শিগগিরই আসছে নবম পে-স্কেলের গেজেট, বাজেট চূড়ান্ত

নবম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর করতে জুন মাসের মধ্যেই গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

নতুন জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ আংশিকভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ১ জুলাই থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই নতুন পে-স্কেলের আওতাভুক্ত সুপারিশকৃত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট পেশ করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তব্যেই অর্থমন্ত্রী সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো এবং দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কেন এটি আংশিকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তার বিশদ ব্যাখ্যা দেবেন।

অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও রাজস্ব আদায়ের মন্থর গতির কারণে নতুন পে-স্কেলটি একবারে নয়, বরং তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ২৩ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নেতৃত্বে গঠিত ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি এই তিন ধাপের ফর্মুলা সুপারিশ করে। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর এক বিশেষ বৈঠকে এই সুপারিশে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

বাস্তবায়নের রূপরেখা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে সুপারিশকৃত নতুন মূল বেতনের ৫০ শতাংশ দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭-২০২৮ অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ মূল বেতন সমন্বয় করে পুরো বেসিক কার্যকর করা হবে। আর শেষ ধাপে ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নতুন কাঠামোর আওতায় এনে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে।

এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এর আগে জানিয়েছিলেন যে সরকারের বাজেটের সীমাবদ্ধতা আছে। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দেশের অর্থনীতি ও রাজস্ব সংগ্রহের অবস্থা আশানুরূপ নয়। রাজস্ব সংগ্রহের অবস্থা খারাপ থাকায় অনেক কিছু কাটছাঁট করতে হচ্ছে। কিন্তু তার মধ্যেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় নতুন বেতন কাঠামোর দিকটা দেখতে হচ্ছে।

নবম জাতীয় বেতন কমিশন পূর্বের মতো ২০টি গ্রেড বহাল রেখেই বিভিন্ন ধাপে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে।

কমিশন বর্তমানের সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের বেতন কাঠামো ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেছে। আর সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের বেতন নির্ধারিত ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে।

এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব এবং সিনিয়র সচিবদের জন্য ২০টি ধাপের বাইরে বিশেষ আরও একটি ধাপ তৈরি করবে অর্থ বিভাগ, যা পরবর্তীতে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে।

নতুন বেতন কাঠামোতে শুধু কর্মরতরাই নন, দেশের অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীদের জন্যও বড় ধরনের আর্থিক সুরক্ষার সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের পেনশনের হারও শতভাগের বেশি বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে।

যাঁরা মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাঁদের পেনশন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা প্রাপ্তদের ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশির ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ পেনশন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।

পাশাপাশি বয়সভিত্তিক নতুন চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রে ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনভোগীরা পাবেন ১০,০০০ টাকা। এছাড়া ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীরা ৮,০০০ টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীরা ৫,০০০ টাকা করে চিকিৎসা ভাতা পাবেন।

আবাসন সুবিধার ক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের স্বার্থ রক্ষায় ১১তম থেকে ২০তম ধাপের কর্মচারীদের বাড়িভাড়ার হার তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে, অন্যদিকে ১ম থেকে ১০ম ধাপের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার কিছুটা কম রাখা হয়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় বরাদ্দ রয়েছে ৮৪,১১৪ কোটি টাকা। নতুন পে-স্কেল একবারে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের অতিরিক্ত ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতো, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অসম্ভব।

সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারের বর্তমান রাজস্ব আদায়ের যে পরিস্থিতি, তাতে এক অর্থবছরে এই সুপারিশ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা বাস্তবসম্মত নয়। সরকার যেভাবে ধাপে ধাপে করার পরিকল্পনা করছে, সেটাই যৌক্তিক।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারও এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করে জানান, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি যে দরকার, এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। সরকারের আয়ের বর্তমান অবস্থায় ধাপে ধাপে এগোনোই সঠিক পথ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যেই যেন সরকার এর পূর্ণ সুফল নিশ্চিত করতে পারে।