• মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪০ রাত

‘প্লানা ফিলিং স্টেশন’ বদলে দিয়েছে তাদের জীবন

  • প্রকাশিত ০১:৪০ দুপুর আগস্ট ২৯, ২০১৯
নারায়ণগঞ্জ
একটি ট্রাকে তেল ভরে দিচ্ছেন হ্যাপি আক্তার। ঢাকা ট্রিবিউন

পড়াশোনা না জেনেও যে আর্থিকভাবে সাবলম্বী হওয়া সম্ভব তারই এক অনবদ্য উদাহরণ প্লানা ফিলিং স্টেশনে কাজ করা নারীরা

‘একের পর এক গাড়ি প্রবেশ করছে, আর প্রবেশের সাথে সাথেই মাথায় ঘোমটা পড়া এক নারী গাড়িতে তেল ভরে দিচ্ছেন। পাশেই আরেকজন নারী দাঁড়িয়ে থেকে তাকে সাহায্যে করছেন’ দৃশ্যটি নারায়ণগঞ্জ বন্দরের কামতাল লাঙ্গলবন্দ এলাকার ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের পাশে অবস্থিত ‘প্লানা ফিলিং স্টেশনের’। সচারচর এধরনের দৃশ্য চোখে না পড়ায় খুব স্বাভাবিকভাবেই যে কারোরই চোখ আটকে যাবে এখানে। কারণ এ ফিলিং স্টেশনে পুরুষেরা নয়, যানবাহনে জ্বালানি তেল ভরে দেওয়ার কাজ করেন নারীরা। তাই স্থানীয়দের কাছে এ পাম্পটি পরিচিত ‘মহিলা পাম্প’ হিসেবে।

একদিকে যখন হত্যা, গুম, ধর্ষণের নির্যাতন-নিপীড়নের মত হাজারো অপরাধ নারী সমাজের গতিরোধ করছে, ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াচ্ছেন একদল সফল নারীদের উদাহরণ। শুধু পড়াশোনা জানা শিক্ষিত নারী নয়, পড়াশোনা না জেনেও যে আর্থিকভাবে সাবলম্বী হওয়া সম্ভব তারই এক অনবদ্য উদাহরণ প্লানা ফিলিং স্টেশনে কাজ করা নারীরা। 

২০০৩ সাল থেকে নারীদের দিয়েই চলছে প্লানা ফিলিং স্টেশন। বর্তমানে এখানে কর্মরত রয়েছেন ৬জন নারী। দুই শিফটে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত তিনজন আর দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করেন বাকি তিনজন- এমনটাই জানালেন এ ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন বাবুল।

রবিবার দুপুর ২টা থেকে শুরু হয়েছে হ্যাপি, মালা ও জেসমিন আক্তারের শিফট। তাদের কেউ ৩ বছর, কেউ সাড়ে ৪ বছর, কেউবা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এখানে কর্মরত রয়েছেন। প্রত্যেকেই বিভিন্ন পরিস্থিতির শিকার হয়ে জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে এখানে এসেছেন। 

জীবিকার খোঁজে ৫ বছর আগে মৌলভীবাজার থেকে স্বামীর সাথে নারায়ণগঞ্জে পাড়ি জমিয়েছিলেন হ্যাপি আক্তার। আর্থিক টানাপোড়েনে সংসারের হাল ধরতে স্বামীর সাথে সাথে নিজেও কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু অতিরিক্ত মোটা হওয়ায় হ্যাপি আক্তারকে কাজ দিতে চাইতেন না কেউই। পরে এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের ‘প্লানা ফিলিং স্টেশনে’ কাজ নেয় হ্যাপি। মোটা হওয়ার গঞ্জনা এখানে আর পোহাতে হয়নি তার। 


আরো পড়ুন - ‘শুভ স্যার’, সুবিধাবঞ্চিত এক ‘স্বপ্নবাজ’ তরুণের গল্প


হ্যাপি আক্তার বলেন, একদিকে যেমন পড়াশোনা জানতাম না অন্যদিকে ছিলো এই মোটা হওয়ার সমস্যা। একারণে কোথাও ভালো চাকরিও পাচ্ছিলাম না। তারপর এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে এখানকার খোঁজ পাই। গত সাড়ে চারবছর যাবৎ এখানেই কাজ করছি। স্বামী-স্ত্রী দুজনের টাকায় সংসার সুন্দরভাবে চালাতে পারছি।

এই ফিলিং স্টেশনে ৮ বছর ধরে কাজ করছেন খুলনা বাগেরহাট এলাকার মালা। জীবিকার তাগিদেই এখানে এসেছিলেন তিনি। দুই ছেলেমেয়ে আর স্বামীকে নিয়ে তিনি ফিলিং স্টেশনের কোয়াটারেই থাকছেন।

মালা বলেন, খুব ছোট থাকতেই বিয়ে হয়ে যায়। কষ্ট করে এসএসসি পর্যন্তই পড়াশোনা শেষ করেছি। তারপর স্বামীর সাথে এখানে চলে আসি। অন্য পেশায় কাজ করার মত সুযোগ পাইনি। পরে স্বামীর সাথেই এ ফিলিং স্টেশনে কাজ শুরু করি। এখানে কাজ করেই দুই ছেলেমেয়েকে মানুষ করছি। 

আলাপের ফাঁকে সংগ্রামী দুই নারী জেসমিন (বাঁয়ে) হ্যাপি আক্তার। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

জেসমিন নামে অপর এক নারী এখানে কাজ করছেন ৩ বছর ধরে। বিয়ের পর পরই ঢাকায় এসেছিলেন। তারপরেই এখানে কাজ শুরু করা। কেমন লাগে এখানে কাজ করতে জানতে চাইলে জেসমিন বলেন, ভালো লাগে। ছেলেমেয়ে নিয়ে ডিউটি করতে পারি। গার্মেন্টেসে চাকরি করলে তো বাচ্চা নিয়ে যাওয়া যায় না যেটা এখানে পারি। তাছাড়া এখানে মালিক অনেক সাহায্য করেন, সবাই মিলে কাজ করি নিজের বাড়ির মতো। 

এ ফিলিং স্টেশনের সবচেয়ে পুরোনো কর্মী রিক্তা আক্তার। তিনি প্লানা ফিলিং স্টেশনে গত ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন। ফিলিং স্টেশনের পেছনেই কর্মীদের জন্য রাখা কোয়ার্টারেই পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি।

ঠিক কবে এ স্টেশনে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি সেটা ঠিক করে মনে করতে পারলেন না রিক্তা আক্তার। শুধু মনে আছে পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতার জন্য এক আত্মীয়ের মাধ্যমে কিশোরী বয়সে এখানে আসা। সেই থেকে এখন পর্যন্ত এখানেই আছেন। 

রিক্তা আক্তার জানান, খুব ছোট থাকতে এখানে আসছি। তখন আনুমানিক বয়স হবে ১৪ বা ১৫। কাজটা দ্রুত শিখে যাওয়ায় ম্যানেজার স্যার বেতনভুক্ত করেন আমাকে। তারপর থেকেই এখানেই আছি। প্লানা আমার জীবনটাই বদলে দিয়েছে। এখন স্বামী-স্ত্রী দুজনেই এ ফিলিং স্টেশনেই কাজ করি। পরিবার নিয়ে পাম্পের কোয়ার্টারেই থাকি। অনেকটা নিজের বাড়ির মতই সবাই মিলেমিশে পরিবারের মত থাকি। কারো কাছে হাত পাততে হয় না।


আরো পড়ুন - বই পোকাদের তীর্থস্থান ‘সুধীজন’ পাঠাগার


তবে নারী হিসেবে ফিলিং স্টেশনে কাজ করতে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় তাদের। রিক্তা আক্তার জানান, এখানে কাজ করাটা সবাই ভালোভাবে নেয় না। সেটা সামাজিক হোক বা পারিবারিক। কয়েকজনের পরিবার জানেই না তারা এখানে কাজ করেন। আগে তো আরো মেয়ে ছিলো। কারো বিয়ে হয়ে গেছে। অনেকের পরিবার জানার পর এখান থেকে নিয়ে গেছে। তবে কোনো কাজই ছোট না। তাছাড়া পড়াশোনা না জেনেও বা গার্মেন্টস পেশার বাইরেও যে কাজ করা যায় এটাই আমরা প্রমাণ করতে চাই। 

তাদের মতে, মৌখিকভাবে সমাজ পরিবর্তনের কথা বললেও মানুষের চিন্তা-ভাবনা এখনও পরিবর্তন হয়নি। ফলে এসকল চিন্তাধারাই তাদের বিভিন্ন সময় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে।

একই স্টেশনে কাজ করে ২২ বছর বয়সী তরুণ খলিল খান। এইচএসসি পাশ করার পর আড়াই বছর আগে এ ফিলিং স্টেশনে কাজ শুরু করেন। খলিল খান জানান, আমরা এখানে নারী-পুরুষ বিষয়টি কখননো মাথায় আনি না। আমরা একটা পরিবারের মত এখানে কাজ করি কিন্তু অনেকসময় তিরস্কারের শিকার হতে হয় পুরুষ কর্মীদের। 

অনেকেই তিরষ্কার করে বলেন যে, “মেয়ে মানুষের সাথে কাজ করি। এটা সেটা। কিন্তু এসব আমলে নেই না। তবে এসকল চিন্তা ধারার পরিবর্তন প্রয়োজন। তাহলেই কর্মকাণ্ডে এগিয়ে যেতে পারবো।” 


আরো পড়ুন - নিজেই ‘ল্যাম্বরগিনি’ গাড়ি বানালেন নারায়ণগঞ্জের আকাশ


প্লানা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন বাবুল ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, এ ফিলিং স্টেশনের শুরু থেকেই এখানে আছি। ২০০৩ সালে এ স্টেশনটি নির্মাণের শুরু থেকেই এ স্টেশনটি নারীরা কাজ করে আসছেন। তার উদ্দেশ্যে ছিলো সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের আর্থিকভাবে সাবলম্বী করার। আর সে চিন্তা থেকেই নারীদের নিয়ে এ ফিলিং স্টেশনের যাত্রা শুরু হয়।

প্লানা ফিলিং স্টেশনের বর্তমান মালিক সাইফুল ইসলামের ছেলে ওয়াসিম জাবেদি (প্লানা) ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ফিলিং স্টেশনের যাত্রাটা মূলত আমার দাদা শুরু করেন। তবে তখন থেকে আমার বাবা এর দেখাশুনা করত। সেই থেকেই বাবা নারীদের দিয়ে প্লানা স্টেশনের কার্যক্রম শুরু করে। বাবার মতে নারীরা যদি গার্মেন্টে কাজ করতে পারে তাহলে ফিলিং স্টেশনে কিসের সমস্যা? তাছাড়া নারীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আর্থিকভাবে সাবলম্বী করার জন্যই বাবা এ উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেইথেকে এখন পর্যন্ত এভাবেই চলছে।”

তার দাবি, “প্লানা ফিলিং স্টেশন বাংলাদেশের প্রথম ফিলিং স্টেশন যেটা নারীদের নিয়ে কাজ করছে।”