গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের বহু কারখানায় উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০% পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানিয়েছেন শিল্পমালিকরা। তাদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সাভারের রেডিও কলোনি, হেমায়েতপুর এবং আশুলিয়ার জিরাবো এলাকার বিভিন্ন শিল্পকারখানা ঘুরে উৎপাদন কার্যক্রমে এর প্রভাব দেখা গেছে। কয়েকটি কারখানায় গ্যাসের চাপ বাড়া কিংবা বিদ্যুৎ ফেরার অপেক্ষায় উৎপাদন ইউনিট বন্ধ ছিল।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের প্রায় ১,২০০ কারখানা এ সংকটে রয়েছে। পোশাক, বস্ত্র, স্পিনিং, ডাইং, ইস্পাত, সিরামিক ও কাগজ শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য যেখানে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে মিলছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। এতে বয়লার, জেনারেটরসহ উৎপাদন যন্ত্রপাতি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
ব্লু জিনস ওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জসিম উদ্দিন বলেন, “বারবার উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় ডেনিম প্রক্রিয়াজাতকরণে পুরো ব্যাচ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে কেবল কাপড় নয়, যন্ত্রপাতিরও ক্ষতি হচ্ছে।”
গোল্ডলাইফ স্পিনিং ফ্যাক্টরির মালিক মঈনুদ্দিন আহমেদ শিপনের ভাষ্য, গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিদ্যুৎ থাকলেও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। আবার বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকে, এতে আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে।
গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা ডিজেল বা এলপিজি ব্যবহার করে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করছে। তবে এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। শিল্পমালিকদের হিসাবে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতে প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় ১৪ থেকে ১৫ টাকা হলেও ডিজেল ব্যবহার করলে তা প্রায় ৩৪ টাকায় পৌঁছে যায়। তবু বিকল্প জ্বালানিতে প্রয়োজনীয় উৎপাদন সক্ষমতা সব সময় নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
বাংলাদেশ গামের্ন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, “উৎপাদন মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিকদের অনেক সময় নির্ধারিত কর্মঘণ্টার পরও কারখানায় অপেক্ষা করতে হয়। এতে তাদের কাজের সময়সূচি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।”
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, “ভিয়েতনামের মতো প্রধান রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের নিটওয়্যার শিল্প এমনিতেই চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তার ওপর গ্যাসসংকট উৎপাদন পরিকল্পনাকেই প্রায় অচল করে দিয়েছে।”
শিল্পমালিকরা দ্রুত শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত গ্যাসচাপ নিশ্চিত এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, গত ২১ জুলাই মহেশখালীর উপকূলে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনরায় গ্যাসীকরণ ইউনিটে (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। এরপর থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে শিল্পকারখানার উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে।