বিশ্ববাজারে রপ্তানির আশা রাঙ্গামাটির পাহাড়ি আম 

রাঙ্গামাটি জেলার দুই তরুণ উদ্যোক্তার হাত ধরে প্রায় ৩০ একর পরিত্যক্ত পাহাড়ি জমি পরিণত হয়েছে আধুনিক আমের বাগানে। দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ৩৫ জাতের প্রিমিয়াম আমের চাষ করে তারা এখন বিশ্ববাজারে প্রবেশের স্বপ্ন দেখছেন। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন সরকারি সহায়তা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং রপ্তানিমুখী অবকাঠামো। 

রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বালুখালী ইউনিয়নের দুর্গম মরিচ্ছাবিল এলাকায় ৪ বছর আগে এই বাগান গড়ে তোলেন দুই তরুণ উদ্যোক্তা চিকু চাকমা ও পলাশ চাকমা। শুরুতে অনাবাদি ও পরিত্যক্ত পাহাড়ি জমিকে কাজে লাগানোর লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এটি পার্বত্য অঞ্চলের কৃষি সম্ভাবনার একটি অনুকরণীয় মডেলে পরিণত হয়েছে। 

বাগানটির অন্যতম আকর্ষণ বিশ্ববিখ্যাত জাপানি মিয়াজাকি (সান এগ) আম। এছাড়াও রয়েছে ব্ল্যাক স্টোন, কিউজাই, রেড আইভরি, চাকাপাতের রাজা, সিমুয়াং, বারি-১৩ অস্টিন, পূজাচুরিয়া, পূজা অরুণিমা, আম্বিলা, পালতু, ট্রাইউইপ, টেস্ট, পালকি, পালোয়ান, কেনসিংটন প্রাইড, ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড, ন্যাম ডক মাই, ব্রুনাই কিং, বারি-৪, কাঁচা-মিঠা বারোমাসি সহ দেশি-বিদেশি নানা জাতের রঙিন ও প্রিমিয়াম মানের আম। 

উদ্যোক্তারা জানান, বাগানে আধুনিক ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে কীটনাশকের ব্যবহার কমে আসে, ফল পোকামাকড় ও প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে সুরক্ষিত থাকে এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নিরাপদ আম উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এই প্রযুক্তির কারণে আমের রং, আকার ও গুণগত মানও অনেক উন্নত হচ্ছে, যা রপ্তানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 
 
উদ্যোক্তা চিকু চাকমা বলেন, “পাহাড়ের অনাবাদি জমিকে কাজে লাগিয়ে উন্নতমানের আম উৎপাদন সম্ভব, সেটিই আমরা প্রমাণ করতে চেয়েছি। এখন আমাদের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রাঙামাটির আমের পরিচিতি তৈরি করা। সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও রপ্তানির সুযোগ পেলে আমরা আরো বড় পরিসরে উৎপাদন বাড়াতে পারব।” 

রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেবাশীষ দেওয়ান বলেন, “চিকু ও পলাশের এই উদ্যোগ শুধু একটি সফল আমের বাগান নয়, এটি পার্বত্য অঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও মাঠ পর্যায়ের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।” 

আধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক পরিচর্যা এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পাহাড়ি জমিতেও আন্তর্জাতিক মানের ফল উৎপাদন করা সম্ভব, এই বাগান তার বাস্তব উদাহরণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

বর্তমানে বাগানজুড়ে লাল, বেগুনি, সোনালি ও সবুজ রঙের বিভিন্ন জাতের আমের সমারোহ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করছে। প্রতিদিনই কৃষক, উদ্যোক্তা ও কৃষি-সংশ্লিষ্ট অনেকেই বাগানটি পরিদর্শনে আসছেন এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছেন। 

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি সহায়তা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও রপ্তানিমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে রাঙ্গামাটির বিস্তীর্ণ অনাবাদি পাহাড়ি জমিকে ফল উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে।