জলাতঙ্ক রোগের টিকা সংকট, ইপিআই কার্যক্রমে বিপর্যয়

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইপিআই কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। 

এর ফলে প্রথমে হামের টিকার সংকট দেখা দেওয়ার পর এখন বিভিন্ন জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধকের (টিকা) সংকট দেখা দিয়েছে। 

বুধবার (৬ মে) সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় ইপিআই কার্যক্রমে ব্যবহৃত হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা এবং ওরাল পোলিও ভ্যাকসিনের (ওপিভি) চালান গ্রহণ শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন। 

একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে জলাতঙ্কের টিকা সরবরাহ করা হতো। তবে অপারেশনাল পরিকল্পনা স্থগিত হওয়ার পর প্রায় এক বছর ধরে সেই কার্যক্রম ব্যাহত রয়েছে। 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষরা বলছেন, চাহিদা মোতাবেক জলাতঙ্কের প্রতিষেধক সব সময়ই কম থাকে। গত কয়েক মাস ধরে সংকট চলছে। আবার যা বরাদ্দ পাওয়া যায়, এক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। 

ভুক্তভোগীরা জানান, কুকুর, বিড়ালের আঁচড়ে আহত হওয়ার পর চিকিৎসক ভ্যাকসিন নিতে বললেও কোথাও তা পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক খুঁজেও না পেয়ে কেউ কেউ ঢাকায় এসে খোঁজ করছেন। কিন্তু সেখানেও একই অবস্থা। 

বরিশাল, রাঙামাটি, কুড়িগ্রামে একই ধরনের পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কিছু টিকা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। 

রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত চার মাস ধরে জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধকের সংকট চলছে। সরকারি সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন শত শত রোগী। 

ভ্যাকসিন নিতে আসা শোভা রানী চাকমা বলেন, “বাসায় বিড়ালের নখের আঁচড় লেগেছে। হাসপাতালে এসে জানলাম টিকা নেই, বাইরে থেকে কিনে আনলে তারা পুষ করে দেবে।” 

বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে চার মাস ধরে জলাতঙ্কের টিকা নেই। এ কারণে বিভিন্ন পশুর কামড়ে আহত হওআ রোগীদের বাইরে থেকে বেশি দামে টিকা কিনতে  হচ্ছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী গণমাধ্যমকে  বলেন, “কেন্দ্রীয় অফিসে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে টিকা পাওয়া যাবে।” 

একইভাবে জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধকের সংকট চলছে কুড়িগ্রাম জেনা‌রেল হাসপাতা‌লে। 

হাসপাতা‌লের আবা‌সিক চি‌কিৎসক নিস্বর্গ মেরাজ চৌধুরী গণমাধ্যমকে ব‌লেন, “কয়েকদিন আগে কিছু টিকা পাওয়া গে‌ছে। ত‌বে অপ্রতুল। সরকা‌রিভা‌বে বরাদ্দ চে‌য়ে চা‌হিদা পাঠা‌নো হ‌য়ে‌ছে।” 

জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে এতদিনের অর্জন পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা 

স্বাস্থ্য খাতের কর্মসূচি স্থগিত হওয়ায় কেন্দ্রীয়ভাবে টিকা সংগ্রহ কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।  

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, “দেশের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচিতে অপারেশনাল প্ল্যানের অনেক সাফল্য রয়েছে। এটি বন্ধ করে দেওয়া ছিল হঠকারী সিদ্ধান্ত। জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলছিল। ফোর্থ সেক্টর প্রোগ্রামে মানুষ ও কুকুরের টিকাদানে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয় করা হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় দুই দফা কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। এতে জলাতঙ্কে মৃত্যুহার ৯০ শতাংশের বেশি কমে আসে। এখন এসব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগের বিনিয়োগ কার্যত বিফলে গেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্ক নির্মূলের লক্ষ্য এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।” 

১২টি টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ১৯৭৯ সাল থেকে ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ১২টি প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। 

তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফের যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, ইপিআই কর্মসূচি প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ করে এবং প্রায় ৫০ লাখ রোগের সংক্রমণ ঠেকায়।” 

পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্তে এ কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বর্তমান সরকার ইপিআইকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কারণ এটি শিশুদের জীবন রক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।