দীর্ঘ ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন। ইতোমধ্যে তফসিল ঘোষণা শেষে চূড়ান্ত ভোটার তালিকাও ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী আগামী ১১ সেপ্টেম্বর ভোট হবে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী মোট ভোটার ১১,৯১৯ জন।
ক্যাম্পাসের আবাসিক হল, বিভাগগুলো থেকে শুরু করে বটতলা, ক্যাফেটেরিয়া, চৌরঙ্গী পয়েন্টসহ সব আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু এখন জাকসু নির্বাচন। এতে নির্বাচনকে ঘিরে সরগরম হয়ে উঠেছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা আসন্ন জাকসু নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের সার্বিক অধিকার আদায়ে কাজ করবেন।
প্রথমদিনে মনোনয়নপত্র ফরম নিলেন ১৩৩ জন
সোমবার (১৯ আগস্ট) প্রথমদিন জাকসুর জন্য ৪৭ জন এবং হল সংসদের জন্য ৮৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. এ কে এম রাশিদুল আলম সোমবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
এছাড়াও, ছাত্রসংগঠনগুলোর অনুরোধের প্রেক্ষিতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময়সীমা বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
প্যানেল গঠনের প্রস্তুতি ছাত্রসংগঠনগুলো
জাকসুকে কেন্দ্র করে প্যানেল তৈরি করার কাজ শুরু করছে রাজনৈতিক, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। ক্যাম্পাসের বটতলা, টারজান পয়েন্ট, ক্যাফেটেরিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় দেখা মিলছে আলোচনায় মগ্ন ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দদের। প্যানলের পাশাপাশি মতাদর্শের ভিত্তিতে জোট গঠন করার বিষয়েও আলোচনা করছে কেউ কেউ।
তবে জাকসুকে ঘিরে শাখা ছাত্রদলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি দেখা গেছে। গত ৮ আগস্ট ১৭টি আবাসিক হল ও শাখা কমিটি বর্ধিত করার পর নবগঠিত কমিটিতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদ দেওয়ার অভিযোগে একাংশ বিক্ষোভ করেন। এরপর থেকে ওই অংশের নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পাসে নিয়মিত শোডাউন করছেন।
এছাড়াও আসন্ন নির্বাচনে ছাত্রদল থেকে দুটি প্যানেল হওয়ার গুঞ্জন রয়েছে। একটি প্যানেল শাখা ছাত্রদলের সুপার ফাইভের অনুসারীদের মধ্য থেকে অন্য প্যানেল বিদ্রোহী গ্রুপ থেকে হতে পারে বলে ছাত্রদলের একাধিক সূত্রে জানা গেছে। বিদ্রোহী গ্রুপের নেতাকর্মীরা ইতোমধ্যে ক্যাম্পাসে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক-সদস্য সচিবসহ সুপার ফাইভের নেতাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে।
জাকসু নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “জাকসুতে ছাত্রদলের আলাদা প্যানেল থাকবে। আমরা সেই লক্ষ নিয়েই গত ছয় মাস কাজ করছি। দলের সবার সঙ্গে আলোচনার করছি। তফসিল অনুযায়ী ২৫ তারিখে খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর জাকসু ও হল সংসদের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করব।”
প্যানেল ঘোষণা নিয়ে তিনি আরও বলেন, “প্যানেল ঘোষণার ক্ষেত্রে যারা শিক্ষার্থীদের কাছে বেশি জনপ্রিয় এবং যাদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি তাদের আমরা ছাত্রদলের প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করব।”
ছাত্রদলের বিদ্রোহী বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের বিষয়ে তিনি বলেন, “যারা ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নামে হট্টগোল করছেন, তাদের সবারই পদ আছে। দলীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই কমিটি দেওয়া হয়েছে।”
প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্তত দুটি প্যানেল হওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। একটি প্যানেলে থাকতে পারে ছাত্র ইউনিয়ন একাংশ (অদ্রি-অর্ক), জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট (ফাইজা), ছাত্র ফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী), বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীসহ কয়েকটি সমমনা সাংস্কৃতিক সংগঠন। অন্য প্যানেলে থাকছে ছাত্র ইউনিয়নের অপর অংশ (জাহিদ-তানজিম), জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট (মেঘ), জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার, গণ-অভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলনসহ কয়েকটি সংগঠন।
এদিকে, ৩৬ বছর পর ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে রাজনীতি করছে ছাত্র শিবির। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত জাকসু নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করেনি। সংগঠনটির দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “আমাদের একক প্যানেল রেডি আছে। তবে অনেকের সঙ্গেই এখনও আমাদের আলোচনা চলমান রয়েছে। সবার সঙ্গে আলোচনা শেষে আমরা আমাদের প্যানেল ঘোষণা করব।”
এবারের জাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ছাত্রসংগঠন হিসেবে নির্বাচন করছে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ। এককভাবে প্যানেল ঘোষণা করতে চায় সংগঠনটি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনটির জাবি শাখার আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, “আমরা চাচ্ছি এককভাবে প্যানেল ঘোষণা করতে। তবে আমরা আলোচনার সুযোগ রেখেছি। আমাদের সংগঠনের বাইরেও দীর্ঘদিন যারা শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ে কাজ করেছেন তাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলমান রয়েছে।”
