• বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২২, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০৫ রাত

তালেবানদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে মৃত ভাইয়ের ছদ্মবেশে ১০ বছর

  • প্রকাশিত ০৭:০৬ রাত মার্চ ৩১, ২০১৯
নাদিয়া গুলাম
তালেবানদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে দীর্ঘ দশটা বছর আত্মপরিচয় গোপন রাখেন, ছদ্মবেশ নেন নিজের মৃত ভাইয়ের। ছবি: সংগৃহীত

"মাঝে মাঝে মনে হয় আমিই হয়তো আফগানিস্তানের একমাত্র নারী যে বলবে আফগানিস্তানে পুরুষদের জীবনটাও খুব সহজ না। প্রতিদিন যেন তারা একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছেন মৃত্যুর আরও কাছে। পরিবারের জন্য একটা রুটির টুকরো খোঁজার চেষ্টা করছেন"

আফগানিস্তানে নারীদের চাকরি করা নিষিদ্ধ। এরকম এক বৈরি পরিবেশে জীবন-জীবীকার তাগিদে এক অভিনব উপায়ে দশ বছর পরিবারের হাল ধরে রেখেছিলেন এক আফগানি নারী। নিজেকে তালেবানদের অত্যাচার থেকে বাঁচাতে দীর্ঘ দশটা বছর আত্মপরিচয় গোপন রাখেন, ছদ্মবেশ নেন নিজের মৃত ভাইয়ের।

গল্পটা আফগান নারী নাদিয়া গুলামের। বেঁচে থাকার আর বাঁচিয়ে রাখার তার এই গল্পটা হার মানাবে যেকোনো সিনেমার কাহিনীকেও। 

প্রাচীনকাল থেকেই এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিস্থল হিসেবে পরিচিত নাম আফগানিস্তান। কিন্তু ১৯৭৮ সালের ২৭ এপ্রিল সাউর বিপ্লব নামে পরিচিত একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পিডিপিএ কর্তৃক ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে যে একটি যুদ্ধাবস্থা তা এখনও বর্তমান। একের পর এক গৃহযুদ্ধে দেশটি ইতিহাস জর্জরিত। সর্বশেষ ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১১ সেপ্টেম্বর হামলার পর ন্যাটো আফগানিস্তান আক্রমণ করে। এই আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল আল কায়েদাকে পরাজিত করা, তালিবানকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ এবং আফগানিস্তানে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সৃষ্টি। এসব উদ্দেশ্যের কিছুটা তথাকথিত পূরণ হলেও আফগানিস্তানে মার্কিন-নেতৃত্বাধীন হস্তক্ষেপ একটি প্রলম্বিত যুদ্ধরূপে এখন পর্যন্ত চলমান।

বর্তমানে এই যুদ্ধাবস্থায়ই আফগানীদের নিত্যদিনের অংশ, যার সবচেয়ে বাজে প্রভাবটা পড়েছে শিশু ও নারীদের ওপর। এমনি যুদ্ধাহত এক নারীর নাম নাদিয়া গুলাম। বোমা হামলায় তার জীবন থেকে হারিয়ে যায় শৈশব, হারায় শৈশবের সাথি তার ভাইও। 

দশ বছর আগের কথা।

নাদিয়া গুলাম বড় হচ্ছিলেন এমন এক পরিবেশে যেখানে তালেবানি শাসন অনুসারে নারীদের জন্য চাকুরী নিষিদ্ধ ছিল। 

নাদিয়ার তখন মাত্র আট বছর বয়স যখন বসত ভিটায় ফেলা প্রাণঘাতী বোমায় তার সহোদরকে হারান। নিজেও আহত হন মারাত্মকভাবে।

বোমা হামলায় গুরুতরভাবে আহত শিশু নাদিয়াকে মুহূর্তের মধ্যেই মুখোমুখি হতে হয় জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যের সাথে। কালক্ষেপ না করেই নিজেকে গুছিয়ে নিতে হয় তাকে। ওইটুক বয়সেই সে তার ছোট কাঁধে তুলে নেয় তার পুরো পরিবারের দায়িত্ব! এগার বছর বয়সেই মৃত ভাইয়ের ছদ্মবেশে ছুটতে শুরু করেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে।

"যুদ্ধের মধ্যে বেঁচে থাকাটা কেমন, কিভাবে একটা যুদ্ধে মানুষের সমস্ত জীবনকে তছনছ করে ফেলতে পারে- সেসময় আমি তা প্রথম অনুধাবন করি", সেই ভয়াবহ মুহূর্তের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলে ওঠেন নাদিয়া, "কিন্তু যুদ্ধের সেই সময়টা আফগানিস্তানের একটি হাসপাতালে থাকাকালে বুঝলাম, এই হাসপাতালে আমিই একমাত্র এমন শিশু নই। আমার মতো এমন হাজারো শিশু ছিল সেখানে, তাদের শরীর জুড়ে ছিল আমার চাইতেও গুরুতর ক্ষত"। 

