মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সন্তান রুমীকে হারানোর শোককে জাতীয় সংগ্রামে রূপ দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে নেতৃত্ব দেওয়া শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আজ (২৬ জুন) মৃত্যুবার্ষিকী।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলন এবং দেশপ্রেমের ইতিহাসে জাহানারা ইমাম একটি অবিস্মরণীয় নাম। শহীদ সন্তান রুমীকে হারানোর পর তিনি শুধু একজন শোকাহত মা নন, বরং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আপসহীন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে ‘শহীদ জননী’ হিসেবে জাতির শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত হন।
১৯২৯ সালের ৩ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুরে জন্মগ্রহণ করেন জাহানারা ইমাম। তার বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং মা সৈয়দা হামিদা বেগম। ১৯৪৫ সালে কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে স্নাতক এবং ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে পরে সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা, ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার বড় ছেলে রুমী পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শহীদ হন। একই সময়ে অসুস্থ স্বামী শরিফ ইমামও মারা যান। স্বাধীনতার পর রুমীর সহযোদ্ধারা তাঁকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে সম্মান জানান, এরপর থেকেই তিনি ‘শহীদ জননী’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে লেখা তার দিনলিপি পরবর্তীতে ‘একাত্তরের দিনগুলি’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, যা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের অন্যতম প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এছাড়া ‘অন্য জীবন’, ‘বীরশ্রেষ্ঠ’, ‘বুকের ভিতরে আগুন’, ‘ক্যানসারের সঙ্গে বসবাস’ ও ‘প্রবাসের দিনলিপি’সহ একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন তিনি।
স্বাধীনতার পর দেশে যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনের প্রতিবাদে ১৯৯২ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’র আহ্বায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন জাহানারা ইমাম। তার নেতৃত্বে গঠিত গণআদালত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে জাতীয় আন্দোলনে রূপ দেয়।
জীবনের শেষদিকে ক্যানসারে আক্রান্ত হন জাহানারা ইমাম। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরে তার মরদেহ দেশে এনে ঢাকায় দাফন করা হয়।