• সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:০৪ রাত

আসামের এনআরসি : বাংলাদেশের জন্য ঠিক কতটা দুশ্চিন্তার কারণ?

  • প্রকাশিত ০১:৩৯ দুপুর সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৯
আসাম
ভারতের আসামে চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা (এনআরসি) থেকে বাদ পড়েছেন রাজ্যের প্রায় ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন মানুষ। ছবি: এএফপি

ভারতের বেশিরভাগ বিশ্লেষকের পূর্বাভাস হচ্ছে, এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়া লাখ লাখ মানুষকে অদূর ভবিষ্যতে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হবে, সেই সম্ভাবনা খুব কম।

দিল্লিতে যে সাংবাদিকরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘বিট’ কভার করেন, গত শনিবার (৩১শে আগস্ট) সন্ধ্যার দিকে তাদের ইমেইল ইনবক্সে বা হোয়াটসঅ্যাপে হঠাৎই ল্যান্ড করে একটি দীর্ঘ বার্তা। বার্তাটি আসলে একটি দীর্ঘ বিবৃতি, যেটি পাঠিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র বিষয়ক মুখপাত্র রবীশ কুমার – এবং তাতে দশটি অনুচ্ছেদে ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী তৈরির পটভূমি এবং এ বিষয়ে ভারত সরকারের অবস্থান।

ওই বিবৃতিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হয়েছে, সরকারের কোনও নির্বাহী আদেশে নয় – বরং দেশের শীর্ষ আদালতের নির্দেশেই এই প্রক্রিয়া সম্পাদন করা হয়েছে। নাগরিকপঞ্জী থেকে বাদ পড়ার মানেই যে কোনো ব্যক্তি যে ‘রাষ্ট্রহীন’ বা ‘বিদেশি’ বলে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছেন না, সেটাও দাবি করা হয়েছে এই বিবৃতিতে – যদিও সেখানে যুক্তিটা কিছুটা দুর্বলই শোনাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হল, এনআরসি প্রক্রিয়াকে যেখানে বারে বারেই ভারত সরকার সম্পূর্ণ তাদের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে দাবি করে আসছে, সেখানে কেন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আগ বাড়িয়ে এ বিষয়ে এত লম্বা বিবৃতি জারি করতে হচ্ছে?

প্রশ্নের উত্তরটাও সহজ – মুখে যতই বলা হোক এটা ভারতের নিজেদের ঘরের ব্যাপার, আসলে এই বিষয়টা যে দক্ষিণ এশিয়াতে তাদের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী বাংলাদেশকে রীতিমতো উদ্বেগে ফেলেছে সেটা দিল্লিরও অজানা নয়। আর এই বিবৃতি জারি করার প্রধান লক্ষ্যও ছিল বাংলাদেশের উদ্বেগ প্রশমিত করা।

"হ্যাঁ, এটা হয়তো ঠিকই যে গোটা বিবৃতিতে একবারও বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু এই বিবৃতির মূল উদ্দেশ্য যে তারাই সেটা নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয়ের কারণ নেই। দিল্লি ঢাকাকে এর মাধ্যমে এই বার্তাই দিতে চেয়েছে যে, এখনই এনআরসি নিয়ে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো কিছু হয়নি।", বলছিলেন পররাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উজ্জ্বল কুমার সিং।

কিন্তু অধ্যাপক সিং পাশাপাশি এটাও মনে করছেন গোটা বিবৃতিটা বাংলাদেশের জন্য আদৌ ততটা ‘কনভিন্সিং’ শোনাচ্ছে না।

"দেখুন, এনআরসি থেকে বাদ পড়া মানুষজন আপিল করার কী কী সুযোগ পাবেন, কতটা সময় পাবেন সেগুলো বিশদে ব্যাখ্যা করা হলেও বিবৃতিতে কিন্তু একবারও বলা হয়নি যে তাদের বাংলাদেশে বা অন্য কোথাও ঠেলে পাঠানোর কোনও চেষ্টা কোনও দিন হবে না। ফলে আজ হোক বা কাল, সেই চেষ্টা কখনও হতে পারে - বাংলাদেশের জন্য এই দুশ্চিন্তাটা রয়েই যাচ্ছে বলে আমি মনে করি", বলছিলেন উজ্জ্বল কুমার সিং।

তবে এটাও মনে রাখতে হবে, এনআরসি থেকে দু-তিনশো লোক নন – বাদ পড়েছেন উনিশ লাখ মানুষ। যেখানে বাংলাদেশ তাদের একজনকেও নিতে রাজি নয়, সেখানে এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে কীভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া সম্ভব?

