প্রস্তাবিত জাতীয় সনদ নিয়ে জনমত যাচাই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। জরিপের তথ্যে উঠে এসেছে, ৮৭% মানুষ একই ব্যক্তির একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান হতে পারার বিপক্ষে রয়েছেন।
মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডি্আরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই জরিপের ফল উপস্থাপন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সুজনের পক্ষ থেকে কাঙ্ক্ষিত জাতীয় সনদ চূড়ান্তকরণের জন্য মে থেকে জুন মাসে ৪০টি প্রশ্ন সম্বলিত একটি জনমত যাচাই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। জরিপে ১,৩৭৩ জন অংশগ্রহণ করেন। যাদের মধ্যে পুরুষ ১,০৩৩ জন, নারী ৩৩৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ পাঁচ জন।
জনমত যাচাই জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ (নিম্নকক্ষ) ও সিনেট (উচ্চকক্ষ) নিয়ে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার পক্ষে মত দিয়েছেন জরিপে অংশ নেওয়া ৬৯% মানুষ। আনুপাতিক পদ্ধতিতে (পিআর) উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনের পক্ষে ৭১% মানুষ। এছাড়া একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার বিধানের পক্ষে ৮৯% উত্তরদাতা মত দিয়েছেন।
জরিপে আইনসভা সংস্কারের প্রস্তাবের বিষয়ে জরিপে পাওয়া ফলাফলে বলা হয়, নিম্নকক্ষে নারীদের জন্য ১০০টি সংরক্ষিত আসনে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন ৬৩% মানুষ। নিম্নকক্ষে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের পক্ষে ৮৬% মানুষ। এছাড়া, সিনেটে নারীদের জন্য ৩৩% আসনের পক্ষে ৬৯%, বিরোধী দল থেকে উচ্চকক্ষে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের পক্ষে ৮২% এবং একই ব্যক্তির একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান না হতে পারার বিধানের পক্ষে ৮৭% মানুষ মত দিয়েছেন।
শাসন পদ্ধতির পরিবর্তনের বিষয়ে জরিপে পাওয়া তথ্যে বলা হয়, মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের পক্ষে মত দিয়েছেন ৮৭% মানুষ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচকমণ্ডলীর (ইলেক্টরাল কলেজ) পক্ষে মত দিয়েছেন ৮৬%, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির পক্ষে ৮৮%, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধনের পক্ষে ৮৭% এবং রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি হিসেবে “সাম্য”, “মানবিক মর্যাদা”, “সামাজিক সুবিচার”, “গণতন্ত্র” এবং “ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সম্প্রীতি”-এর পক্ষে ৯০% মানুষ মত দিয়েছেন।
এতে আরও বলা হয়, মৌলিক অধিকারের পরিধি বৃদ্ধির পক্ষে ৮৮%, মৌলিক অধিকার শর্তহীন করার পক্ষে ৮৪% এবং সকল সাংবিধানিক পদ ও তিন বাহিনীর প্রধানদের নিয়োগের জন্য একটি সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের পক্ষে ৮০% মানুষ মত দিয়েছেন।
এছাড়া, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন ও প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকার কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতির পক্ষে ৯০% এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে ৮৩% মানুষ মত দিয়েছেন।
নির্বাচনী সংস্কারের অগ্রাধিকার ও রূপরেখার বিষয়ের ফলাফলে বলা হয়, নির্বাচনকালে নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের অনুমতি গ্রহণের বিধানের পক্ষে মত ৮৭% মানুষের। স্বাধীন সীমানা নির্ধারণ কর্তৃপক্ষ চান ৮৪% মানুষ। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচনের সুষ্ঠুতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রত্যয়ন করে গণবিজ্ঞপ্তি আকার প্রকাশের বিষয়ে ৮৬% মানুষ মত দিয়েছেন। নির্বাচনী ব্যয় নিরীক্ষণ চান ৮৮% অংগ্রহণকারী।
অন্যদিকে, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিগ্রস্ত ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দলের সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য করার বিষয়ে একমত ৯২% মানুষ। পূর্ববর্তী নির্বাচনের অনিয়মের তদন্ত চান ৭৯% মানুষ। প্রবাসী ভোটারদের নিবন্ধন চান ৮৭% মানুষ। না ভোটের বিধান পুনঃপ্রবর্তন চান ৮৩% অংশগ্রহণকারী। এছাড়া জাতীয় ডেটা নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ গঠনের পক্ষে ৮৮% মানুষ।
রাজনৈতিক দলের সংস্কারের বিষয়ে জরিপের ফলে বলা হয়, পাঁচ বছর পর পর দলের নিবন্ধন নবায়ন করার পক্ষে ৭৬% মানুষ। দলগুলোর আর্থিক লেনদেনে ব্যাংকিং চ্যানেল ও অডিট হিসাব প্রকাশের পক্ষে ৯১% অংশগ্রহণকারী। গোপন ভোটে নির্বাচিত দলীয় মনোনয়ন প্যানেল নির্বাচিত করে প্রার্থী মনোনয়নের পক্ষে ৮৩% মানুষ।
এছাড়া, সংবিধান সংশোধনের পক্ষে ৮৫%, দলের লেজুড়বৃত্তিক সংগঠন না থাকা ও বিদেশি শাখা না থাকার পক্ষে ৮০% এবং স্থায়ী স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের পক্ষে ৯০% মানুষ মত দিয়েছেন।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনতা ও বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে জরিপের তথ্যে বলা হয়, বিভাগীয় শহরগুলোতে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের পক্ষে ৮৮%, শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের পক্ষে ৮৪%, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রবর্তনের পক্ষে ৮৫%, উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপনের পক্ষে ৮১% এবং স্থানীয় সরকার কমিশন গঠনের পক্ষে ৯০% মানুষ মত দিয়েছেন।
সুজনের কেন্দ্রীয় সদস্য জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সদস্য ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস। জনমতের ফল উপস্থাপন সুজনের জাতীয় কমিটির সদস্য মো. একরাম হোসেন।