• বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৩১ রাত

ভোগ ব্যয় ও সঞ্চয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা আবশ্যক

  • প্রকাশিত ০৫:১১ সন্ধ্যা জানুয়ারী ২১, ২০১৯
সঞ্চয়
ছবি: বিগস্টক

২০০৮ সাল স্মরণকালের ইতিহাসে সবচেয়ে অর্থনৈতিক মন্দার বছর ছিল, মানুষ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশংকায় বেশি করে ব্যক্তিগত সঞ্চয় শুরু করে। এই প্রবণতা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডগুলোকে অনেক কমিয়ে দেয় যাতে অর্থনৈতিক সংকট আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের জন্য ভোগ ব্যয় বৃদ্ধি এবং জাতীয় সঞ্চয়ের ফলপ্রসূ বিনিয়োগ করাটাও জরুরি। সম্প্রতি জাতীয় সঞ্চয় নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বিতর্ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিতর্কগুলোর অধিকাংশ তথ্য নির্ভর না হওয়ায় ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে। অনেকে দাবী করছেন, আমাদের জাতীয় সঞ্চয় কমে যাচ্ছে কারণ, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ সঞ্চয় করতে পারছেন আর বাকিরা সঞ্চয় তো করতে পারছেন না উপরন্তু ঋণকরে চলছেন। 

অন্যদের যুক্তি হলো, ব্যাংকগুলোসুদের পরিমান কমিয়ে দেওয়ায় জনগণ সঞ্চয় করতে কম আগ্রহী হচ্ছেন। 

জাতীয় সঞ্চয় দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্তজরুরি, এই কারনে সঞ্চয়ের প্রকৃত অবস্থাটি পরিষ্কার হওয়ার প্রয়োজন আছে. এই নিবন্ধের প্রতিপাদ্য বিষয়গুলো:

১. আমাদের জাতীয় সঞ্চয় কমছে না, বরং বেড়েছে। জাতীয় উৎপাদনের বিপরীতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার প্রতি বছর সামান্য ওঠানামা করে।

২. সঞ্চয়ের সুষ্ঠ বিনিয়োগ হচ্ছে না। ২০১৬ সালে স্থবির তারল্যের পরিমাণ নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে। এই পরিমাণ চলতি বছরে এক তৃতীয়াংশে নেমে আসলেও, প্রচুর বেকার টাকা ব্যাংকগুলোয় বসেআছে। আমাদেরমূল সমস্যা সঞ্চয় কমে যাওয়া নয়, সঞ্চয় লগ্নি না হওয়া। 

৩. ব্যক্তিগত পর্যায়ে ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার কমিয়ে সঞ্চয় করতে থাকলে পণ্যের চাহিদা কমে যায় এবং পরিণতিতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম শ্লথ কয়ে যায়। সঞ্চয়ের স্বার্থে ভোগ ব্যয় কমিয়ে ফেললে, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কমে যাবে।

২০১৬ সালে জাতীয়সঞ্চয়ের পরিমানছিল ৪ লক্ষ ৩ হাজার ৩০ কোটি টাকা যা২০১৭ অর্থ বছরেবৃদ্ধি পেয়ে৫ লক্ষ ৪ হাজার ৬০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছিল। ২০১৮ সালে জাতীয়সঞ্চয়ের পরিমাণ ৫ লাখ ২৮ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। (সূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ) 

এখানে উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালে সঞ্চয়ের পরিমান ছিলজিডিপির ২৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ যা ২০১৮সালে বছরে ২৮ দশমিক ০৭ এ. নেমে আসবে অনুমান করা হচ্ছে।

সুদের হার কমে যাওয়ায় সঞ্চয়ের পরিমানকমে যাচ্ছে - পত্র-পত্রিকায় এই ধরণের আলোচনার সঙ্গে পরিসংখ্যানের মিল নেই। সঞ্চয়ের মোট পরিমান বেড়েছে, শুধু শতকরা হিসাবে সামান্য দেড় ভাগ কমেছে।

