• সোমবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৩ দুপুর

আমার বাবার হত্যার বিচার হল না কেন?

  • প্রকাশিত ০৮:৫৩ সকাল নভেম্বর ৭, ২০১৯
খালেদ মোশাররফ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ২নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ও 'কে-ফোর্স'-এর সর্বাধিনায়ক মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম এর যুদ্ধকালীন ছবি সংগৃহীত

জাসদ ৭ নভেম্বরকে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এবং বিএনপি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বলে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে তারা এই কলঙ্কিত দিবসটিকেই খুশির দিবস হিসেবে পালন করছে! ধিক্ তাদের!

আবারও নভেম্বর মাসটা চলে এলো। নভেম্বর এলেই বাবার কথাই শুধু মনে হয়। কী জঘন্যভাবেই না তাকে (মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীরউত্তম, ২ নম্বর সেক্টর ও কে ফোর্সের অধিনায়ক) হত্যা করা হয়েছে। তার সঙ্গে আরও হত্যা করা হয় ২ নম্বর সেক্টরের সেকেন্ড ইন কমান্ড লে. কর্নেল এটিএম হায়দর (বীরউত্তম) ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি কর্নেল নাজমুল হুদা বীরবিক্রমকেও। এত বড় বীর মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পড়ে নায়ক থেকে ভিলেন হয়ে গিয়েছিলেন।

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে আমার বাবা ২৫ মার্চ পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। একবারও চিন্তা করেননি তার পরিবারের কথা। কোথায় আছে তারা এটা না ভেবে শুধু কীভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হবে সেই চিন্তা নিয়েই প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত করেন। রণাঙ্গনে, সম্মুখযুদ্ধে স্পি­ন্টার লেগেছিল তার মাথায়। সেদিন শত্রুরা তাকে হত্যা করতে পারেনি। ভারতে চিকিৎসার পর তিনি আবার সুস্থ হয়ে উঠেন। কিন্তু ৭ নভেম্বর তাকে প্রাণ দিতে হয় যুদ্ধের ফসল স্বাধীন বাংলাদেশের সতীর্থদের হাতে। প্রায়ই ভাবি আমি তো সাধারণ কারও মেয়ে হতে পারতাম। তাহলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারতাম। হয়তো অকালে বাবাকে হারাতে হতো না। কত কথা বলার ছিল, বলা হল না তাকে কত ভালোবাসি।

যুদ্ধের পরের ছোট্ট একটি ঘটনা। যুদ্ধের সময় রণাঙ্গনে তার মাথায় যে স্পি­ন্টার ঢুুকেছিল, তার একটি গল্প শুনেছিলাম বাবার বন্ধু গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদের (সচিত্র সন্ধানীর সম্পাদক, আমার মার সম্পর্কে খালাতো ভাই) সহধর্মিণীর কাছ থেকে। যুদ্ধের পরে যখন বাবাকে তার বাড়িতে দাওয়াত দেওয়া হয়, তিনি বলেছিলেন, কী দিয়ে বরণ করব, আপনি তো সদ্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এসেছেন। বাবা উত্তরে বলেছিল আমার মাথায় যে গর্ত হয়েছে (স্পি­ন্টারের আঘাতে) সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। দেখ বাংলাদেশ এটাই দিয়েছে আমাকে। আমাকে অনেকেই বলে, আপনারা তো ’৭৫ এর পর ভালোই ছিলেন। আসলে কি তাই? ’৭৫ এর পর আমরা কেমন ছিলাম সেটা বোঝানো খুব কষ্টকর। অনেক ছোট আমরা, আমার বয়স ৭, দ্বিতীয় বোন ৫, আর একদম ছোট্টটা তো মাত্র ১ বছরের। কিছুই বোঝে না সে। বাবা নেই সেটা একটা কষ্ট, আরেকটা কষ্ট হল জীবন চলার কষ্ট। কোথায় থাকব, কীভাবে থাকব, কীভাবে চলব, কিছুই বুঝতে পারছিলেন না মা। 

একটু বলে রাখা দরকার, আমাদের চলার জন্য বাবা কিছুই রেখে যাননি। আমার নানি যখন ৮ তারিখে আমাদের ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে গেলেন, আমার ছোট্ট বোনের কিছু জিনিসপত্র আনতে যেয়ে দেখেন, বাড়িতে একটি সুতাও নেই। সিপাহিরা সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে, তাকে আটকে রেখে আমাদের পরিবারকে খুঁজছে। আমরা ৭ নভেম্বরের আগেই নানির বাড়িতে গিয়ে থাকছিলাম। আমার নানি সেদিন পালিয়ে কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে আসেন। আমরা বাবাকে শুধু সেদিন হারাইনি; তার সব স্মৃতিও হারিয়ে ফেলেছি। কত নিষ্ঠুর তারা, স্মৃতিটুকুও আমাদের রাখতে দেয়নি। 

