রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘে পাঁচ প্রস্তাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও স্থায়ী সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রস্তাবগুলো হলো নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের রোডম্যাপ প্রণয়ন, মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।

বুধবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে তিনি এ প্রস্তাব তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল “দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: এ রিনিউড কল ফর এ ডিউরেবল সল্যুশন ফ্রম প্রোট্র্যাক্টেড ডিসপ্লেসমেন্ট, উইথ জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি”।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার পর সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে।”

তিনি বলেন, “দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে শুধু রোহিঙ্গারাই নয়, কক্সবাজারের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীও সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপে পড়েছে। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও হতাশা মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসীপাচার, মাদকপাচারসহ নানা আন্তঃদেশীয় অপরাধের নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।”

মানবিক সহায়তা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রয়োজন বাড়লেও সহায়তা কমছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা চাওয়া হলেও ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলার করা হয়েছে।” এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। আবার অনির্দিষ্টকাল শুধু বাংলাদেশের ওপর এই দায়িত্ব চাপিয়ে রাখাও যায় না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।” তবে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনুকূল নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পাঁচ দফা প্রস্তাব

১. প্রত্যাবাসন রোডম্যাপ: রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা করতে হবে এবং নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারের ভেতরে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে।

২. সহিংসতা বন্ধ ও অধিকার নিশ্চিত: রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে তারা আস্থা ফিরে পান।

৩. মানবিক সহায়তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমর্থন: রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা দিতে হবে, যেন তাদের উদার আতিথেয়তার কারণে উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা বাধাগ্রস্ত না হয়।

৪. ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি: টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের চেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের জন্য প্রধানমন্ত্রী কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ভূমিকাও স্বীকার করেন এবং বলেন, আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্ত ব্যবস্থাগুলোকে অব্যাহত সহায়তা দিতে হবে। গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

৫. আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন: এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়া মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত থাকুক। তারা যেন নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরতে পারেন, সেটিই বাংলাদেশের লক্ষ্য।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করেছে, এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ় প্রত্যয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশ প্রত্যাবাসনে সহায়তা করতে প্রস্তুত থাকবে।”