• বুধবার, আগস্ট ২১, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৩ রাত

‘শুভ স্যার’, সুবিধাবঞ্চিত এক ‘স্বপ্নবাজ’ তরুণের গল্প

  • প্রকাশিত ০১:৪৩ দুপুর আগস্ট ২, ২০১৯
নারায়ণগঞ্জ
নিজে সুবিধাবঞ্চিত হয়েও শুভ দাঁড়িয়েছেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে। ঢাকা ট্রিবিউন

নিজেও সুবিধাবঞ্চিত হয়ে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন চা বিক্রি। নানা কথায় একজন চা বিক্রেতার ‘শুভ স্যার’ হওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে একমুখ হাসি নিয়ে শুভ মাত্র একটি শব্দে উত্তর দেন, “স্বপ্ন”

“স্যার, আমার রাবার নাই!”, “শুভ স্যার, আমার অংক খাতা শেষ হইয়া গেছে। একটা খাতা দেন না.....” “ও স্যার একটা বই দেন না!”

একের পর এক আবদার। সকলের আবদার মিটিয়ে চলেছেন ২৫ বা ২৬ বছর বয়সী এক তরুণ। পাশাপাশি পাঠও চলছে। তাকে অনুসরণ করে ২০-৩০ জন শিশু সমস্বরে পাঠ করে চলেছে অ, আ, ই, ঈ...............

নারায়ণগঞ্জ চাষাঢ়া রেলস্টেশনে প্লাটফর্মে শেষপ্রান্তে গিয়ে চোখে পড়ে এমনই এক দৃশ্যে। প্ল্যাটফর্মেও একপাশে খোলা আকাশের নিচে ছেঁড়া চটের ওপর বসেই চলছে পাঠ আদান-প্রদান। তাদের ঘিরে ভিড় জমিয়েছেন উৎসুক জনতা।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন বিকেলই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে বসে এই পাঠশালা। এখানে বই আনার চাপ নেই, নিজ খরচে কিনতে হয় না কিছু। সবকিছুই দেওয়া হয় এখান থেকেই ।

আর শিশুদের প্রাণ ২৫ বা ২৬ বছর বয়সী তরুণ শুভ চন্দ্র দাস। তিনিই এ পাঠশালা অর্থ্যাৎ ‘লাল সবুজের পতাকা শ্রী শুভ চন্দ্র দাস প্রাথমিক বিদ্যালয়ের’ প্রতিষ্ঠাতা ও একমাত্র শিক্ষক। সকলের কাছে পরিচিত ‘শুভ স্যার’ হিসেবেই। তিনি পেশায় একজন চা বিক্রেতা।

একরাশ কৌতুহল নিয়ে কথা হয় শুভ চন্দ্র দাসের সাথে। নানা কথায় একজন চা বিক্রেতার ‘শুভ স্যার’ হওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে একমুখ হাসি নিয়ে শুভ মাত্র একটি শব্দে উত্তর দেন, “স্বপ্ন” ।


আরো পড়ুন - 

নিজেই ‘ল্যাম্বরগিনি’ গাড়ি বানালেন নারায়ণগঞ্জের আকাশ


শুভ বলেন, “এ স্কুলটা আমার ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের নতুন জাগরণ বলতে পারেন।”

ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিলো পড়াশুনা শেষ করে শিক্ষক হওয়ার। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর আর্থিক টানাপোড়নে পঞ্চম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায়ই স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। থমকে যায় তার স্বপ্নটাও ।

শুভ বলেন, “২০০৫ সাল পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় মায়ের টিবি রোগ ধরা পরে। মা শয্যাশায়ী, চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। আব্বা একদিন আমাদের চার ভাই-বোনকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করে। আমরা কী চাই? মা চাই, না আর্থিক স্বচ্ছলতা। তারপর মায়ের চিকিৎসার জন্য বাবা গ্রামের বাড়ি-ঘর যা ছিলো সব বিক্রি করে দেয়। সাথে সাথে পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যায়। আম্মাকে সুস্থ করে তোলার আশায় গার্মেন্টসে কাজ শুরু করি আমরা ভাইবোনেরা কিন্তু আম্মাকে বাঁচাতে পারিনি। তারপর টাকার অভাবে আর স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। পড়াশুনার প্রবল ইচ্ছে থাকায় পরবর্তীতে এক স্যার আমাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়িয়েছিলেন। তারপর আর ভাগ্য সঙ্গ দেয়নি।”

শুভ বলে বলেন, “তবু স্বপ্নটা মনে মনে পুষে রেখেছিলাম। জীবিকার তাগিদে চাষাঢ়া রেলস্টেশনের একটা চায়ের দোকানে কাজ শুরু করি। কাজের ফাঁকে এখানকার বস্তির ছেলে-মেয়েদের সাথে প্রায়ই আড্ডা দেওয়ার সুযোগ হতো। আড্ডার ছলে নানা কথোপকথনে ওদের স্বপ্নের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়। জানতে পারলাম ওদের পড়াশোনা করার প্রবল ইচ্ছার কথা। কিন্তু টাকা দিয়ে পড়ানোর মত সামর্থ্য ওদের বাবা-মায়ের নেই।”