তখন তার বয়স এগারো। একদিন কি ভেবে তালেবানি কানুন উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, পরিবারের জন্য খোরাক যোগারে মৃত ভাইয়েরই ছদ্মবেশ নিবেন। 

"সেসময় আফগানিস্তানে তালেবানি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তখন তারা নতুন আইন করে মেয়েদের পড়াশোনা, স্কুলে যাওয়া এমনকি কোন কাজে বাড়ির বাইরে যাওয়ায় পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু তখন আমার অবস্থা এমন, যে করেই হোক আমার পরিবারের জন্য আমাকে কিছু একটা করতেই হবে", বলছিলেন নাদিয়া। 

"সেই ঘটনার পর থেকেই আমার বাবা দুর্ঘটনা পরবর্তী মানসিক বৈকল্য অর্থাৎ পিটিএসডি-তে ভুগছিলেন, এমনকি আজ অব্দি সেই মানসিক যাতনায় তিনি ভুগছেন। আমার ভাইও আর বেঁচে নেই। আমার পরিবারের জন্য খাদ্য যোগারে আমাকে কিছু একটা করতেই হতো", যোগ করেন তিনি। 

পুরুষের ছদ্মবেশ নেয়ার নেপথ্যের গল্পটা নাদিয়া বললেন এভাবে, "তখন আমার বয়স ১১ বছর। আমি ভাবলাম একদিনের জন্য পুরুষের ছদ্মবেশ নিয়েই দেখি, হয়ত আগামির দিনে সব বদলে যাবে। সেই দিনের পর টানা দশ বছর আমি একজন পুরুষ ছিলাম, এবং একজন পুরুষ হিসেবেই কাজ করে গেছি আমার পরিবারকে সাহায্য করতে"। 

কখনও কারও সন্দেহ হয় নি কিংবা ধরা পরে যাওয়ার ভয় হয় নি তার?

জবাবে নাদিয়া বলেন, "এমন অনেক সময়ই হয়েছে যে আমার গোপন সত্য জানার খুব, খু-উ-ব কাছে চলে এসেছিল তারা। কিন্তু আমি সবসময় বলে এসেছি- আমার জীবন অলৌকিক ঘটনায় পূর্ণ, আগেও হয়েছে, এখনও হয়ে থাকে"। 

"একবার- ধরা পড়েই যাব, আর রক্ষে নেই- এমন অবস্থা। কিন্তু কোন এক কারণে, শেষমেশ তারা কেউই আর তা ধরতে পারেনি"। 

"মাঝে মাঝে মনে হয় আমিই আফগানিস্তানের একমাত্র নারী যে বলবে আফগানিস্তানে পুরুষদের জীবনটাও খুব সহজ না। প্রতিদিন যেন তারা একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছেন মৃত্যুর আরও কাছে। খুবই কঠিন এই সময়টা। চারিদিকে শুধুই বোমা আর বোমা! প্রচুর আত্মঘাতী হামলা  আর রাস্তাঘাটে শুধুই জঙ্গি! এরই মধ্যে, সবাই যারযার মতো পরিবারের জন্য একটা রুটির টুকরো খোঁজার চেষ্টা করছেন", বলেন নাদিয়া।

"আমি একবার ভাবি, হয়তো এসবই মিথ্যা, আমার জীবনে এমন কোন ঘটনাই ঘটেনি। কিন্তু এরপর আমি আয়নায় আমার চেহারা দেখি, আর সেখানে যখন আমি আমার সব আঘাতের চিহ্ন দেখি, আমি তখন নিজেকে বলি: এটাই তুমি, এটাই নাদিয়া। এসব জঞ্জালের মধ্যে দিয়েই তোমার আজকের এই তুমি হয়ে গড়ে ওঠা!"

"অনেকেই আমার এসব বাহ্যিক আঘাতের চিহ্নগুলি দেখতে পায়, কিন্তু আমার দুমড়েমুছড়ে যাওয়া ভেতরটা তারা কেউই দেখতে পারে না। জানতে পারে না আমার জীবনটা কেমন ছিল, কিভাবে মানসিকভাবে এই কঠিন সময় পার করলাম"। 

"আমার জীবন পরিবর্তনকারী একমাত্র আমিই- আর এই শিক্ষাটা আমি আমার জীবন থেকে পেয়েছি আর এই শিক্ষাটাই আমি এই মেয়েদেরকেও শেখাতে চাই। তারা না চাইলে আর কেউ তাদের জীবন পরিবর্তন করতে পারবে না", বলেন নাদিয়া।  

নাদিয়া বর্তমানে থাকছেন বার্সেলোনায়। কাজ করছেন ইসরায়েলি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ব্রিজেস ফর পিস'এর জন্য। প্রতিষ্ঠানটি আফগানিস্তানের যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ শিশুদের শিক্ষার উন্নয়নে সহায়তা করে থাকে।