বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ জনপদ প্রত্ননগরী মুন্সীগঞ্জ। পদ্মা মেঘনা, ধলেশ্বরী ও ইছমতি নদীর দ্বীপ দেশ মুন্সীগঞ্জ। এ জেলায় রয়েছে হাজারো বছরের গৌরবোজ্জল ইতিহাস। এখানকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রত্নতত্ত্ব নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য সমন্বয়ে মুন্সীগঞ্জে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা রয়েছে।
সঠিক পরিকল্পনা আর প্রয়োজনীয় উদ্যোগে মুন্সীগঞ্জকে পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। প্রাকৃতিক লীলাভূমি মুন্সীগঞ্জে একদিকে যেমন রয়েছে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ব্যক্তিত্ব এবং ধর্মের পুরাকীর্তি। তেমনি এ অঞ্চলের মাটি জড়িয়ে আছে পাল, সেন ও মোগল আমলের স্থাপত্য শৈলীর সঙ্গে।
প্রত্ননগরী মুন্সীগঞ্জে যেমন রয়েছে প্রাচীন যুগের সমৃদ্ধ শাসন ও বাণিজ্যের চিহ্ন, তেমনি রয়েছে কীর্তিমানদের কীর্তি ও স্মৃতি চিহ্ন। ওইসব কীর্তিমানরা হলেন, বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর, বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জন দাস, সরোজিনী নাইডু, কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দোপাধ্যায়, শীর্ষন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, বুদ্ধদেব বসু, ভানু বন্দোপাধ্যায়, চলচিত্র নির্মাতা আব্দুল জব্বার খান, পদার্থ ও অংক শাস্ত্রবিদ মেঘনাথ সাহা, শিক্ষাবিদ আশুতোষ গাঙ্গুলী, ড. হুমায়ুন আজাদ, সঙ্গীতজ্ঞ আলাউদ্দিন আলী এবং চ্যানেল বিজয়ী ব্রজেন দাসের মতো কীর্তিমানের স্মৃতি বিজড়িত চিহ্ন বহন করছে জেলার ৬টি উপজেলা।
ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে অনন্য কীর্তিচিহ্নগুলো এখনো জেলার বিভিন্ন স্থানে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মোগল স্থাপত্যের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন বাংলার সুবেদার ও সেনাপতি মীর জুমলার সময়কালে মুন্সীগঞ্জ শহরে নির্মিত ইদ্রাকপুর কেল্লা, সদর উপজেলার রামপালে রাজা বল্লাল সেনের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ, সদর উপজেলার বজ্রযোগিনীতে বৌদ্ধ পণ্ডিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করের স্মৃতিবিজড়িত ভিটা, টংগিবাড়ীতে সোনারংয়ের জোড়া মঠ, রামপালে রাজা বল্লাল সেনের দিঘী, রাজা হরিশ চন্দ্রের দিঘী, রামপালে রঘুরামপুরে বৌদ্ধ বিহার, টংগিবাড়ীতে নাটেশ্বর বৌদ্ধ মন্দির, শ্রীনগরে ভারতীয় উপমহাদেশের সুউচ্চ শ্যামসিদ্দির মঠসহ সিরাজদিখানে শেখরনগরে ৫০০ বছরের পুরানো কালি মন্দির।
এছাড়াও সুলতানি আমলের টেংগর শাহী মসজিদ, মুন্সীগঞ্জ সদরের মিরকাদিমে সুলতানি আমলের বাণিজ্যিক নগরী নগরকসবা, সদর উপজেলার পানাম বলোকায় গাইবি ব্রিজ নামে পরিচিত পুলঘাটা ইটের পুল এবং টংগিবাড়ীতে মোগল আমলে নির্মিত আব্দুল্লাহপুরের সমাজ মসজিদ কীর্তির স্বাক্ষ্যর আর গৌরবচিহ্ন নিয়ে পুরাকীর্তি হিসেবে দাড়িয়ে আছে। শ্রীনগর-সিরাজদিখান উপজেলায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬০০ একর জায়গা নিয়ে বিস্তৃত আড়িয়ল বিলের মনোরম পরিবেশ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বর্ষা মৌসুমে শত শত ভ্রমনপিপাসু প্রেমিক আড়িয়ার বিলের সৌন্দর্য দেখতে ছুটে আসেন।
মাওয়ায় শিমুলিয়া ঘাট এলাকার হোটেল ব্যবসায়ীরা জানান, এ এলাকায় বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুললে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে এসে সারাদিন মুন্সীগঞ্জের প্রায় ৫০টি প্রত্নতাত্বিক ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে আড়িয়র বিল ও মাওয়ার পদ্মা সেতু এলাকার অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
তারা আরও বলেন, মুন্সীগঞ্জের প্রত্নতত্ব নিদর্শন এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শনে এসে ভোজন পিপাসুগণ রামপালের সাগর কলা, সিরাজদিখানের ঐতিহাসিক পাতক্ষিরা আর মুন্সীগঞ্জের রসগোল্লা ও আমিত্তির স্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন।
মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সৈয়দা নুরমহল আশরাফী জানান, মুন্সীগঞ্জকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প তৈরি করে পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে।প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে মুন্সীগঞ্জের ইতিহাস ঐতিহ্য দেশ বিদেশে পর্যটকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে। মুন্সীগঞ্জ একটি পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে।