শিশু ধর্ষণ ও হত্যা: মানুষ কেন অন্যভাবে বিচার চাইছে

রাজনৈতিক নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক, ইসলামী ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে অনেক অনুসারী থাকা ফেসবুক ব্যবহারকারীরাও প্রচলিত বিচারব্যবস্থার বাইরে অন্য বিচার চাইছেন৷

অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল তার ভেরিফাইড ফেসবুকে “বেত্রাঘাত, ফাঁসি আর দ্রুতবিচার” শিরোনামে লিখেছেন, “.. (শিশুটির নাম উল্লেখ করেছেন) ধর্ষক ও হত্যাকারীর কী শাস্তি হওয়া উচিত? তার জন্য মানুষের দুনিয়ায় কোনো শাস্তিই যথেষ্ট নয়৷ তবে শাস্তি অন্তত এমন হওয়া উচিত, যাতে অপরাধীরা ভয় পায় এবং মানুষের মনে কিছুটা শান্তি আসে৷ শিশুধর্ষণ এতটাই এখন বেড়েছে যে দীর্ঘ বিচার শেষে নিভৃতে ফাঁসি দিলে সেই উদ্দেশ্য পূরণ হবে না৷ শিশুধর্ষণ ও হত্যাকারীর শাস্তি হওয়া উচিত প্রকাশ্যে একশত দোররা (বেত্রাঘাত); এরপর অপরাধী বেঁচে থাকলে ফাঁসি৷”

বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে কোনো অপরাধের শাস্তি হিসেবে বেত্রাঘাত বা চাবুক মারার বিধান নেই৷ বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো নাগরিককে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যায় না৷ তাহলে একজন আইনের অধ্যাপক ও সাবেক আইন উপদেষ্টা এই শাস্তি কীভাবে চাইলেন? বিষয়টি জানতে তার সঙ্গে একাধিকার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি৷

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমীন তার ভেরিফাইড ফেসবুকে লিখেছেন, ‘‘... (শিশুটির নাম উল্লেখ করেছেন) ধর্ষক ও হত্যাকারীর পক্ষে যদি কোনো আইনজীবী দাঁড়ায় তাহলে তার একই অপরাধে বিচার হওয়া উচিত৷ কোনো মানুষ এই নৃশংসতার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না৷ যে দাঁড়াবে, সে পশু৷''

পরবর্তীতে সমালোচনার মুখে সেই স্ট্যাটাস প্রত্যাহার করে ব্যাখ্যা দিয়ে আরেকটি পোস্ট দিয়েছেন মনিরা।


ফেসবুক ব্যবহারকারী ফাহাম আব্দুস সালামের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ ছয় হাজার৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘২০/২৫ বছর আগে পাকিস্তানের এক বিচারক এক চাঞ্চল্যকর রায় দিয়েছিলেন৷ যতদূর মনে পড়ে একটা সিরিয়াল কিলার একশ’র উপর শিশুকে রেইপ করে এসিডে চুবিয়ে ‘নাই' করে দিয়েছিল৷ এই খুনির মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এসিডে চুবিয়ে৷ তখন আমার মনে হয়েছিল যে এই বিচারক ঠিক করেছিলেন৷ এখন মনে হয় যে তিনি অত্যাধিক লিনিয়েন্ট ছিলেন৷ এতোই লিনিয়েন্ট যে এখানে শাস্তির এসেন্সটাই হারিয়ে গেছে৷ আমি তার জায়গায় থাকলে এনশিওর করতাম যে রেপিস্টকে মোট একশ বার এসিড বার্ন সারভাইভ করতে হবে৷ রাষ্ট্র ও ডাক্তারদের দায়িত্ব তাকে বাঁচিয়ে রাখা৷ এরপরে তার মৃত্যুদণ্ড হবে৷ তার অপরাধের এসেন্স হলো শিশুদের ‘হেল্পলেসনেস'৷ অপরাধীকেও কাছাকাছি পর্যায়ে হেল্পলেস ফীল করতে হবে৷ সে যদি জানে যে এসিডে চুবে আমি মরে যাবো, আপনি তো তার শাস্তি থেকে ‘হেল্পলেসনেস' নামক এলিমেন্টটাই নাই করে দিলেন৷ আপনি তাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছেন যে সে মারা যাবে।”

বাংলাদেশের আইনে এই ধরনের শাস্তির বিধান না থাকলেও কেন এগুলো উল্লেখ করেছেন, জানতে চাইলে ফাহাম আব্দুস সালাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, “বাংলাদেশে একটা ছেলে ৭ বছরের একটা মেয়েকে রেইপ করে মেরে ফেলেছে৷ একটা শিশু এক্সপেক্ট করে না যে সে রেইপড হবে, সে রেইপ হওয়া কী এটাই জানে না এবং সে নিজেকে কোনোভাবেই ডিফেন্ড করতে পারে না৷ একজন এডাল্টকে রেইপ করা এবং শিশুকে রেইপ করা একই অপরাধ হতে পারে না৷ শিশুদের যারা রেইপ করে, তাদের ডিহিউম্যানাইজ করা একান্তই প্রয়োজন ও তাদেরকে সমাজের সিম্পল বায়োলজিকাল এজেন্ট হিসাবে দেখা উচিত৷ এখন চুরি-ডাকাতি আর শিশুকে রেইপ করাকে আপনি এক করতে পারেন না৷ এর জন্য এমন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যেটা ইউনিক৷ আমি বলছি না যে তাকে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে৷ সিম্বলিক অর্থে হলেও মানুষকে সেটা বোঝাতে হবে৷ আর ভিকটিমের পরিবারকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে৷ এমন না যে, ভিকটিমের পরিবারের সামনেই ফাঁসি দিতে হবে৷ কিন্তু কোনো না কোনো ফরমেটে তাদের এই শাস্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, যেন সমাজে একটা বার্তা যায়, যে শাস্তি হয়েছে৷''

