• বুধবার, অক্টোবর ১৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০২ রাত

অযত্নে-অবহেলায় উজানীর জমিদারদের স্মৃতিচিহ্নগুলো

  • প্রকাশিত ০৬:৪৯ সন্ধ্যা জুলাই ১৮, ২০১৯
উজানী জমিদার বাড়ি
অযত্নে-অবহেলায় জীর্ণশীর্ণ গোপালগঞ্জের উজানীর জমিদার বাড়ি ঢাকা ট্রিবিউন

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এগুলোর সংস্কার এবং সংরক্ষণে এগিয়ে এলে এখানেও গড়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র

তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাণী ভিক্টোরিয়ার আমলে যশোর থেকে গোপালগঞ্জের উজানীতে আসেন রায় গোবিন্দ ও সুর নারায়ণ নামে দুই জমিদার বংশধর। সেখানে বসতি স্থাপন করে তেলিহাটি পরগনা পত্তন নিয়ে শুরু করেন জমিদারী প্রথা। 

বসবাসের জন্য উজানীতে তারা নির্মাণ করেন অপরূপ কারুকার্যমণ্ডিত দোতলা-তিন তলা দালানবাড়ি। যা বর্তমানে আঞ্চলিকভাবে ‘রাজবাড়ি’ নামে পরিচিত। 

শুধু থাকার ঘরই নয়, জমিদাররা সেখানে নির্মাণ করেছিলেন পাকা বৈঠকখানা, শান বাঁধানো ঘাট, টেরাকোটা সমাধি মঠ ও মন্দির। 

কালের বিবর্তনে জমিদারদের এসব প্রাচীন ভাস্কর্যশিল্পের অনন্য নির্দশন ধ্বংসের মুখোমুখি অবস্থায় কালের সাক্ষী হয়ে আজও পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়।

জমিদার সুর নারায়ণের প্রোপৌত্র সমরেন্দ্র চন্দ্র রায় দর্শনার্থীদের কাছে বলে যান পূর্বপুরুষের গৌরবময় ইতিহাস। জমিদারী প্রথা উঠে গেলেও এলাকার হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষ সবাই এখনও জমিদার বংশধরকে ‘কর্তা’ বলেই সম্বোধন করেন। 

সমরেন্দ্র চন্দ্র রায় জানান, ভারত ভাগ ও জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি হওয়ার পর অন্য জমিদারেরা ভারতে চলে গেলেও তিনি পৈত্রিক নিবাস ছেড়ে যাননি।

ছবি: ঢাকা ট্রিবিউনতারা চলে গেলেও থেকে রয়ে গেছে তাদের স্মৃতিচিহ্নগুলো। তবে সংস্কার আর সংরক্ষণের অভাবে সেগুলো এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। 

রাজবাড়ি ঘুরে দেখা গেছে, ভেঙে পড়ার উপক্রম পুরনো পাঁচিল ঘেরা দালানবাড়ি, মন্দির, মঠ ইত্যাদি। টেরাকোটা ঘেরা মঠের ছাদ ভেঙে গেছে। 

এছাড়া, গুপ্তধনের সন্ধানে খোড়াখুড়ি, ভাংচুর করে অসাধুচক্রের লোকজন সেটিকে বিকৃত করে ফেলেছে। এই মাঠটি প্রায় ৩০ হাত মাটির নিচে দেবে গেছে। জমিদার বাড়ির কাছেই কালীমন্দিরটিও ভগ্নদশায় পতিত। এই মন্দিরের কষ্টিপাথরের কালীমূর্তিটি অনেক আগেই কালের হারিয়ে গেছে। পাশের দীঘিটিও অনেকদিন ধরে সংস্কার করা হয়নি। 

উজানীর অদূরে মহাটালী গ্রামে রয়েছে জমিদার আমলের আরও একটি প্রাচীন মন্দির ও ধর্মরায়ের বাড়িতে আছে বিশাল দীঘি। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করায় এসব কিছুই বিলুপ্ত হওয়ার পথে। 

সমরেন্দ্র চন্দ্র রায়ের কাছ থেকে আরও জানা যায়, জমিদারদের ফেলে যাওয়া সম্পদের প্রায় ৭০ ভাগ একর জমি জায়গা এলাকার কিছু প্রভাবশালী ভয়ভীতি এবং ছলচাতুরির করে জাল দলিল ও নামমাত্র মূল্যে দখল করে নিয়েছে। 

তিনি আরও জানান, বাংলা ১৩৫২ সালের ঝড়ে তহশিলের বিভিন্ন কাগজপত্র নষ্ট হয়ে যায়, এই সুযোগে এলাকার ওই প্রভাবশালীরা নিজেদের জমি দাবি করে ওই জমিদারী সম্পত্তির বেশ কিছু অংশ দলিল করে নেয়, যা পরে বাতিল করা হয়। 

পূর্বপুরুষের পুরনো ইতিহাস টেনে সমরেন্দ্র বলেন, তৎকালীন চান্দার বিলসহ প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর এলাকা নিয়ে ছিল তাদের জমিদারী। এই জমিদারীর বিভিন্ন অংশে এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা স্থাপনা ও নিদর্শন। 

তিনি জানান, উজানীর ১৫ কিলোমিটার পূর্বে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার খালিয়াতেও রয়েছে একই ধরনের জমিদার বাড়ি, টেরা কোটা মন্দির, শান বাঁধানো পুকুরঘাট ইত্যাদি। সেগুলোও এখন ধ্বংসের মুখে। 

এক সময়ের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন উজানী ও খালিয়ার মধ্যে পাকা সড়কের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপিত হলেও অবহেলিত রয়ে গেছে ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহগুলো।

জমিদারদের বংশধর ও সচেতন এলাকাবাসী মনে করেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ উজানী ও খালিয়ার জমিদার আমলের নিদর্শনগুলো সংস্কার এবং সংরক্ষণের জন্য এগিয়ে এলে এখানেও গড়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।