অকটেন-৯৫ গ্যাসোলিনের লিটার প্রতি ৮৯ টাকা হওয়ায় মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ানো আর একইসঙ্গে মানিব্যাগের স্বাস্থ্য ভালো রাখা বর্তমানে বেশ কঠিন। বাংলাদেশে মোটরসাইকেলগুলো এখনও সর্বোচ্চ মাত্র ১৬৫ সিসির নির্দিষ্ট মাইলেজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আছে।
তবে, বাংলাদেশে গাড়ির পরিবর্তে মোটরসাইকেল চালানো বিভিন্নভাবে উপকারী এবং বেশিরভাগ মানুষ কেন গাড়ির পরিবর্তে “টু-হুইলার” বেছে নেয় তার অন্যতম প্রধান কারণ জ্বালানির দাম।
মোটরসাইকেলগুলো এক লিটার জ্বালানি দিয়ে গড়ে মাত্র ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে, তবে আরও সাবধানে চালালে আরও বেশি মাইলেজ পাওয়া সম্ভব।
জ্বালানি খরচ কম রাখার ক্ষেত্রে গতি প্রধান কারণ। খুব বেশি গতি তোলা হলে স্বাভাবিকভাবেই জ্বালানি খরচ বেশি হবে। তাই একটি সুষ্ঠু গতি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আবার দ্রুত গতি কমানো-বাড়ানো হলে আরও বেশি জ্বালানি খরচ হবে।
অন্যদিকে, যদি সুষ্ঠু গতি রাখা যায় তাহলে কম জ্বালানি খরচ হবে। বাইকের মাঝামাঝি গতিতে স্থির থাকার জন্য যতটুকু জ্বালানি প্রয়োজন ততটুকুই দেওয়া উচিত। রাজধানী ঢাকার সড়কে প্রতি ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার থেকে ৭০ কিলোমিটারের বেশি গতিকে অতিরিক্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তবে, হাইওয়ের জন্য একটু বেশি অর্থাৎ ঘণ্টা প্রতি ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতি হওয়া উচিত।
টায়ারের চাপ হচ্ছে ট্র্যাকশন। যদি এটি স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়, তাহলে বাইকটি বেশি জ্বালানি খরচ করবে। তাই সাপ্তাহিক ভিত্তিতে কোম্পানির সুপারিশ করা টায়ারের চাপ পরীক্ষা করা উচিত। কম টায়ার চাপের একটি বাইক চালানোর ক্ষেত্রে ভারি এবং ভারসাম্যহীন মনে হবে। বাইকের টায়ার রাস্তায় আরও গ্রিপ করবে এবং গতি কমে যাবে।
ড্রাইভ চেইনটিও সামঞ্জস্য রাখা দরকার, যেন গিয়ার পরিবর্তনের সময় ইঞ্জিন থেকে শক্তি নষ্ট না হয়। সামঞ্জস্যহীন ড্রাইভ চেইন স্প্রোকেটগুলো মিস করবে এবং বাইকের ক্ষতি করবে।
নির্গমনের মাত্রা কম বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে এবং এটি করার জন্য, স্পার্ক প্লাগ এবং এয়ার ফিল্টার পরিষ্কার রাখতে হবে। ইঞ্জিন তেল বেশি ব্যবহার না করা ও ভেজাল জ্বালানি ব্যবহার না করা নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানি ব্যয় কমানোর বুদ্ধি
বাইকটিকে দীর্ঘক্ষণ কম গিয়ারে চালানো উচিত না। এতে উচ্চ রেভ ট্যাঙ্ক থেকে আরও জ্বালানি নিষ্কাশন করবে।
সরাসরি সূর্যের নিচে বাইক পার্ক করে রাখলে ট্যাঙ্ক থেকে জ্বালানি বাষ্পীভূত হয়ে যাবে। তাই পার্ক করার সময় ছায়া আছে এমন স্থান বেছে নেওয়া উচিত।
কখনও কখনও আমরা জরুরি ব্রেকিংয়ের জন্য ব্রেক প্যাডেলের ওপরে পা রাখি। এতে বাইক চলার সময় অবচেতনভাবে প্যাডেলের ওপর চাপ পড়তে পারে। ফলে জ্বালানির ক্ষয় হয়।