প্রান্ত নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘‘আপনিও জানেন, আমিও জানি, দেশের মানুষ জানে ধর্ষক কে? তারপরও ধর্ষককে পুলিশ প্রোটেকশন দিয়ে মাথায় হেলমেট পরিয়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট গায়ে পরিয়ে আদালতে নেওয়ার দরকারটা কী? এরপর কয়েকজন উকিল তার পক্ষে দাঁড়িয়ে নানাভাবে প্রমাণের চেষ্টা করবেন তিনি ধর্ষণ করেননি৷ এভাবে কি শাস্তি হয়?”

ইসলামি বক্তা শায়খ আব্দুল্লাহ তার ফেরিফাইড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘‘৭ বছরের মেয়েও যাদের কাছে নিরাপদ না, মানুষ নয়, তারা নরপিশাচ৷ এই নৃশংসতার মাত্রা কমিয়ে আনার একমাত্র সমাধান শরিয়া আইন।”

কমেন্টে গিয়ে তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘‘ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে৷ সেই সাথে যে সিস্টেম ধর্ষক তৈরি করেছে, সেই সিস্টেমকেও ভাঙার সময় এসেছে৷ ইসলামহীনতা, নৈতিকতার অবক্ষয়, বিকৃত রুচি, অবাধ যৌনতা, সাহিত্য ও বিনোদনের নামে যৌন-উস্কানি, পর্ন ইন্ডাস্ট্রি, সকল ক্ষেত্রে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন এই ধরনের পাশবিক কাজের দুয়ার খুলে দিচ্ছে৷ মানসিক বিকৃতির পথ খুলে রেখে ধর্ষণ বন্ধের জন্য শুধু আইনের শাসনই যথেষ্ট নয়৷ উন্নত বিশ্বের আইন অত্যন্ত কঠিন, তারপরও নারীরা সেখানে নিরাপদ নয়৷ এর কারণ, সেখানেও মানসিক বিকৃতির দুয়ারসমূহ উন্মুক্ত৷ তাই এই পাশবিক কর্মকাণ্ড বন্ধের জন্য অবাধ যৌনতার দরজা বন্ধ করতে হবে৷ এর পাশপাশি কঠোর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে৷ অনেকে বলেন, অবাধ যৌনতা যদি ধর্ষণের অন্যতম প্রধান কারণ হয়, তাহলে বৃদ্ধা, শিশু কিংবা পর্দানশীন নারী কেন ধর্ষিত হয়? মূলত পর্নোগ্রাফি, অশালীন দৃশ্য ইত্যাদি দেখে বিকৃত রুচির পুরুষ উন্মাদ হয়ে ওঠে৷ এরপর সামনে যাকে পায় তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।”

শরিয়া আইনই কি সমাধান? মধ্যপ্রচ্যের যেসব দেশে শরিয়া আইন চালু আছে, সেখানে কেন ধর্ষণ হচ্ছে? বাংলাদেশের নারীরা ওই সব দেশে কাজে গিয়ে কেন যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন? এবিষয়ে জানতে শায়খ আব্দুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগর চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি৷

এমন দাবি কেন উঠছে?

বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট এলিনা খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, “প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের ক্ষোভ থেকেই এই ধরনের দাবি উঠছে৷ আসলে আমরা যদি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে পারতাম তাহলে কিন্তু কেউ এই দাবি তুলত না৷ অর্থাৎ দৃশ্যমান বিচারের শাস্তি কার্যকর না হওয়ায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে৷ কিন্তু যত ক্ষোভই থাকুক না কেন, প্রচলিত আইনের বাইরে গিয়ে বিচারের সুযোগ নেই৷ ফলে আমাদের বিচার ব্যবস্থার উপর মানুষের যে ক্ষোভ তৈরী হয়েছে তা দূর করতে হবে।”

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, “মানুষ আসলে এই দাবি করছে, বিচার না পাওয়ার জায়গা থেকে৷ এখন মানুষের এই দাবিকে আপনি ফেলে দিতে পারেন না৷ সরকারকে মানুষের মনের অবস্থা বুঝতে হবে৷ সেই জায়গা থেকে যদি দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায় তাহলে দেখবেন ভবিষ্যতে এই ধরনের দাবি কমে আসবে৷ যারা এগুলো লিখছেন, তারাও যে যথাযথ আইনের ভিত্তিতে বিচার চান না, তা কিন্তু নয়৷ তারা আইনের মাধ্যমে বিচার চান৷ সেটা হচ্ছে না বলেই মানুষ বিকল্পপথে দ্রুত বিচারের কথা বলছেন।”