মাছির উপদ্রবে অতিষ্ঠ ঈশ্বরীপুর গ্রামের বাসিন্দারা

মাছির অত্যাচারে শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন মেয়ে-জামাইরা। খাবারের প্লেট থেকে শুরু করে ঘরের প্রতিটি জায়গায় মাছির উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ঈশ্বরীপুর গ্রামের বাসিন্দারা। একটি লেয়ার মুরগির খামার থেকে ছড়িয়ে পড়া দুর্গন্ধ ও মাছির কারণে গ্রামজুড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

চায়ের কাপ মুখে তোলার আগেই তাতে মাছি পড়ছে। মাছির উপদ্রবে কারও পাতে ভাত-তরকারি তুলে দেওয়া যাচ্ছে না। রুটি বেলতে গেলে সঙ্গে মাছি পিষে যাচ্ছে। এ মাছির উৎপত্তিস্থল গ্রামের ওই মুরগির খাবার। ঈশ্বরীপুর গ্রামের ওই খামারে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে কয়েক সপ্তাহের মুরগির বিষ্ঠা জমে আছে। ভনভন করছে অসংখ্য মাছি। খামারের আশপাশেও উৎকট দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।

খামারটির মালিক মোহাম্মদ স্বপন নামের এক ব্যক্তি। গ্রামবাসী প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ করেছেন। প্রশাসনের তদন্তেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এরপরও এখনও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় গ্রামবাসী আদালতে যাওয়ার কথা ভাবছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈশ্বরীপুর গ্রামে প্রায় ১২০টি পরিবারের ৬৪২ জন মানুষের বসবাস। গ্রামে মুরগির খামার করেছেন মোহাম্মদ স্বপন। গত তিন মাসে সেই খামার থেকে ছড়িয়ে পড়া দুর্গন্ধ ও মাছির উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। খামারের ভেতর দিনের পর দিন বিষ্ঠা জমিয়ে রাখা ও দুর্গন্ধনাশক পদার্থ ব্যবহার না করায় আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ গ্রামবাসীর। এতে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। মাছির উপদ্রবে গ্রামে কারও আত্মীয়স্বজনও আসছেন না। 

স্থানীয় বাসিন্দা রোহেনা বেগম বলেন, “শুধু গন্ধডা লাগছিল, আমরা মাইনা লিছি। কিন্তু এখন তুমরা কুন মুরগি পুইষছো যে আমরা আর থাইকতেই পাইরছি না। আমি আমার জামাইকে খাইতে দিয়েছি, পাতে তিন–চারডা মাছি বইসে গেছে। আমরা এখন কী করব? এখন ভাত তুইলে দেব, না তরকারি তুইলে দিব, না মাছি খ্যাদাব। আমরা ম্যালা অভিযোগ কইরেছি, কুনো জায়গা থেকে কুনো কিছু হইলো না।”

তিনি বলেন, “আপনারা আইসেছেন, যদি না পারেন, আমরা কোর্টে যাব। কোর্টে যাইয়া যা করার করব। আর না হলে গ্রাম ছাইড়ে চইলে যাব।”

কয়েক দিন আগে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন গৃহিণী লিপি খাতুন। তিনি বলেন, “বাচ্চার মুখে ও শরীরে মাছি বসে। সব সময় মশারি টাঙিয়ে রাখতে হচ্ছে। ঘরে তরকারি বা অন্য কোনো খাবার রাখলেই মাছি ঘিরে ধরে। বাচ্চাদের খাবার দিতে হয় ঢেকে ঢেকে। ফ্রিজের মধ্যেও মাছি ঢুকে যায়।”

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “মাছির অত্যাচারে কয়েক মাস ধরে আত্মীয়স্বজন বাড়িতে আসতে চান না। কাউকে খেতে দিলে পাতে মাছি বসে। ঘেন্না ও অস্বস্তির কারণে তিনিও এখন আসেন না।”

তার দাবি, গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক রান্নাবান্না ও খাওয়াদাওয়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কখনও কখনও খাবারের সঙ্গে মাছি মুখে চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

নাম প্রকাশ না করে গ্রামের এক নারী জানান, খামারের মালিক নিজের দোষ স্বীকার করেন না। উল্টো মানুষকে নানাভাবে অত্যাচার করেন। খারাপ ভাষায় কথা বলেন, যাতে গণ্ডগোলের সৃষ্টি হয়। এককথায় তারা মাছির উপদ্রব থেকে বাঁচতে চান। এ খামার রাখা যাবে না। খামার উচ্ছেদ করতে হবে।

অভিযোগের বিষয়ে খামারের মালিক মোহাম্মদ স্বপন জানান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ইতিমধ্যে তিনি একটি খামারের মুরগি বিক্রি করে দিয়েছেন। সেটা বাঁশ দিয়ে ঘেরা ছিল। জায়গাটি স্যাঁতসেঁতে হওয়ায় মাছির উপদ্রব হয়েছিল। আর দুই হাজার মুরগির খাঁচাটি মশারি দিয়ে ঘিরে দিয়েছেন। বাকি কিছু মুরগি আছে, হয়তো কালই বিক্রি করে দেবেন।

গ্রামে মাছির উপদ্রব থেকে পরিত্রাণের উপায় জানতে চাইলে স্বপন বলেন, “একটা মাছির জীবন ১৪ দিন। এমনিই মাছি মারা যাবে।”

তিনি জানান, এ ব্যবসা করে তিনিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ব্যাংকে তার ২৭ লাখ টাকা ঋণ আছে। এ ঋণের ব্যবস্থা করে তিনি ব্যবসা গুটিয়ে নেবেন।

গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, খামারে সৃষ্ট মুরগির বর্জ্যের দুর্গন্ধ গ্রামে ছড়িয়ে পরিবেশকে দূষিত করছে। এতে জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গবাদিপশুকে ঠিকমতো খাবার খাওয়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। খামারে দুর্গন্ধনাশক পদার্থ ব্যবহার না করায় আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মুরগির বাচ্চা ও ডিম উৎপাদনের সময় সৃষ্ট বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হলেও পরিবেশ রক্ষায় সরকার অনুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

খামারটির কার্যক্রম স্থানীয় জনজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে কিনা, তা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদনটি পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ের উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন  বলেন, “গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। ইতিমধ্যে খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত অনুমোদনের বিষয়গুলো যাচাই করা হয়েছে। সেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই খামার মালিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”