিতে উঠে এসেছিল রানা নামে শিশুটির জীবনের বাস্তবতার গল্প। এরপর মুক্তি পেয়েছে 'গাল্লি বয়' এর আরো দুইটি পর্ব।

রানার গাওয়া গানগুলো লিখেছেন এবং সুর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি সাহিত্য বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদ হাসান তবীবঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তারা জানিয়েছেন গান ও ক্যামেরার পেছনের গল্প।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনার গানের মাধ্যমে রানার গল্প এখন সবাই জানে। আপনি রানাকে খুঁজে পেলেন কিভাবে ?

তবীব: গত বছরের ঘটনা। সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের সামনে দিয়ে একদিন মোটরসাইকেল নিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন রানা বাইকে চড়ার আবদার করে। ওকে বাইকে তুলে নিলাম। ঘুরতে ঘুরতে গান গাইতে পারে কি না জানতে চাইলে ও আমাকে একটা র‍্যাপ গান শোনায়। যেহেতু আমি আগে থেকেই গান নিয়ে আগ্রহী ছিলাম, ওর গান শুনে মনে হলো, ছোট মানুষ হলেও র‍্যাপ গাওয়ার জন্য যথেষ্ট এনার্জি আছে রানার গলায়। এই হলো রানার সঙ্গে আমার পরিচয়ের গল্প। এরপর ওর সম্পর্কে আস্তে আস্তে জানতে শুরু করি এবং সেসব ঘটনা নিয়ে গান লিখে ফেলি।

ঢাকা ট্রিবিউন: 'গাল্লি বয়' নামটার পেছনের ঘটনা বলুন

তবীব: বলিউডের 'গাল্লি বয়' সিনেমাটা দেখার পরে আমি ভাবতে শুরু করি, যদি বাংলাদেশের অলি-গলির গল্পগুলোও সামনে আনা যেত। সেই থেকেই এই নাম দেওয়া। আর গানের নাম দেওয়ার সময় দেখলাম এই শব্দটা বেশ সাবলীলভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনার গানে বাস্তবতা উঠে এসেছে বারবার। এই নির্মম বাস্তবতাকে উপলব্ধি করলেন কীভাবে?

তবীব: বাস্তবতা কতোটুকু ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি জানি না। তবে অনেক মানুষের সঙ্গে মিশে, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে এমনকি আমাদের ক্যাম্পাসেও তো অনেক কিছু দেখি। যা দেখি, তাই-ই লেখি।

ঢাকা ট্রিবিউন: র‍্যাপ গানের শুরুটা করলেন কিভাবে?

তবীব: আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন র‍্যাপ গানের একটা ট্রেন্ড আমাদের মানিকগঞ্জ শহরে ছিল। আমাদের কয়েকজন বড় ভাই তখন কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড হিপহপ ব্যান্ড চালাতেন। ওনাদের দেখে দেখেই র‍্যাপ গানের সঙ্গে পরিচয়। তারপর থেকে চেষ্টার শুরু।

ঢাকা ট্রিবিউন: কাদের গান শুনে অনুপ্রাণিত?

তবীব: এমিনেমের গান ভালো লাগে। তবে কোনো গায়কের চেয়েও বাংলা সাহিত্যের কিছু উদ্দীপনাময় কবিতাই আমার কাছে র‍্যাপ। এক্ষেত্রে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' কবিতাটি থেকে আমি সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত।


আরও পড়ুন- র‍্যাপ গেয়ে ভাইরাল ঢাকার ‘গাল্লি বয় রানা’


ঢাকা ট্রিবিউন: গান সমাজ পরিবর্তনে কতখানি ভূমিকা রাখতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

তবীব: গান অবশ্যই সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে আমি বলব, হিপহপ গান সমাজ পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। গানের মাধ্যমে শুধু মেসেজ দিলেই হবে না, মানুষকে ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝাতে সক্ষম এমনভাবে গানগুলোর মেসেজকে উপস্থাপন করতে হবে।

ঢাকা ট্রিবিউন: মিউজিক ইন্ড্রাস্ট্রির কারো কাছে থেকে সাড়া পেয়েছেন?

তবীব: হ্যাঁ, পেয়েছি। অনেক প্রতিষ্ঠানই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির কর্তাব্যক্তিদের কাছে আমার চাওয়া, তারা যেন নতুন আর্টিস্টদের সঙ্গে আরও বেশি বন্ধুসুলভ আচরণ করেন।

ঢাকা ট্রিবিউন: আপনাদের মিউজিক ভিডিওগুলোর খরচ দিয়েছে কে?

তবীব: আমি ব্যক্তিগতভাবেই এগুলোর খরচ বহন করেছি।

ঢাকা ট্রিবিউন: 'গাল্লি বয়' কি তিন পর্বেই থাকবে নাকি আরো বাড়বে?

তবীব: আপাতত তিন পর্যন্ত রাখারই পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাস্তবতার প্রয়োজনে পরবর্তী পর্ব আসতে পারে।

ঢাকা ট্রিবিউন: গান নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি ?

তবীব: আমি প্যাশন এবং শখের জায়গা থেকেই গান করি। আমি মনে করি, গানের মাধ্যমে আমি মানুষের মানসিকতার উন্নতি ঘটাতে চাই।

ঢাকা ট্রিবিউন: ব্যক্তি আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি ?

তবীব: ভবিষ্যতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই মাস্টার্স, এম.ফিল এবং পি.এইচ.ডি ডিগ্রি নেওয়ার ইচ্ছা আছে। সারাজীবন লেখালেখির সঙ্গে জড়িত থাকার ইচ্ছা রয়েছে। পাশাপাশি, উদ্যোক্তা হিসেবে নতুন কিছু করতে চাই।

ঢাকা ট্রিবিউন: আমাদের সমাজ কিংবা সরকার এসব বঞ্চিত শিশুদের প্রতি কতখানি আন্তরিক বলে আপনি মনে করেন?

তবীব: সরকার বলতে আমি কেবল সরকারি কর্মকর্তা কিংবা সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এদেরকেই বুঝি না। আমি মনে করি জনগণই সরকার। আমরা জনগণ জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করেছি দেশ পরিচালনার স্বার্থে। আমি মনে করি, বর্তমান সরকার জনগণের স্বার্থে যথেষ্ট আন্তরিক। তবে সরকারের কাছে সঠিক তথ্যটি তুলে ধরতে হবে। আমি চেষ্টা করছি এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। সেটা সম্ভব হলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সমস্যা অনেকাংশেই সমাধান হয়ে যাবে।

ঢাকার কামরাঙ্গীরচর বস্তিতে থাকা মো. রানার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর। রানার বাবা ফরিদপুরে পলো (মাছ ধরার যন্ত্র) তৈরী করেন। মা ঢাকায় মানুষের বাসায় কাজ করেন। ঢাকা ট্রিবিউনের সাথে আলাপচারিতা হয় রানারও।  


ঢাকা ট্রিবিউন: তুমি পড়াশোনা করতে চাও?

রানা: হ্যাঁ। অনেকদূর পর্যন্ত পড়তে চাই।

ঢাকা ট্রিবিউন: বড় হয়ে কী হতে চাও?

রানা: ডাক্তার অথবা র‍্যাপ গায়ক হওয়া।

ঢাকা ট্রিবিউন: এখন তুমি কি করো?

রানা: আগে অনেক খাটুনির কাজ করতাম। এখন পড়ালেখা করি।