ঢাকায় ট্রাফিক জ্যাম অনিবার্য। সেক্ষেত্রে উচ্চ আরপিএম-এ ট্র্যাফিকের মধ্য দিয়ে যাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে এবং বাইক নিয়ে ৩০ সেকেন্ডের বেশি ট্রাফিকের মধ্যে থাকতে হলে ইঞ্জিন বন্ধ রাখা উচিত।
কখনও কিট দিয়ে বাইকের সামনের অংশ ঢেকে রাখা যাবে না। এতে বাইকের ইঞ্জিন ঠাণ্ডা হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় এবং উচ্চ তাপমাত্রার অর্থ আরও বেশি জ্বালানি খরচ হয়।
যারা প্রতিদিন দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াত করেন তাদের জন্য মোটরসাইকেল হচ্ছে সর্বোত্তম যাতায়াত ব্যবস্থা। এটি শুধুমাত্র অর্থ সাশ্রয়ই করে না, অনেক সময়ও বাঁচিয়ে দেয়। এছাড়া, মোটরসাইকেলে জ্বালানি খরচও অপেক্ষকৃত কম। তাই কিছু সাধারণ কৌশল ও রক্ষণাবেক্ষণ করলে আরও জ্বালানি সাশ্রয় এবং যাতায়াত সহজ হবে।
জ্বালানি সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে কিছু কারণ বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন:
সার্ভিসিং
মোটরসাইকেল সর্বোত্তমভাবে চলার জন্য সার্ভিসিং গুরুত্বপূর্ণ। তাই, প্রতি মাসে নিয়মিত বাইকের সার্ভিসিং করানো উচিত এতে ইঞ্জিন ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাবে এবং জ্বালানিও বাঁচবে। প্রয়োজনে ইঞ্জিনের তেল পরিবর্তন করা, চেইন লুব্রিকেট করা এবং কুল্যান্টগুলো প্রতিস্থাপন করা উচিত।
ক্লাচের ওভাররাইডিং
ক্লাচ খুব বেশি ব্যবহার করলে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হবে। ওভাররাইড করলে ক্লাচের আয়ু কমে যায়। ক্লাচটি অত্যধিক ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে ইঞ্জিন ব্রেক করতে হবে। সেক্ষেত্রে ইঞ্জিন ব্রেক করার সময় টাইমিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাইকের ডাউনশিফ্ট ত্রুটিপূর্ণ হলে তা ক্লাচ প্লেট এবং প্রেশার প্লেটকে প্রভাবিত করবে।
গিয়ার
ইঞ্জিনের ক্ষতি এড়াতে মসৃণ এবং দ্রুত গিয়ার পরিবর্তন করুন। গিয়ারগুলোকে অতিরিক্ত রেভ না করা বা অন্য গিয়ারে পরিবর্তন করার আগে সর্বাধিক-আউট করা উচিত। অকাল স্থানান্তরসহ গিয়ারগুলোর মধ্যে কিছু জায়গা ছেড়ে দিন। একটি ১৫০সিসি বাইক তৃতীয় গিয়ারে থাকা অবস্থায় প্রতি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার বেগে যেতে পারে। এর বাইরে একে প্রসারিত করাকে অতি-রিভিং বলে বিবেচিত হবে।
কম ট্রাফিকের রাস্তায় যাতায়াত
ট্র্যাফিক জ্বালানি খরচের একটি প্রধান কারণ। এ সময় ইঞ্জিন এবং গিয়ারের ওপর চাপ পড়ে। এ ক্ষেত্রে, কম ট্রাফিক বা শর্টকাট রাস্তা খুঁজতে জিপিএস ব্যবহার করা যেতে পারে। জিপিএস শুধু সময়ই নয় জ্বালানির টাকাও বাঁচাতে কার্যকর।
অর্থ সঞ্চয় করার অর্থ এই নয় যে এতে রাইডিংয়ের আনন্দ কমে যাবে। অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী ও লাভজনক যাত্রায়ও অনেক আনন্দ রয়েছে। মনে রাখা উচিত, মিতব্যয়ী রাইডিং কিন্তু কাউকে ধীর গতির রাইডার করে তোলে না।