জোট করার পরিকল্পনা আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখনই জোটে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই। তবে শেষ মুহূর্তে আলোচনার সুযোগ থাকবে।”
এছাড়াও জাকসুকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মতাদর্শের বেশকিছু প্রার্থীরা প্যানেলের বাইরে গিয়ে “স্বতন্ত্র” নির্বাচন করবেন বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব এ কে এম রাশিদুল আলম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা প্রতিনিয়তই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করছি। নির্বাচনের সামগ্রিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পালন করার জন্য সবার মতামত নিচ্ছি। আমরা শীঘ্রই নির্বাচনি আচরণবিধি প্রকাশ করবো।”
সংগঠন নয়, প্রার্থী দেখে ভোট
শিক্ষার্থীরা বলছেন, প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো দলীয় মতাদর্শ নয়, তাদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা কেমন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করবেন কি-না, এসব দেখে ভোট দেবেন তারা।
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আনিসুল ইসলাম বলেন, “সংগঠন দেখে ভোট দেওয়াটা বিবেচনায় নেই। আমরা দেখব প্রার্থী মানুষ হিসেবে কেমন, কে কাজ করেছে, কার বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। যোগ্য প্রার্থীদের ভোট দিবো।”
ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সালাউদ্দিন বলেন, “জাকসুতে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আমার বিবেচনায় থাকবে প্রার্থীর কাজ করার স্পৃহা, তার ইতোপূর্বের অভিজ্ঞতা এবং দলমত নির্বিশেষে সকল সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য তার ভাবনা, কী কী কাজ তিনি করতে চান।”
মোট ভোটার ১১,৯১৯ জন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের জন্য চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। রবিবার রাত ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে এ তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন।
এর আগে, গত ১০ আগস্ট রাতে খসড়া ভোটার তালিকা ও খসড়া আচরণবিধি প্রকাশ করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ও চূড়ান্ত আচরণবিধি প্রকাশ করেছে কমিশন।
চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী ২১টি আবাসিক হলে মোট ভোটার ১১,৯১৯ জন। এর মধ্যে ছাত্র ভোটার ৬,১০২, আর ছাত্রী ভোটার ৫,৮১৭।
ছাত্র হল
আলবেরুনী হলে ২১১, আ ফ ম কামালউদ্দিন হলে ৩৪১, শহিদ সালাম-বরকত হলে ২৯৯, মওলানা ভাসানী হলে ৫২১, ১০ নম্বর হলে ৫৪০, শহিদ রফিক-জব্বার হলে ৬৫৬, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে ৩৫৭, ২১ নম্বর হলে ৭৫২, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে ৯৯৪, শহিদ তাজউদ্দীন আহমেদ হলে ৯৫৪ ও মীর মশাররফ হোসেন হলে ৪৭৭ জন।
ছাত্রী হল
নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলে ২৮২, জাহানারা ইমাম হলে ৪০০, প্রীতিলতা হলে ৪০২, বেগম খালেদা জিয়া হলে ৪১৭, সুফিয়া কামাল হলে ৪৬০, ১৩ নম্বর হলে ৫৩২, ১৫ নম্বর হলে ৫৭৬, রোকেয়া হলে ৯৫৭, ফজিলাতুন্নেছা হলে ৮০৮ ও বীর প্রতীক তারামন বিবি হলে ৯৮৩ জন।
মানতে হবে ৭ দফা নির্দেশনা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে সাত দফা নির্দেশনা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে:
১. একজন প্রার্থী একাধিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না।
২. প্রতিটি মনোনয়নপত্রে একজন প্রস্তাবক ও একজন সমর্থকের স্বাক্ষর, শিক্ষাবর্ষ ও বিভাগ উল্লেখ করতে হবে।
৩. একই ব্যক্তি একাধিক প্রার্থীর প্রস্তাবক বা সমর্থক হতে পারবেন না (কার্যকরী সদস্য পদ ছাড়া)। কার্যকরী সদস্য পদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয়জনের (তিনজন নারী, তিনজন পুরুষ) প্রস্তাবক বা সমর্থক হওয়া যাবে।
৪. মনোনয়ন জমার সময় শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র বা ছবিযুক্ত লাইব্রেরি কার্ড অথবা ইনডেক্স কার্ড প্রদর্শন করতে হবে।
৫. প্রার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে সব পাওনা পরিশোধের প্রমাণ দিতে হবে।
৬. মনোনয়নপত্রের সঙ্গে পাসপোর্ট সাইজের সদ্য তোলা রঙিন ছবি জমা দিতে হবে (দুই মাসের বেশি পুরোনো ছবি গ্রহণযোগ্য নয়)।
৭. প্রতিটি হলে মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও জমাদানের জন্য পৃথক রেজিস্ট্রার খাতা সংরক্ষণ করতে হবে।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, “নির্বাচনকে ঘিরে আমাদের ক্যাম্পাসে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলোতে আমরা সতর্ক রয়েছি। নির্বাচনে প্রার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে প্রচার চালাতে পারে এবং ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে, সেই পরিবেশ বজায় রাখতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এজন্য সকল অংশীজনের সহযোগিতা কামনা করছি।”
প্রসঙ্গত, গত ১০ আগস্ট জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক রাশিদুল আলম তফসিল ঘোষণা করেন। তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ২১-২৪ আগস্ট। খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ২৫ আগস্ট। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ২৯ আগস্ট এবং ভোটগ্রহণ ১১ সেপ্টেম্বর।