জীবন-সংগ্রামের কথা আগেই বলেছি। “ক্যান্টনমেন্ট” থেকে চলে আসার পর অন্তত ১ বছর আমরা স্কুলে যাইনি। কীভাবে যাব? শহীদ আনোয়ারে পড়তাম, তাহলে তো আবার ক্যান্টনমেন্টে যেতে হতো। তখন অনেক কিছুই বুঝতে পারিনি, এখন বুঝি, মায়ের ভয়ের কারণেই আমাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পরে হলিক্রসে ভর্তি হই। আবার স্কুল আরম্ভ করলেও সেটা ছিল অনেক restricted life. অন্য বাচ্চাদের মতো আমরা সবার সঙ্গে মেলামেশা করতে পারতাম না। নিজের পরিচয় পর্যন্ত দিতাম না। অনেকটা নিজেদের আমরা গুটিয়ে রেখেছিলাম। মায়ের একটাই ভয় যদি বাবার মতো আমাদেরও মেরে ফেলা হয়? তিন বোন ও মা আমার মামার বাড়িতে একটি ঘরে থাকতাম। আমার বাবার তো এত শুভাকাংক্ষী, এত বন্ধুবান্ধব, তাদের কেউ এলো না সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে। সেদিন মামা আশ্রয় না দিলে হয়তো রাস্তার ভিখারি হতাম আজ।

মনে আছে, খুব কষ্ট করে একাকী মা আমাদের আগলে ধরে তার জীবন আরম্ভ করেন। বাবার তো কিছুই ছিল না। তাই মা বাধ্য হয়ে কাপড় সেলাই করে যা পেতেন তা দিয়েই আমাদের স্কুলের চাহিদা মেটাতে থাকেন। জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর খালেদা জিয়া ও তার পরিবার যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিল তার কিছুই তো আমরা পাইনি। তার ছেলেদের পড়াশোনার জন্যও ভাতা দেওয়া হয়েছে। হয়তো আমাদের কিছু না দেওয়াতে আল্লাহ আমাদের তার ও তার পরিবার থেকে ভালোই রেখেছে। 

এখনও চোখ বন্ধ করলে আমি আমার বাবার লাশটি দেখতে পাই। তার চেহেরাটা মনে পড়ে; একদম আকাশের চাঁদের মতো সুন্দর। আমার বাবার লাশ আমরা কয়েকদিন পর পাই, আসলে ক্যান্টনমেন্ট থেকে নিয়ে আসারও লোক ছিল না সেদিন। সেদিন বুঝতে পারলাম আমার বাবার সঙ্গে যারা এত সময় কাটিয়েছে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব তারা আমাদের পাশে নেই।

বাবার সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা ৬ নভেম্বর ১৯৭৫; আমরা তার সঙ্গে ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে রাতের খাবার খাই, খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নানির বাড়ি চলে যাই। আমার মনে আছে আমার ১ বছরের বোন কোনোভাবেই বাবাকে ছাড়বে না। অনেক কাঁদছিল; হয়তো অবুঝ শিশু বুঝেছিল যে তার বাবাকে আর কোনোদিনই জীবিত পাবে না।

এখন আমরা তিন বোন বড় হয়েছি। অনেক কিছু বুঝি। আমি রাজনীতিতে এসেছি, অনেক মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা। অনেকেই আমাকে বলে সংসদ সদস্য হয়েও তুমি তোমার বাবার এবং তার সহকর্মীদের হত্যার বিচার করছো না কেন? আমার দৃঢ় আশা, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিচারের পদক্ষেপ নেবেন। তিনি তো বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার করেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার করেছেন। কেন তিনি ’৭৫ এর ৭ নভেম্বরের বীরসন্তানদের হত্যার বিচার করবেন না? 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবিনয় আবেদন, একটি ট্রুথ কমিশন গঠন করে আমার বাবার ও অন্য মুক্তিযোদ্ধ অফিসারদের হত্যার তদন্ত করা উচিত। জিয়াউর রহমানের নির্দেশে মেজর জলিল ও মেজর আসাদ নির্বিঘ্নে আমার বাবাসহ তিন মুক্তিযোদ্ধাকে ঠাণ্ডামাথায় গুলি করেন। যারা ষড়যন্ত্র করেছিল, আমার বাবাকে ভারতের দালাল হিসেবে আখ্যা দিয়ে মিথ্যা গুজব রটিয়ে লিফলেট ছড়িয়েছিল, তাদের ব্যাপারেও তদন্ত হওয়া দরকার। 

জাসদ ৭ নভেম্বরকে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এবং বিএনপি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বলে থাকে। আসলেই কি তা? হাসি আসে, মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে তারা এই কলঙ্কিত দিবসটিকেই খুশির দিবস হিসেবে পালন করছে! ধিক্ তাদের! জাতি আর বিকৃত ইতিহাস শুনতে চায় না। এই দিবসটি নিয়ে মিথ্যা প্রচার নিষিদ্ধ করতে হবে। ৭ নভেম্বরে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে আমাদের। 


মাহজাবিন খালেদ : সাবেক সংসদ সদস্য, সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের কন্যা