বেসরকারি চিকিৎসকদের জন্য আসছে নির্দিষ্ট বেতনকাঠামো

বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও মেডিকেল কলেজে কর্মরত নবীন চিকিৎসকদের বেতনবৈষম্য কমাতে নতুন বেতনকাঠামোর সুপারিশ করেছে সরকার গঠিত একটি কমিটি। এতে এন্ট্রি লেভেলের পূর্ণকালীন চিকিৎসকদের সরকারি চাকরির সমমানের চিকিৎসকদের মূল বেতনের অন্তত ৯০% বেতন দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে যেসব চিকিৎসক নিয়োগপত্র ছাড়া পূর্ণকালীন কাজ করেন, তাদের জন্য মাসিক সর্বসাকল্যে (একীভূত) বেতন নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে কমিটি। এর মধ্যে মেট্রোপলিটন এলাকায় ৩৫,০০০ টাকা, অন্যান্য জেলা শহরে ৩৩,০০০ টাকা এবং উপজেলা পর্যায়ে ৩০,০০০ টাকা বেতনের সুপারিশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে যেসব চিকিৎসক ঘণ্টায় বা শিফট (রোস্টার) ভিত্তিতে খণ্ডকালীন কাজ করেন, তাদের জন্য প্রতি ডিউটিকে আট ঘণ্টা ধরার সুপারিশ করেছে  কমিটি। এক্ষেত্রে প্রতিটি দিবা শিফটের জন্য ১,২৫০ টাকা এবং রাতের শিফটের জন্য ১,৫০০ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মূল বেতনের পাশাপাশি তিন শ্রেণির চিকিৎসকদের জন্যই আলাদা বাড়িভাড়া, বোনাস ও অন্যান্য ভাতার সুপারিশ করেছে কমিটি।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিজিএমই) মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত সাত সদস্যের এই কমিটি গত সোমবার স্বাস্থ্যসচিবের কাছে তাদের সুপারিশ জমা দিয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নবীন চিকিৎসকদের জন্য একটি যৌক্তিক, সমন্বিত ও সম্মানজনক বেতনকাঠামো তৈরি করতে গত মাসে এই কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এর আগে সুনির্দিষ্ট বেতনকাঠামোসহ বেশ কিছু দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন ইনটার্ন ও স্নাতকোত্তর শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। ওই সময় স্বাস্থ্য খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকের পর এই কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।

কমিটির সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, নিয়োগের সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই নবীন চিকিৎসকদের নিয়োগপত্র দিতে হবে। তাদের সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা ৪৮ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না এবং সব সরকারি ছুটির দিনে ছুটি দিতে হবে। সরকারি ছুটির দিনে কাজ করতে হলে পরে এর বদলে পরে ছুটি দিতে হবে।

যেসব নিয়মিত নারী চিকিৎসক কোনো প্রতিষ্ঠানে এক বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন, তাদের জন্য ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির সুপারিশ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, সরকার যদি নতুন কোনো পে স্কেল বা বেতনকাঠামো চালু করে, তবে তার সঙ্গে মিল রেখে এই চিকিৎসকদের বেতন ও অন্যান্য সুবিধাও আনুপাতিক হারে সমন্বয় করতে হবে।

নিয়মিত বা পূর্ণকালীন মেডিকেল অফিসার এবং বেসরকারি মেডিকেল ফেসিলিটির প্রভাষকদের জন্য কমিটি এন্ট্রি লেভেলের একজন সরকারি কর্মকর্তার ন্যূনতম মূল বেতনের অন্তত ৯০% মূল বেতন নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।

এছাড়া বাড়িভাড়া ভাতা হিসেবে ঢাকায় মূল বেতনের ৫৫% এবং চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, বগুড়া, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও সাভারের জন্য ৫০% নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের অন্যান্য স্থানের জন্য এই হার হবে ৪৫%।

এর পাশাপাশি প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, মূল বেতনের সমপরিমাণ দুটি বার্ষিক উৎসব বোনাস এবং মূল বেতনের ২০% নববর্ষ ভাতার সুপারিশ করা হয়েছে। চাকরি এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর মূল বেতনের ওপর ৫% ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাবও রয়েছে, যা পরবর্তী প্রতি অর্থবছরে কার্যকর হবে।

যারা নিয়মিত নিয়োগপত্র ছাড়া পূর্ণকালীন কাজ করেন, তাদের জন্য মোট মাসিক বেতনের দুই-তৃতীয়াংশের সমান দুটি উৎসব বোনাস এবং মূল বেতনের ২০% বাংলা নববর্ষ ভাতার প্রস্তাব করেছে কমিটি।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অধ্যাপক নাজমুল হোসেন বলেন, “কমিটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ জমা দিয়েছে। এটি বাস্তবায়নের ব্যাপারে এখন সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। সরকার যদি সুপারিশ অনুমোদন করে, তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তা মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হবে। সরকার চাইলে এই প্রস্তাবে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনও আনতে পারে।”

অধ্যাপক নাজমুল আরও জানান, জুনিয়র ও সিনিয়র চিকিৎসক, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের প্রতিনিধি এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের মতো অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সুপারিশগুলো তৈরি করা হয়েছে। সব বিষয়ে সবাই একমত না হলেও বেশির ভাগ বিষয়েই সবার সম্মতি ছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিটির এক সদস্য বলেন, “বর্তমানে অনেক বেসরকারি ক্লিনিক চিকিৎসকদের আট ঘণ্টার শিফটের জন্য মাত্র ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা দেয়। আর পূর্ণকালীন চিকিৎসকেরা খুব কম ক্ষেত্রেই মাসে ৩০,০০০ টাকার বেশি পান।

তিনি জানান, এ কারণেই আমরা মাসিক সাকুল্যে ৩৫,০০০ টাকা এবং আট ঘণ্টার দিবা শিফটের জন্য ১,২৫০ টাকা বেতন প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাবকে যৌক্তিক বলে মনে করছে কমিটি।

এদিকে একজন ইনটার্ন চিকিৎসক জানান, প্রস্তাবিত বেতনকাঠামো চূড়ান্ত করার জন্য যে বৈঠক হয়েছে, সেখানে তাদের ডাকা হয়নি। ফলে তারা এই সুপারিশগুলোর বিষয়ে কিছুই জানেন না।