১৯৯৪ সালথেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত জাতীয় সঞ্চয়জাতীয় আয়ের ২৫ থেকে ৩০ ভাগের মধ্যে ওঠানামা করছে। তাই শতকরা হারের সামান্য পরিবর্তন কোন তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় নয়। সঞ্চয় কমে যাচ্ছে এমন কোন সূত্র এই ছাড়তে দেখা যায় না। সঞ্চয়ের হার ২৯ থেকে৩০.৫ এর মধ্যেই আছে। ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল ২৯.৫%, সর্বোচ্চ ৩০.৮% ছিল ২০১৫- ২০১৬ সালে। 

চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়ের পরিমান রেকর্ড পরিমানে দাঁড়াবেবাড়বে কিন্তু হার যৎসামান্য কম হবে। হারের সামন্য কমতি হচ্ছে জিডিপি অনেক বেড়ে যাওয়ার জন্য। ( সব তথ্যের সূত্র : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো)

সঞ্চয় কমে যাচ্ছে এই দাবির পক্ষে কোনো তথ্য প্রমান পাওয়া যায় না। 

বাংলাদেশের জাতীয় উৎপাদনের বিপরীতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার খুব সম্ভবতঃ বিশ্বে সর্বোচ্চ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চলতি বছরে সঞ্চয়ের হার ৬% আর যুক্তরাজ্যের মাত্র ৪.৩%. গত ৬ দশকে যুক্তরাজ্যের জাতীয় সঞ্চয়ের গড় হার ৮.৫২% আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গড় হার ৮.৮২% (সূত্র:tradingeconomics.com ) বাংলাদেশের জাতীয় সঞ্চয়ের আমেরিকা, ইউরোপের ৪ গুন। 

সঞ্চয়ের সঙ্গে যদি বিনিয়োগ না বাড়ে, সঞ্চয় যদি স্থবির হয়ে ব্যাংকে বসে থাকে তাহলে এই অলস সঞ্চয় অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ ঘটায়। ২০১৬ এই সমস্যা প্রকটহয়ে দেখা দিয়েছিলো। নভেম্বর ২০১৬ ব্যাংকগুলোতে অলস তারল্য ছিল২৭৭,৯৫৬ কোটি টাকা। মে ২০১৮ তে ওই পরিমান কমে দাঁড়িয়েছিল ৭৯,৬৫০ (সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক)।এই বিশাল অংকের অলস টাকা ব্যাঙ্ক ঋণদিতে না পারলে বড়ধরণের সংকট সৃষ্টি হতো। 

অর্থনীতিবিদগণ সঞ্চয়কে ইতিবাচক মূল্যায়ন করেন যদি সঞ্চয়কেলগ্নী করা হয়। ব্যাংকে বেশি টাকা থাকলে ব্যাংক বেশি ঋণ দিতে পারবে। উদ্যোক্তারা বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে। কিন্তু উদ্যোগতারা যদি ঋণ না নেয়, তাহলে অলস টাকা প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করে দিতে পারে।

গত অর্থ বছরে দেশের সমষ্টিগত বিনিয়োগ জিডিপির ৩১% হয়েছে। এটাই সর্বকালের রেকর্ড। কিন্তু এর মধ্যেও কিছুটা হতাশার চিত্র আছে। বিনিয়োগের পরিমান বেড়েছে রাষ্ট্রীয় খাতে। সরকারের ব্যাপক অবকাঠামোর উপর বিনিয়োগের কারণে বিনিয়োগের হার বেড়েছে। প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ জিডিপির ২৩.২ ভাগ। গত এক দশক ধরেই প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগের হার ২১ থেকে ২৩ এর মধ্যে আটকে আছে। (সংখ্যাগুলোর সূত্র বিশ্বব্যাংক) 