আরো পড়ুন - 

বই পোকাদের তীর্থস্থান ‘সুধীজন’ পাঠাগার


এরপরই শিক্ষক হওয়ার গল্পটি জানান শুভ। তিনি বলেন, “তারপর ২০১৬ সালে রেললাইনের পাশে অপু-দিপুর লাইব্রেরি থাকে ২১টি বই আর ১০জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয় ‘লাল-সবুজের পতাকা শ্রী শুভ চন্দ্র প্রাথমিক শিশু বিদ্যালয়’ এর পথ চলা। প্রথমে একটা ঘর থাকলেও টাকার অভাবে ঘরটা ছেড়ে দিতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে প্ল্যাটফর্মের একপাশে চট বিছিয়ে পড়ানো শুরু করি। নানা উত্থান-পতন নিয়েই চলছে। অনেক ঝড় গিয়েছে, এখনো যাচ্ছে। ঘর নেই টাকা পয়সার অভাবে অনেক সময় ওদের ঠিকমতো বই, খাতা, পেন্সিল, রাবার কিনে দিতে পারি না। তবুও চেষ্টা চলছে হাল ছাড়তে চাই না। আমি চাই না আমার মত কেউ অর্থের অভাবে স্বপ্ন থেকে ঝরে পড়ুক।”

স্কুলটিতে শিশু থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হয়। বর্তমানে স্কুলের শিক্ষার্থী ৬০-৭০ জন। এখান থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর যাদের অবস্থা স্কুলে ভর্তি করার মত হয়ে যায় তখন তাদের আশেপাশের সরকারি স্কুলগুলোতে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়।

শুভ বলেন, “বস্তিতে বড় হলেও এরা অনেকেই খুব মেধাবী। ভালোমত পড়াশোনা করাতে পারলে ওরা ভবিষ্যতে ভালো কিছু করতে পারবে। তাই শত কষ্টের পরেও চায়ের দোকান থেকে যতটুকু আয় করতে পারছি ততটুকু দিয়েই ওদের স্বপ্নপূরণের চেষ্টা করছি। টাকার অভাবে অনেবারই স্কুলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। তবু এই বিদ্যালয়টি আমি চালু রাখতে চাই। যাতে আমার মতো কেউ পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয়।”

নিজের স্বপ্ন শিশুদের মধ্যেই খুঁজে পান শুভ চন্দ্র দাস। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন 

শুভ তার স্বপ্নের কথা জানিয়ে বলেন, “ওদের নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। আমার অপূরণীয় স্বপ্ন ওদের দিয়েই পূরণ করতে চাই। একদিন এই স্কুল থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা দেশের সম্মানজনক পদে চাকরি করবে। হয়তো ওরাও একদিন এমন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করবে। দেশের জন্যে কাজ করবে। সেদিনই আমি সার্থক হবো। আমার স্বপ্ন পূরণ হবে। ওদের অদম্য ইচ্ছাই আমার অনুপ্রেরণা।”   

এদিকে বেলা গড়িয়ে তেজ কমছে সূর্যের, সাথেসাথে বাড়ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। ফিরোজা বেগম নামের এক নারী তার ৭ বছর বয়সী শিশুকন্যা বিথীকে নিয়ে স্কুলে দিতে এসেছেন। অন্যের বাসায় কাজ করে ছেলেমেয়ের অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার সামর্থ্যে নেই তার। তবুও নিজেরমত সন্তানদের অশিক্ষিত হতে দিতে চান না ফিরোজা।

ফিরোজা জানান, “একবেলা খাবারই যে জায়গায় জোটে না সে জায়গায় পোলাপাইন পড়ামু কী দিয়া? স্কুলে অনেক খরচা। এই খরচা দিয়া পোলাপাইন পড়ান সম্ভব না মা। তাই আমাগো মত মানুষগো লাইগা আল্লাহ শুভ’র মত একজনরে পাঠাইছে। আমাগো শুভই ভরসা।”


আরো পড়ুন - 

‘হুজুরও তো আমাদের সাথে এমন করে’, ধর্ষণের খবর টিভিতে দেখে শিশু


কথা হয় কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথেও। ওদের কারো বাবা আছে, মা নেই। কারো বাবা-মা কেউ নেই। কেউকেউ জানেই না ওদের বাবা-মা কোথায় আছে। তবুও ওরা স্বপ্ন দেখে বড় হওয়ার। কেউ বড় হয়ে হতে চায় ডাক্তার হবে, কেউ ইঞ্জিনিয়ার। কারো আবার ইচ্ছে, শুভ স্যারের মত শিক্ষক হওয়ার।

নারায়ণগঞ্জ চাষাঢ়া রেললাইনের এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছেশুভ ‘এক স্বপ্নবাজ তরুণের নাম’।

স্কুল নিয়ে কথা হয় নারায়ণগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসার মনিরুল হকের সাথে। ঢাকা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “স্কুলটির বিষয়ে আমার জানা ছিলো না। তবে শুভর উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।”

মনিরুল হক বলেন, “মূলত আমরা সরকারি স্কুলগুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকি। এর বাইরেও নারায়ণগঞ্জে অনেক বেসরকারি স্কুল রয়েছে। সব স্কুল সবসময় মনিটরিং করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে আমরা এসব স্কুলগুলোতে সরকারি বই দিয়ে থাকি। শুভ যদি চায় তাহলে আমরা তার স্কুলে বই দিয়ে সাহায্যে করতে পারি।”