• শুক্রবার, জুলাই ১৯, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৪ রাত

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর দুটি সহজ উপায়

  • প্রকাশিত ০৬:০১ সন্ধ্যা ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর দুটি সহজ উপায়
জর্জিয়ার মান এবং প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ থেকে অনেকটাই ভিন্ন হলেও এর গল্পটি হয়তো অনুপ্রেরণামূলক। ছবি: বিগস্টক

"প্রতিটি দেশেরই একটি অনন্য রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে এবং অন্য আর কোন জায়গা থেকে কোনোরকম প্রি-প্যাকেজ সমাধান নিয়ে আসা কোনোভাবেই বিজ্ঞের কাজ নয়। অবশ্য, কিছু পর্যবেক্ষণ  আমাদের দেশের জন্য উপযুক্ত একটি পরিকল্পিত পদ্ধতির নকশা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।"

বাইরের বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ নিয়ে সবচেয়ে কৌতূহলের ব্যাপার হলো, খুব জটিল কাজগুলো এই দেশ খুব ভালমতো সম্পন্ন করে ফেলে, অথচ, তুলনামূলকভাবে সহজ কাজগুলো করতে কেন জানি অসুবিধা হয়।

বিগত চার বছরে দেশটির বার্ষিক দেশীয় উৎপাদন (জিডিপি) শতকরা সাত ভাগ ছাড়িয়ে গেছে। 

এরকম চলতে থাকলে, প্রতি দশ বছরে জাতীয় আয় দ্বিগুণ হতে থাকবে।

তাছাড়া, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ এবং ইনক্লুসিভ অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার সমপর্যায়ের দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় কাজের প্রতি দৃঢ়তা এবং মিতব্যয়ী উদ্ভাবনের জন্য বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, দেশটি ডিজিটাল সংযোগ এবং গ্রহণযোগ্যতায় অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক প্রোফাইল (যেখানে আট কোটি মানুষের বয়স তিরিশ বছরের নীচে) এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব (যা স্কেল এবং নেটওয়ার্ক সম্পৃক্ত সুবিধাগুলির পথ সুগম করে) সম্ভাব্য বিকাশের দৃঢ় ভিত্তি।

ভূ-অবস্থানের দিক থেকে ভারত, চীন এবং আসিয়ানের অন্তর্ছেদে অবস্থান করায় ভূ রাজনৈতিক সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ অথবা সাপ্লাই চেইনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ সুবিধাজনক অবস্থানেই আছে।

ভিত্তিগত মজবুতি, দৃশ্যমান সম্ভাবনা আর কৌশলগত দিক অনুসারে অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ বেশ অনুকূল অবস্থান উপভোগ করে।

এই প্রেক্ষাপটে আপাতদৃষ্টিতে এমন সহজ কাজ কি আছে, যা করতে পারলে খুবই দ্রুত অনেক লাভ হতে পারে?

যে দুটি বিষয়ে অবিলম্বে নজর দেয়া দরকার 

এরকম অন্তত দুটি জায়গা আছে।

প্রথমত, নতুন নীতিমালার জন্য অপেক্ষা না করে, বিদ্যমান আইন ও প্রক্রি

য়ার বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না তার ওপর নজর দিতে হবে। কি করা প্রয়োজন তার চাইতে কিভাবে করা উচিৎ, কার দ্বারা এবং কখন কাজটি হবে- এসব বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বড় বড় নির্দেশিকাগুলিকে ছোট ছোট অনেকগুলো পদক্ষেপে ভাঙতে হবে এবং সেইসাথে সেসব ছোট ছোট পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে কি না তার ওপর মন্ত্রীদের প্রশাসন থেকে জবাবদিহিতা পেতে হবে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি যত বাড়বে, সেইসাথে এসব ক্ষেত্রে ভুল-ত্রুটির মার্জিন সংকীর্ণ হয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সৌন্দর্য প্যারেডে বাংলাদেশ নিজেকে আরও অনেক কার্যকরীভাবে উপস্থাপন করতে পারে। ব্র্যান্ড মার্কেটিং-এ আমরা স্টাইল, কন্টেন্ট, এনার্জি- এসব দিক থেকে অকারনে পিছিয়ে আছি। কিছু কিছু ডিপার্টমেন্ট ছাড়া (যেমন আইসিটি ডিপার্টমেন্ট), সব ক্ষেত্রে আমাদের ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আমাদের আউটরিচ আরও অনেক উন্নত করতে হবে। 

ইজ অফ ডুইনিং বিজনেসে (ইওডিবি)-এ বাংলাদেশের অবস্থানে উন্নতি এনে এবং সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করে উল্লেখিত দুটো ব্যাপারেই অগ্রগতি আনা সম্ভব।

