গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’ উত্থাপন

গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে “গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬।” একই দিন ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন প্রণয়নের একটি বিল এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের আরেকটি বিলও তোলা হয়। বিল তিনটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে পাঠানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও গুম-সংক্রান্ত বিল উত্থাপনের সময় ওয়াকআউট করেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা।

বেসরকারি সদস্যদের প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর আইন প্রণয়ন কার্যক্রম শুরুর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়ে কথা বলেন এবং সংস্কার পরিষদ গঠন না হওয়ার কড়া সমালোচনা করেন। এরপর তিনি ওই দুটি বিল উত্থাপন পর্বে অংশ না নেওয়ার কথা জানিয়ে রাত ৮টা ৬ মিনিটে ওয়াকআউট করেন এবং পরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উত্থাপিত এই বিলে গুমকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। কোনো সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কাউকে গ্রেপ্তার-আটক করে তা অস্বীকার করলে বা অবস্থান গোপন রাখলে তা গুম হিসেবে গণ্য হবে।

মূল বিধানগুলো:

  • গুমে মৃত্যু ঘটলে, মরদেহ পাওয়া গেলে বা পাঁচ বছরেও সন্ধান না মিললে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড
  • তল্লাশি পরোয়ানা, অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্যতা ও সাক্ষী-ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিধান
  • ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ তহবিল; দণ্ডিতের সম্পত্তি থেকে আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ
  • নিখোঁজ ব্যক্তির স্ত্রী-সন্তানদের ভরণপোষণে সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ, পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকার বণ্টনে গুম সনদ প্রদান
  • তদন্ত ও বিচার সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে সম্পন্নের বাধ্যবাধকতা; মিথ্যা অভিযোগে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড
  • অভিযুক্ত বাহিনী নিজেই নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না; প্রয়োজনে ভিন্ন বাহিনী বা আন্তবাহিনী দল তদন্ত করবে
  • দায়রা জজ আদালতে বিচার, অভিযোগ গঠনের ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি (প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন), আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত হলে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে প্রেরণ


আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের উত্থাপিত এই বিলে ২০০৯ সালের আইন রহিত করে কমিশনের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে। চেয়ারপারসন ও কমিশনার নিয়োগে সুপারিশের জন্য গঠিত হবে স্পিকারের নেতৃত্বাধীন বাছাই কমিটি, যাতে থাকবেন আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি-বিরোধী দলের একজন করে সাংসদ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ইউজিসি মনোনীত অধ্যাপক ও দুই নাগরিক প্রতিনিধি। শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগে কমিশন প্রতিবেদন চাইতে পারবে এবং অসন্তুষ্ট হলে সুপারিশ দেবে, যার জবাব ৪৫ দিনের মধ্যে জানাতে হবে।

আইনমন্ত্রীর উত্থাপিত এই বিলে ১৮৮২ সালের আইন সংশোধন করে বলা হয়েছে, বাবা-মা বা দাদা-দাদি সন্তান বা নাতি-নাতনিকে (কিংবা উল্টোক্রমে), অথবা স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে সম্পত্তি দান করলে দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত তা ভোগ করতে পারবেন। দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে সম্পত্তি আইন অনুযায়ী গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে হস্তান্তরিত হবে।