বাঁচানো গেলো না যানজটের কারণে সড়কে জন্ম নেওয়া শিশুটিকে

ঢাকার সাভারে সড়কের বিশৃঙ্খলায় সৃষ্ট যানজটে সড়কেই জন্মানো নেওয়া নবজাতক শিশুটির চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। 

মঙ্গলবার (৪ঠা আগস্ট) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সাভারের বেসরকারি হাসপাতাল সুপার মেডিকেল হসপিটাল (প্রা:) লিমিটেডের এনআইসিইউ’তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়।

নবজাতকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে সুপার মেডিকেল হসপিটালের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. খন্দকার আকাশ বলেন, “শিশুটি মূলত প্রিম্যাচিউর ছিল। গর্ভে তার বয়স হয়েছিল ২৮ সপ্তাহ এবং ওজন ছিল মাত্র এক কেজির মত। ২৮ সপ্তাহ আসলে কোনো নবজাতকের পূর্ণ বিকাশের জন্য যথেষ্ঠ নয়। শিশুটির ফুসফুসও পরিপক্ক ছিল না। আমাদের এখানে আসার পর আমরা শিশুটিকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া থেকে শুরু করে সব ধরনের চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু বারবার শিশুটি শ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছিল। সর্বশেষ আজ সকালে শিশুটির মৃত্যু হয়।”

এই চিকিৎসক আরও জানান, হাসপাতালের বাহিরে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধান ছাড়া কোনো শিশুর জন্মের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। এই শিশুটির ক্ষেত্রে যেটি হয়েছে যে সড়কে ডেলিভারি হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে যেসব সাপোর্ট তার দরকার ছিল, বিশেষ করে শিশুকে কান্না করানো বা অন্যান্য সাপোর্ট সেটি কিন্তু সে পায়নি, যেটি বাড়তি জটিলতা যুক্ত করেছে।

নবজাতকের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, শিশুটির মরদেহ নিয়ে তার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। 

গত ২রা আগস্ট সন্ধ্যায় ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকানপাট, উল্টোপথের যানবাহনসহ বিশৃঙ্খল সড়কে তীব্র জ্যামে আটকা পড়ার কারণে সড়কেই ভূমিষ্ট হয় শিশুটি।

শিশুটির বাবা ও ভুক্তভোগী নারীর স্বামী পোশাককর্মী মো. আমীর হামজা জানান তিনি সাভারের উলাইলে অবস্থিত ডেনিটেক্স লিমিটেড নামক একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত রয়েছেন।

তিনি বলেন, “গত ২ আগস্ট দুপুরে কারখানায় কর্মরত থাকা অবস্থায় সর্বপ্রথম মুঠোফোনে তার স্ত্রী তাকে পেটে ব্যথার কথা জানান। পরবর্তীতে স্ত্রীর অসুস্থতার কথা জানার পর তিনি কারখানার লাইন চিফের নিকট ছুটি চাইলে লাইন চিফ তাকে ছুটি দিতে অসম্মতি জানান। পরবর্তীতে কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানালে বিকেল ৫টা নাগাদ ছুটি নিয়ে বাসায় যান তিনি।”

আমীর হামজা বলেন, “বাসায় ফেরার পর স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা দেখে দ্রুত তাকে ডাক্তার দেখাতে ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাকে একটি রিকশায় উঠিয়ে সাভারের শিমুলতলা এলাকায় অবস্থিত একটি ডায়াগনস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টারে নিয়ে যাই। ততক্ষণে তার ব্যথা আরও তীব্র হয়। এ সময় তার এই পরিস্থিতি দেখে সেখানকার দায়িত্বরতরা তাকে দ্রুত একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলে পরবর্তীতে আবারও তাকে রিকশায় উঠিয়ে আমরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগরগামী সার্ভিস লেন ধরে উল্টোপথে কাছেই অবস্থিত সুপার মেডিকেল হসপিটালে উদ্দেশ্যে রওনা হই। পথে আমাদের রিকশা সাভার বাসস্ট্যান্ডের সিটি সেন্টারের সামনে এলে সেখানে তীব্র যানজট থাকায় আমরা আর এগোতে পারছিলাম না। ওখান থেকে হাসপাতালের দূরত্ব মাত্র দুই মিনিটের পথ হলেও সেখানেই আমাদের  ১০ থেকে ১৫ মিনিট আটকে থাকতে হয়। ততক্ষণে আমার স্ত্রীর অবস্থা আরও গুরুতর হয়ে পড়ে। এ সময় স্থানীয়দের সহযোগিতা চেয়েও পাইনি।”