ইজ অফ ডুইং বিজনেস (ইওডিবি): ইন্দোনেশিয়া ও জর্জিয়া

কিভাবে বাংলাদেশ ইওডিবিতে তার অবস্থানে উৎকর্ষতা আনতে পারে? প্রতিটি দেশেরই একটি অনন্য রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে এবং অন্য আর কোন জায়গা থেকে কোনোরকম প্রি-প্যাকেজ সমাধান নিয়ে আসা কোনোভাবেই বিজ্ঞের কাজ নয়। অবশ্য, কিছু পর্যবেক্ষণ  আমাদের দেশের জন্য উপযুক্ত একটি পরিকল্পিত পদ্ধতির নকশা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।

উল্লেখ্য,গত বছরের তুলনায় বাংলাদেশের ইজ অফ ডুইং বিজনেস-এর (ইওডিবি)অবস্থানে উন্নতি না থাকলেও স্কোরের ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। তবে,ভিয়েতনাম এর স্কোর সেক্ষেত্রে বেড়েছে আমাদের চাইতে দ্বিগুণ এবং ভারতের স্কোর বেড়েছে ছয় গুণ। এতেই দেখা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কতো তুমুল এই প্রতিযোগিতাটা।

ইওডিবি সূচকটিকে তার ১১ টি সাব-ক্যাটাগরিতে ভাগ করলে ব্যাপারগুলো বোঝা আরও সহজ হয়ে যায়। যেমন, একটি ব্যবসা শুরু করার জন্য যে সময়টা দরকার, সম্পত্তি নিবন্ধনের জটিলতা, চুক্তির প্রয়োগ এবং ডিফল্ট সমাধান করা- এসব বিষয়ে একসাথেই উন্নতি চাওয়ার পরিবর্তে, দুই বা তিনটি ক্যাটাগরি সনাক্ত করে তার উপর কাজ করা আরও বেশি কার্যকর হতে পারে।

ইন্দোনেশিয়া তার অবস্থানে দুই বছরের মধ্যে ১০৬তম থেকে ৭২ তম অবস্থানে উন্নীত হয়েছে। নির্বাচনের তাৎক্ষণিক মাসগুলিতে, রাষ্ট্রপতিসহ সরকারের সর্বোচ্চ স্তরেও এই বিষয়ে জরুরি অবস্থা অনুভূত হয়েছিল। তাদের বিনিয়োগ সমন্বয় বোর্ডের প্রধান ( আমাদের বিআইডিএ'র সমতুল্য) টমি লেম্বং পূর্বে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং এর আগে একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকার ছিলেন। তার পূর্বের বাণিজ্য মন্ত্রী গীতা উইরইয়াওয়ানও ছিলেন একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকার।

সবকিছু একসাথে না বদলে ইন্দোনেশিয়া সীমিত কয়েকটি ক্যাটাগরির দিকে মনযোগী হয়। যেমন, " অস্বচ্ছলতা (ইনসলভেন্সি)সমাধানকারী" নির্দেশক - এবং সেইসাথে নিশ্চিত করে যে এর প্রণয়ন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।এসব ক্যাটাগরির দায়বদ্ধতা সুপ্রিম কোর্টের একজন উচ্চপদস্থ বিচারক ব্যক্তিগতভাবে নেন। এর ফলে তাদের অবস্থান এক বছরে ৭৪ তম থেকে ৩৮ তমে উন্নীত হয়। 

তারা ডিজিটাল সরঞ্জামগুলির সদ্ব্যবহার করেছে, উদাহরণস্বরূপ, ইলেকট্রনিক লাইসেন্সিং, পুনর্নবীকরণ এবং এমনকি ইকোর্ট (e-court) পরিষেবাগুলোও। উন্নত শাসন ও প্রক্রিয়াগুলির জন্য তার উপাদানগুলোকে শক্তিশালী করতে বাংলাদেশের রয়েছে ডিজিটাল অবকাঠামো। প্রতিটি ফাইলের জন্য একটি ডিএইচএল-এর মতো ট্র্যাকার থাকা উচিৎ। প্রতিটি পরিষেবার জন্য একটি ট্রিপ অ্যাডভাইজার স্টাইল রেটিং অনুসরণ করা উচিৎ। এভাবে আমাদের সার্ভিস পরিমাপ উন্নত হতে থাকবে।

ইওডিবি'র শীর্ষ স্থানীয় দশটি দেশের মধ্যে একমাত্র উন্নয়নশীল দেশ হল সাবেক সোভিয়েত রিপাবলিক অফ জর্জিয়া। যদিও এটির মানএবং প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ থেকে অনেকটাই ভিন্ন, এর গল্পটি হয়তো অনুপ্রেরণামূলক।

মাত্র এক বছরে জর্জিয়া ইওডিবি'র ৬৩টি ধাপ অতিক্রম করে। এর সাথে জর্জিয়ার জিডিপি শতকরা ১২ ভাগ বৃদ্ধি পায়। তাদের de-bureaucratization-এর দুটা উদাহরণ দিচ্ছি: 