দেখা যাচ্ছে সঞ্চয়ের একটা বড় অংশ এখনো বেকার পরে আছে।সঞ্চয়ের সঙ্গে বিনিয়োগের সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। ব্যাংকে পরে থাকা অলস টাকা লগ্নি করতে না পারলে, সঞ্চয়ের সুফল পাওয়া যাবে না। 

সঞ্চয় করার জন্য মানুষ ভোগ্যপন্য কম কিনতে থাকলে অর্থনীতিতে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যেসব পণ্য ও সেবা আমরা কিনে থাকি, তার কারণে পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হয়।চাহিদা মেটাতে কল কারখানা ও সেবাদায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের পণ্য সরবরাহ করে। আমরা যদি সবাই কষ্ট করে পয়সা জমানো শুরু করি, তাহলে পণ্যের চাহিদা কমবে, সরবরাহ ও উৎপাদন কমবে। 

অর্থনীতির গতিশীলতা কমে যাবে। আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের উপরইঅর্থনীতির ৭০% কার্যক্রম নির্ভর করে। 

মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ফেডারেল রিসার্ভ ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ভোগ ব্যয়ের প্রবণতা পর্যালোচনা করে থাকে। জনগণ ভোগ্যপন্য কম কিনে সঞ্চয় বাড়ানোর অর্থ ধরা হয়, যে জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থার উপর আস্থা কমে গেছে, যে কারণেকারণে ভবিষ্যতের কথা ভেবে সঞ্চয়ের প্রবণতা বেড়েছে। যখনি কনসিউমার কনফিডেন্সের সূচক কমে যায়, পুঁজিবাজারে তাৎক্ষণিক পতন ঘটে।

২০০৮ সাল স্মরণকালের ইতিহাসে সবচেয়ে অর্থনৈতিক মন্দার বছর ছিল, মানুষ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশংকায় বেশি করে ব্যক্তিগত সঞ্চয় শুরু করে। এই প্রবণতা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডগুলোকে অনেক কমিয়ে দেয় যাতে অর্থনৈতিক সংকট আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে। 

এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য, আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশের সরকারগুলোজনগণকে বেশি সঞ্চয় না করে প্রয়োজনীয় ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ করতে অনেকগুলো পদক্ষেপ নেয়। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য সব দেশের সরকার লক্ষ লক্ষ কোটি ডলার বাজারে ছাড়ে। পেনশন সঞ্চয়ের একটা অংশ অবমুক্ত করা হয়, যাতে সবাই বেশি খরচ করে। এইসব উদ্যোগের ফলশ্রুতিতে ২০১০ সালথেকে মন্দ ক্রমশঃ কাটতে থাকে।

ভোগ্য পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি সবসময় অর্থনীতির গতিকে সচল রাখে। ভালো খবর হলো, চলতি বছরে দেশে পণ্য ভোগের মাত্রা ঊর্ধ্বগামী। পরিসংখ্যন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী বর্তমান অর্থ বছরে ভোগ বাবদ ব্যয় ১৭ লাখ ৯ হাজার ৯২৯ কোটি টাকায় উন্নীত হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।গত অর্থবছরে ভোগ ব্যয় ছিল ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। ভোগ ব্যয় বাড়তে থাকলে অর্থনীতি আরো গতিশীল হবে। 

পশ্চিমা দেশের তুলনায় আমাদের দেশের সঞ্চয়ের হার অনেক বেশি হওয়ার কারণ আছে। আমাদের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হয়।হঠাৎ করে আশা অঘটনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। বিশেষ করে চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য সঞ্চয় রাখা খুবই দরকার। পশ্চিমের দেশগুলোয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা ফ্রি হয় তাই সঞ্চয় নিয়ে ভাবতে হয় না। 

তবে অতিরিক্ত কৃচ্ছতা সাধন না করে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করার জন্য যতটা সঞ্চয় করা যায়, ততটাই করা উচিৎ। তা নিজের জন্যেও ভালো, দেশের জন্যেও ভালো।


ওবায়দুল করিম খান, বাণিজ্যিক পরামর্শক ও লেখক