“এমন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেই যে, তাকে (রাজিয়া খাতুন) কাঁধে করেই হাসপাতালে নিয়ে যাব। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি ও আমার সঙ্গে থাকা এক আত্মীয়া মিলে তাকে ধরে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রচণ্ড প্রসবব্যথা ও যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে সেখানেই তিনি সন্তান প্রসব করেন এবং সন্তান প্রসবের পরপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন,” যোগ করেন হামজা।

হামজা বলেন, “এ ঘটনার পর কেউ একজন একটি চাদর দিলে সেটি দিয়েই তাকে ঢেকে রেখে আমি দৌড়ে সুপার মেডিকেলে গিয়ে সেখানকার দায়িত্বরতদের বিষয়টি জানালে মেডিকেলের লোকজন দ্রুত স্ট্রেচার নিয়ে গিয়ে হাতে হাতে আমার স্ত্রীকে সড়ক থেকে হাসপাতালে নিয়ে এসে ভর্তি করে।”

“এমন একটি দেশে বসবাস করি, যেখানে এমন জরুরি পরিস্থিতিতেও একজন মুমূর্ষু রোগী নিয়ে সড়কে বিশৃঙ্খলার কারণে সময়মতো হাসপাতালে যাওয়া যায় না। এর চেয়ে দুঃখজনক কিছু হতে পারে না। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয়, শত শত মানুষ সেখানে আমাদের এমন অসহায়ত্ব দেখেও কেউ এগিয়ে আসছিল না আমাদের হাসপাতালে পৌঁছাতে সহযোগিতা করতে,” বলেন হামজা।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী সাহারা আক্তার লিমা বলেন, “আমি সেদিন আমার বিড়ালের খাবার কিনতে সাভারে যাই, সেখানে গিয়ে রাজ্জাক প্লাজা ও সিটি সেন্টারের মাঝামাঝি সড়কের পাশে ফুটপাতে মানুষের জটলা দেখে এগিয়ে গিয়ে দেখি ফুটপাতের কংক্রিটের উপর ওই নারী পড়ে রয়েছেন। ক্রমশ তার অবস্থা ক্রিটিকাল হচ্ছিল এবং এক পর্যায়ে সেখানেই তার ডেলিভারি হয়। পরে তার স্বামী হাসপাতাল থেকে স্ট্রেচার ও লোকজন নিয়ে আসার পর ওই নারী ও নবজাতক শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।”

“দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে সেখানে এত মানুষ উৎসাহী হয়ে সেখানে ভিড় করলেও সহযোগিতার জন্য কেউ এগিয়ে আসছিল না”, যোগ করেন লিমা।

এ বিষয়ে জানতে বিজিএমই এর ওয়েবসাইটে থাকা ডেনিটেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া তাহেরের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়। 

এছাড়া আজ দুপুর ৩টার দিকে কারখানাটির ব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও এইচআর) মি. আদিলের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি অবগত নন জানিয়ে খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলে জানান। যদিও পরবর্তীতে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত একাধিকবার তার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি।

সুপার মেডিকেল হসপিটালের ব্যবস্থাপক মো. আসিফ হামজা বলেন, “খবরটি জানার পর আমি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের লোকজনকে স্ট্রেচারসহ পাঠিয়ে নবজাতকসহ ওই নারীকে উদ্ধার করে আমাদের হাসপাতালে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। সে সময়ও ওই নারীর প্লাসেন্টা যুক্ত ছিল। পরে আমাদের দায়িত্বরত চিকিৎসক প্লাসেন্টা রিমুভ করেন এবং শিশুটি প্রিম্যাচিউর হওয়ায় তাকে এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে আজ সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়।

হাসপাতালটির আরেক ব্যবস্থাপক মো. হুমায়ন কবির বলেন, “ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে রোড ডিভাইডার দিয়ে ডেডিকেটেড হাইওয়ে পৃথক করে দেওয়ার পর থেকেই মানুষের ভোগান্তি আরও তীব্র হয়েছে। কাছাকাছি কোথাও ইউটার্নের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক পথ ঘুরে মানুষকে তার গন্তব্যে যেতে হয়। অন্যদিকে সার্ভিস লেনগুলো ফুটপাতের অবৈধ দোকানপাট, অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে থাকায় এবং উল্টোপথের যানবাহন, বিশেষ করে অটোরিকশার কারণে সড়কে এত বিশৃঙ্খলা হয় যে, দুই মিনিটের পথ অতিক্রম করতে ঘণ্টাও অপেক্ষা করতে হয়। যদিও বিষয়টি সমাধানে কোনো উদ্যোগই চোখে পড়ছে না। গতকালের ঘটনাটি হয়তো রেয়ার কেস, তবে এতে মানুষের ভোগান্তি কোন পর্যায়ে রয়েছে, সেটি আরও স্পষ্ট হয়েছে।”