প্রথম যে নিয়ম ঘোষিত হয়, তার শিরোনাম: "নীরবতা সম্মতির লক্ষণ"। অন্য কথায়, যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনও আবেদনে কোনোরকম প্রতিক্রিয়া না থাকে তবে এটি অনুমোদিত বলেই ধরে নেয়া হয়। আমলাতান্ত্রিকদের দ্বারা নীরবতা বা স্টোনওয়ালিং গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত, তারা "এক সরকার তন্ত্র"কে বাস্তবায়িত করে । তার মানে, সরকারের এক শাখার ইস্যু করা নথিপত্রসরকারের অন্য শাখা দাবি করতে পারবে না। এই তথ্য প্রাপ্তির জন্য আমলাতন্ত্র দায়বদ্ধ, আবেদনকারী নয়।

প্রভাবটি ছিল ব্যাপক। উদাহরণস্বরূপ, সম্পত্তি নিবন্ধনের প্রক্রিয়াটি ৩৯ দিন থেকে মাত্র একদিনের মধ্যে কমিয়ে আনা। যার ফলে জর্জিয়া এই ক্ষেত্রে ইওডিবি'তে এক নম্বর দেশ হিসেবে উপনীত করে।

ইন্দোনেশিয়া ও জর্জিয়ার উভয়ই একইভাবে ব্যবসায়িক অবস্থার উন্নতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে, ঠিক যেভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ক্ষেত্রে করেছে! উদাহরণ স্বরূপ, আশানুরূপ ফলাফল পেতে জাতীয় ক্রিকেট দলের জন্য বিদেশী কোচও নিয়োগ করে বাংলাদেশ।

জরুরী বছরগুলিতে জর্জিয়ার অর্থনীতি মন্ত্রী ছিলেন একজন কানাডিয়ান-জর্জিয়ান তরুণ,  মিসেস ভেরা কোবলিয়া। উল্লেখ্য, পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়ার সরকার কর্তৃক 'ডুইং বিজনেস এ্যাডভাইজার' হিসেবে ভেরাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল - যা সেই বিদেশি ক্রিকেট কোচের গল্পটার মতোই!

জর্জিয়ার সাবেক অর্থনীতি মন্ত্রী  মিসেস ভেরা কোবলিয়ার সাথে লেখক লুতফে সিদ্দিকী। ছবি: সৌজন্য 

ওয়ান স্টপ সার্ভিস এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা

যে দেশগুলি তাদের ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করেছে, তাদের মধ্যে যে বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে তা হল, ওয়ান স্টপ সার্ভিসের ধারণা। এটি যুক্তিযুক্ত যে টাচ-পয়েন্টগুলোর স্ট্রিমলাইনিং, অনুলিপি অপসারণ এবং কর্মগুলির সমান্তরাল সঞ্চালনই দক্ষতা বৃদ্ধিসহ গ্রাহকের অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করবে। যাইহোক, ওয়ান স্টপ সার্ভিসের কার্যকর শব্দটি হল "সার্ভিস" বা "সেবা" । সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের পরিষেবামূলক মানসিকতায় কোনরকম উপাদান পরিবর্তন না করে, ওয়ান-স্টপ-সার্ভিসটি ওয়ান-স্টপ চোকপয়েন্ট হওয়ার ঝুঁকি নিতে পারে।

এফডিআই আকর্ষণের জন্য গ্রাহক সেবার উপর জোর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়াতে ক্রমবর্ধমান দেশগুলি যখন বহুগুণে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে ফেলেছে, সে সময় বাংলাদেশে তিন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের জন্য সন্তুষ্ট হওয়ার কোনও যৌক্তিক কারণ নেই।

সিঙ্গাপুর বছরের পর বছর দেখিয়ে গেছে- আদতে এক ব্যক্তি যেসব কারণে অন্য ব্যক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয় বিনিয়োগ আকর্ষণ করা তার থেকে ভিন্ন কিছুই না। ব্যক্তিগত কেমিস্ট্রি এবং মানসিক অভিজ্ঞতা উপরই এর অনেকটাইনির্ভর করে। কাগুজে নীতি ও প্রবিধানগুলি যথেষ্ট নয় যদি তা মানুষের অনুভূত অভিজ্ঞতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়। ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের অভিজ্ঞতাই এর একটি কার্যকর উদাহরণ।

সামনের পথে 

উপসংহারে বলা যায়, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা অর্জনের জন্য এ ধরনের স্পষ্ট লাইন অফ সাইট এর আগে দেখেনি। এই দর্শনে কোন দ্ব্যর্থতা নেই। সবকিছু প্রণয়নের উপরই নির্ভর করে এবং একটি কার্যকরী একমুখী পরিচালনা আমাদের দ্বারা সম্ভব। এটি অর্জন সম্ভবশুধুমাত্র অবিচ্ছিন্ন দৃঢ়তা, নির্দিষ্ট সময়সীমাবদ্ধ কর্মের জন্য জবাবদিহিতা এবং বিভাগীয় কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে। এর একটি বড় অংশ কার্যকর হবে মানসিকতার পরিবর্তন ও ডিজিটালের সাহায্যে।


লুতফে সিদ্দিকী সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অ্যাডজাঙ্কট  প্রফেসর এবং বালাদেশের পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট ফেলো।