• সোমবার, অক্টোবর ২১, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৩ রাত

প্লাস্টিকমুক্ত পর্যটনের সংগ্রামে ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ

  • প্রকাশিত ০৬:৪৭ সন্ধ্যা অক্টোবর ৮, ২০১৯
টিওবি
সেন্টমার্টিনে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে ট্যুর গ্রুপ অব বাংলাদেশের সদস্যরা টিওবির সৌজন্যে

'ভ্রমণের ক্ষেত্রেও যে একজন পর্যটকের কিছু দায়িত্ব রয়েছে সে বিষয়টি যেন মানুষ উপলব্ধি করতে পারে সেটাই আমাদের মুখ্য চাওয়া। টিওবি যেহেতু একটি বড় প্ল্যাটফর্ম তাই এর মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির কাজটা সহজ হবে বলে আমরা মনে করি'

দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ফেলে রাখা ৫৫৫ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার করে সম্প্রতি আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের ভ্রমণ বিষয়ক গ্রুপ ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ (টিওবি) এর সদস্যরা। তাদের এ উদ্যোগ সামাজিক মাধ্যমজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ (টিওবি) মূলত ভ্রমণপিপাসুদের নিয়ে একটি ফেসবুক গ্রুপ। গ্রুপটির সদস্য ১০ লাখেরও বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারী। বছরজুড়েই গ্রুপটির সংগঠকরা বিভিন্ন ইভেন্ট খুলে সদস্যদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানগুলোতে ঘুরে বেড়ান। 

এভাবে ঘুরতে ঘুরতেই গ্রুপের সংগঠকরা খেয়াল করলেন দর্শনীয় স্থানগুলোর পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে পর্যটকদের ফেলে রাখা প্লাস্টিক বর্জ্যে। ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি একধরনের দায়িত্ববোধ থেকে ২০১৭ সাল থেকে তারা শুরু করলেন "রেসপন্সিবল ট্যুরিজম" বা দায়িত্বপূর্ণ পর্যটন। দর্শনীয় পর্যটন স্থানগুলোতে ভ্রমণের পাশাপাশি সাধ্যমতো পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোই "রেসপন্সিবল ট্যুরিজম" এর মূল উদ্দেশ্য।

চলছে পরিচ্ছন্নতা অভিযান। ছবি: টিওবির সৌজন্যেএরই ধারাবাহিকতায় গত ৩ অক্টোবর টিওবি'র ৩৯ সদস্যের একটি দল সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে রওনা হয়। এই যাত্রার উদ্দেশ্যই ছিল দ্বীপটি থেকে পর্যটকদের ফেলে আসা প্লাস্টিক বর্জ্য সাধ্যমতো অপসারণ করা। এবারের ইভেন্টের উদ্যোক্তা ছিলেন টিওবি'র অন্যতম সংগঠক (অ্যাডমিন) নিয়াজ মোর্শেদ। ৪ থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে চলে টিওবি'র পরিচ্ছন্নতা অভিযান।

ঢাকা ট্রিবিউনকে নিয়াজ জানান, “ভ্রমণের ক্ষেত্রেও যে একজন পর্যটকের কিছু দায়িত্ব রয়েছে সে বিষয়টি যেন মানুষ উপলব্ধি করতে পারে সেটাই আমাদের মুখ্য চাওয়া। টিওবি যেহেতু একটি বড় প্ল্যাটফর্ম তাই এর মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির কাজটা সহজ হবে বলে আমরা মনে করি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দেশের ভেতরে যেখানেই ঘুরতে যাই না কেন, সেখানেই সাধ্যমতো পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করব। আর পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রথমবার গিয়েছিলাম শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে।”

“দ্বীপ থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আমাদের সদস্যদের বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। পর্যটকরা তো চোখ বুঁজে ময়লা ফেলে যান, সেগুলো কোথায় গিয়ে পড়ছে সেদিকে খেয়াল করেন না। দেখা গেল কাঁটাযুক্ত কেয়া গাছের মধ্যে বোতল পড়ে আছে, সেগুলো আনতে গিয়ে আমাদের অনেকেরই হাতে কাঁটা ঢুকে গিয়েছিল। যাই হোক, প্লাস্টিকগুলো সংগ্রহ করে আমরা আমাদের ভাড়া করা ট্রলারে করে সেগুলোকে টেকনাফের একটি দোকানে দিয়ে দিই। ৩৯টি বস্তায় সংগ্রহ করা ময়লার ওজন ছিল ৫৫৫ কেজি”, যোগ করেন তিনি, “তবে সেটা সেন্টমার্টিনে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের পাঁচ শতাংশও হবে না।”

পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে কাজ করছেন টিওবির এক সদস্য। ছবি: টিওবির সৌজন্যেরতিনি বলেন, “গত বছরও আমরা প্লাস্টিক অপসারণের জন্য সেন্টমার্টিনে গিয়েছিলাম। এবার সেখানে যাওয়ার কারণ ছিল সামনের পর্যটন মৌসুমকে সামনে রেখে মানুষকে সচেতন করে তোলা। যাতে আগামী ৬ মাস পর্যটন মৌসুমে ভ্রমণপিপাসুরা যতটা সম্ভব কম বর্জ্য ফেলেন। পাশাপাশি, এখন পর্যটকের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম থাকায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে সুবিধা হয়েছে।”

ভ্রমণপিপাসুদের প্রতি নিয়াজের পরামর্শ, প্রত্যেকে যেন সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া প্লাস্টিক বোতল বা খাবারের প্যাকেটগুলোকে ফেরত নিয়ে আসেন।

এ বছর শ্রীমঙ্গল, কুয়াকাটা এবং সুন্দরবনে ঐতিহ্যবাহী রাস মেলার সময় টিওবি পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে বলেও জানান তিনি। কারণ রাসমেলায় প্রচুর পর্যটক সমাগমের কারণে বর্জ্যও ফেলা হয় অনেক বেশি পরিমাণে।

পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচী শেষে টিওবি'র সদস্যরা। ছবি: টিওবির সৌজন্যেএছাড়া, আগামী ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক পর্বত দিবসে বান্দরবানের কেওক্রাডং পর্বত থেকে বগা লেক পর্যন্ত পর্যটকদের বহুল ব্যবহৃত রাস্তাটিতেও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে টিওবি'র।

এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানের বিষয়টি জানার পর দুই-একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছিল স্পন্সরশিপের বিষয়ে। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে আয়োজকরা সেদিকে আগ্রহী হননি। তবে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের রিসোর্ট ড্রিম নাইট রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী সাজু রহমান তার রিসোর্টে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যাওয়া টিওবি'র সদস্যদের বিনা খরচে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তিনি নিজেও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেন।

ঢাকা ট্রিবিউনকে নিয়াজ আরও জানান, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ এবং জেলা পরিষদের উদ্যোগে কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনের বিভিন্ন জায়গায় কিছু ময়লা ফেলার বিন বসানো হয়েছে। সেগুলোর সংখ্যা পর্যাপ্ত না হলেও ভবিষ্যতে প্রশাসন আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করেন তিনি। গত বছর তাদের দেখাদেখি সেন্টমার্টিনের স্থানীয় তরুণরাও ছোট পরিসরে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে নেমেছিল।