দিল্লির শীর্ষস্থানীয় স্ট্র্যাটেজিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইনস্টিটিউট অব ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসে’র সিনিয়র ফেলো পুষ্পিত দাস জবাবে বলছেন, "না, সম্ভব নয়। আর তা ছাড়া ভারত মিয়ানমারও নয় যে এই লাখ লাখ মানুষকে মেরে-ধরে রোহিঙ্গাদের মতো দেশছাড়া করবে। এ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, সেটা কখনওই সম্ভব নয়। ফলে আমার ধারণা, এই কয়েক লাখ মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া সম্ভব নয় - বরং ভারতের মধ্যেই একটা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানানোর চেষ্টা হবে। যাদের ভোটাধিকার থাকবে না, রেশন কার্ড বা আধার থাকবে না, একশো দিনের কাজ বা সরকারি চাকরি করার সুযোগ থাকবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। এদের মধ্যে থেকে কারও কারও যদি সত্যিই বাংলাদেশে শিকড় থেকে থাকে এবং ভারতে সব সুযোগ-সুবিধা হারিয়ে তারা বাংলাদেশে নিজে থেকে ফিরে যেতে চান সেটা অন্য কথা। কিন্তু নইলে এই লাখ লাখ মানুষকে কিছুতেই সভ্য ও কূটনৈতিক পন্থায় অন্য আর একটি মিত্র দেশে জোর করে পাঠিয়ে দেওয়ার কোনও উপায় নেই", মনে করছেন ড. দাস।

বস্তুত দক্ষিণ এশিয়াতে ভুটানকে বাদ দিলে বাংলাদেশই ভারতের এখন ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশী। দুই দেশের অর্থনৈতিক ও স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্কও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই কয়েক লাখ মানুষকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে ভারত সেই সম্পর্ককে নষ্ট করার ঝুঁকি নেবে - এটা মনে করছেন না ভারতের অধিকাংশ পর্যবেক্ষকই।

দিল্লিতে জহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং নামী ইতিহাসবিদ ও গবেষক মৃদুলা মুখার্জির মতে, "আমার রিডিং হল এনআরসি প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্যটা কিন্তু রাজনৈতিক। বিজেপি এটাই দেখাতে চাইছে যে তারা ভারতের প্রকৃত নাগরিকদের চিহ্নিত করে দেশের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। এই কারণেই আসামের পর তারা অন্যান্য রাজ্যেও এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করতে চায়। কিন্তু যে লোকগুলো তালিকা থেকে বাদ পড়ল, তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে বিজেপির তেমন কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধিত হবে না – বরং তাতে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। সেই কারণেই আমার ধারণা এই বিষয়ে তেমন কোনও জোরাজুরি করা হবে না। বরং এই লোকগুলো যদি ভোটাধিকার হারিয়ে ভারতেই থেকে যায়, তাতে বিজেপির বিশেষ ক্ষতি নেই। এমনিতেই আসামের বাংলাভাষী মুসলিমদের তারা নিজেদের সমর্থক বলে কখনওই মনে করেনি।"

সুতরাং ভারতের বেশিরভাগ বিশ্লেষকের পূর্বাভাস হচ্ছে, এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়া লাখ লাখ মানুষকে অদূর ভবিষ্যতে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হবে, সেই সম্ভাবনা খুব কম। আর সেই সম্ভাবনা কম হওয়ার কারণ হল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা অন্য কথাই বলছে।

"তাই বলে বাংলাদেশ এই ইস্যুতে নিশ্চিন্ত হয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতেও পারবে না। মুখে তারা যতই এটাকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বর্ণনা করুক, পর্দার আড়ালে তাদের এই চেষ্টাও প্রতিনিয়ত চালিয়ে যেত হবে যে, এই মানুষগুলোকে কিছুতেই যেন জোর করে সীমান্ত পার করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না-হয়!" ঢাকাকে পরামর্শ দিচ্ছেন অধ্যাপক উজ্জ্বল কুমার সিং।