দেশজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি খাতে। তেলের তীব্র সংকটে পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় স্থবিরতা নেমে এসেছে বন্দরে।
একদিকে ট্রাক সংকটে মালামাল খালাস ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সময়মতো পণ্য গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় পথে নষ্ট হচ্ছে পচনশীল কাঁচামাল। এই সুযোগে ট্রাকভাড়া এক লাফে ৩-৪ হাজার টাকা বেড়ে যাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বন্দরসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০টি ট্রাক পণ্য নিয়ে বন্দরে প্রবেশ করলেও বর্তমানে তা ২০০-এর নিচে নেমে এসেছে। তেলের অভাবে দূরপাল্লার ট্রাকগুলো গন্তব্য থেকে সময়মতো ফিরতে না পারায় পণ্য পরিবহনে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। ফলে বন্দরে আমদানি করা পণ্যের স্তূপ জমে থাকছে।
ট্রাকচালক হাসিবুর রহমান বলেন, “আমরা জ্বালানি তেল না পাওয়ায় চরম ভোগান্তির মধ্যে আছি। ঠিকমতো মালামাল পরিবহন করতে পারছি না। ফলে একদিকে যেমন আমাদের ইনকাম হচ্ছে না তেমনি সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “ভোমরা বন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জে পণ্য নিয়ে যাওয়ার পথে গত কয়েকদিনে আমাকে অন্তত ৫-৬টি পাম্প ঘুরতে হয়েছে। অধিকাংশ পাম্পে তেল নেই, আবার কোথাও থাকলেও চাহিদা মতো দিচ্ছে না। ২০-৫০ লিটার করে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় নষ্ট হচ্ছে। সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারায় ব্যবসায়ীদের কাছে কথা শুনতে হচ্ছে। আবার পথে বাড়তি খরচের কারণে আমাদের আয়েও টান পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে ট্রাক চালানোই মুশকিল হয়ে পড়বে।”
আরেক ট্রাকচালক রমিজ আলী বলেন, “আগে যেখানে দুইদিনে একটি ট্রিপ দেওয়া যেত, এখন সেখানে এক সপ্তাহেও একটি ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জ্বালানি সংগ্রহের জন্য চালকদের দীর্ঘ সময় পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এমনকি চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়ে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা। ফলে দুইদিনের ট্রিপ শেষ করতে এখন এক সপ্তাহেরও বেশি সময় লাগছে।”
তিনি জানান, গতকাল রাতে পাম্পে সিরিয়াল দিয়েছি, দুপুর হয়ে গেছে তবুও তেল পাইনি। কখন পাব, তারও নিশ্চয়তা নেই।
ভোমরা স্থলবন্দরের আমদানিকারক রিপন হোসেন বলেন, “সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পচনশীল পণ্যের ব্যবসায়ীরা। উত্তরবঙ্গের দিকে পাঠানো ট্রাকগুলো তেলের অভাবে মাঝপথে আটকে থাকছে। সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় আদা, ফল ও কাঁচামরিচ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে ক্রেতারা গুণগত মান নষ্ট হওয়ার অজুহাতে কেজিপ্রতি ৫-৬ টাকা দাম কমিয়ে দিচ্ছেন, যা ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।”
সাতক্ষীরা ভোমরা ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জয়নাল আবেদিন কিরণ বলেন, “তেল সংকটের কারণে ভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আগে ঢাকা পর্যন্ত এক ট্রাক মালের ভাড়া যেখানে ২৫-২৬ হাজার টাকা ছিল, বর্তমানে তা ৩০-৩৭ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।"
বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, বগুড়া ও টাঙ্গাইল রুটে সংকট তীব্র হওয়ায় এসব এলাকায় ট্রাক পাঠাতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রান্সপোর্ট মালিকরা।
ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুসা জানান, ঈদপরবর্তী দীর্ঘ ছুটির পর বন্দর সচল হলেও জ্বালানি সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বাজারে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা করছেন তিনি।
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সচল রাখতে দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকারের বিশেষ নজরদারি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।