• বুধবার, অক্টোবর ২৩, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৭ রাত

গুলতিবাজ থেকে এশিয়ার সেরা তীরন্দাজ রোমান

  • প্রকাশিত ০৫:০৯ সন্ধ্যা সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৯
রোমান সানা
ফিলিপাইনে এশিয়া কাপ আর্চারিতে তীরন্দাজ রোমান সানা। ছবি: সংগৃহীত।

ছোটবেলায় বাজি ধরে অনেক দূর থেকে গুলতি দিয়ে হেসেখেলে চড়ুই পাখি শিকার করতো রোমান

খুলনার প্রত্যন্ত অঞ্চল সুন্দরবন ঘেষা কয়রা উপজেলার বাগালি গ্রামের গুলতিবাজ এক কিশোর সময়ের পরিক্রমায় আজ এশিয়ার সেরা তীরন্দাজ (আর্চার) রোমান সানা। ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ স্টেজ থ্রি আর্চারিতে সোনা জিতেছেন তিনি। তার অর্জনে খুলনার প্রত্যন্ত এই অঞ্চলটির মানুষ আজ দারুণ উচ্ছ্বসিত।

এশিয়ার সেরা তীরন্দাজ রোমান সানার বাবার নাম মো. আব্দুল গুফুর সানা ও মায়ের নাম বিউটি বেগম। তিন ভাই-বোনের মধ্যে রোমান সবার ছোট। রোমানের বড় ভাই বিপ্লব সানা বলেন, "ছোটবেলা থেকেই রোমান গুলতি দিয়ে পাখি শিকার করত। রোদে ঘোরাঘুরি আর কাদামাটি নিয়ে খেলা নিয়েই ব্যস্ত থাকতো সারাদিন। আর খুব জেদি ছিল রোমান। তবে, গুলতিতে ওর হাত ছিল দারুণ।"

রোমানের পিতা গফুর সানা বলেন, "গ্রামে থাকাকালে ছোটবেলা থেকেই রোমানের গুলতির নিশানা ছিল চমৎকার। বাজি ধরে অনেক দূর থেকে গুলতি দিয়ে হেসেখেলে চড়ুই পাখি শিকার করতো রোমান। গাছে থাকা আমের মধ্যে বেছে বেছে ঠিক পাকা আমটিই গুলতি দিয়ে নিচে নামাতো।"

২০০৭ এর ঘুর্নিঝড় আইলায় রোমানদের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। রোমানের বাবা সপরিবারে খুলনায় চলে আসেন। খুলনার শিশু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখানেই ৮ম শ্রেণিতে পড়ার সময় তীরন্দাজ হিসেবে রোমানের যাত্রা শুরু হয়। আর্চারি ফেডারেশনের একটি প্রতিনিধিদল বাছাই করার জন্য তীরন্দাজ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। স্কুলের হাসান স্যারের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যাপারে জানতে পারেন রোমান। পরে প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে সাফল্যের সাথে ফেডারেশনের তালিকাভুক্ত হন তিনি।

তখন প্রতিনিধি দলের কোচ হিসেবে থাকা সাজ্জাদ হোসেন তার মা বিউটি বেগমকে রাজি করিয়ে রোমানকে ঢাকায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। সেই থেকেই রোমানের তীরন্দাজ হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে রোমানকে হাতখরচ হিসেবে কষ্টের মধ্যে থেকেও কিছু কিছু টাকা পরিবার থেকে পাঠানো হতো। তবে, কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। পরে রোমানকে আর টাকা পাঠানো লাগেনি।

২০১২ সালে একটি দুর্ঘটনায় রোমানের পা ভেঙে যাওয়ায় তীরন্দাজ হয়ে ওঠার স্বপ্ন ফ্যাকাসে হয়ে পড়ে। ফেডারেশনের সহায়তায় সেবার সুস্থ হয়ে ওঠেন রোমান। ওই বছরই বাংলাদেশ গেমসে আনসারের হয়ে ভাঙ্গা পায়ে স্বর্ণ জিতে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। এরপর একে একে আটটি সোনা জিতেছেন রোমান। তার ঝুলিতে রয়েছে অসংখ্য রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদকও।

রোমানের মা বিউটি বেগম বলেন, "ছোটবেলা থেকেই রোমান জেদি আর একরোখা। ও একবার যদি ভাবে কিছু করবে, তো করেই ছাড়বে। সেই জেদ থেকেই ও আজকের এই অবস্থানে এসেছে।"

তিনি বলেন, "ফিলিপাইনে রোমানের সোনা জেতার খবরটি প্রথমে আমাকে বৌমা জানায়। ওই খবরের পর এত বেশি উচ্ছ্বসিত হয়েছি যে কান্না ধরে রাখতে পারিনি।"

বিউটি বেগম আরও জানান, রোমানের ফিলিপাইন যাত্রার আগে থেকেই তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। কিন্তু খেলার ক্ষতি হবে ভেবে তাকে সেটা জানতে দেওয়া হয়নি। বিফলে যায়নি রোমানের মায়ের ত্যাগ। ফিলিপাইনে এশিয়ার সেরা তীরন্দাজের খেতাব অর্জন করেছেন তার ছেলে।