ক্ষুধা জয় করে বিচারক হওয়ার পথে কাজল পাঁড়ে

একসময় অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সংসারে খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না, পান্তা ভাত খেয়েই কেটেছে দিনের পর দিন। ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে কৃষক বাবাকে ছুটতে হয়েছে এক জেলা থেকে আরেক জেলায়, শ্রমিকের কাজের খোঁজে। তাতেও না কুলালে বিক্রি করতে হয়েছে গরু। সেই অভাবের সংসার আর খাস পুকুরপাড়ের ঘর থেকে উঠে আসা কাজল পাঁড়ে এখন বিচারক হওয়ার পথে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মাধাই গ্রামের ২৯ বছর বয়সী কাজল ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সিভিল জজ (সহকারী জজ) হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। ২০০ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর মধ্যে তার অবস্থান ১৪০তম।

সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়তেই মাধাই গ্রামে উৎসবের আমেজ। রাজশাহী থেকে বাড়ি ফেরার সময় গ্রামের শিক্ষার্থীরা ফুলের মালা দিয়ে তাকে বরণ করে নেয়। মা পঞ্চমী জেড়ি ও বড় বোনসহ পরিবারের সদস্যদের চোখে তখন আনন্দাশ্রু। প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও ছুটে আসেন অভিনন্দন জানাতে। কাজলের কাছে এটি কেবল একটি চাকরি নয়, আট বছরের স্বপ্ন, অগণিত নির্ঘুম রাত, অভাবের সঙ্গে লড়াই আর বাবা-মায়ের ত্যাগের ফল।

গত বুধবার সন্ধ্যায় এক বন্ধুর ফোনে বিজেএস পরীক্ষার ফল প্রকাশের খবর পান কাজল। পরে ওয়েবসাইটে তালিকায় ১৪০তম স্থানে নিজের নাম দেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকেন তিনি।

কাজল বলেন, “আমার আট বছরের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার দিনই স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমি বিচার বিভাগের ক্যাডার হব। সাফল্যের খবর পাওয়ার পর প্রথমেই মনে হয়েছে, এই পথের পেছনে অনেক ত্যাগ, হতাশা আর কান্না জমা হয়ে আছে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় টিউশনি করে নিজের খরচ নিজেই চালিয়েছেন তিনি। প্রয়োজনে পরিবারকেও সহায়তা করেছেন।

কাজল তুরি জনগোষ্ঠীর “পাঁড়ে” পদবির মানুষ। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট এবং পরিবারের একমাত্র ছেলে। ছোটবেলায় পরিবার ও সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে মাতৃভাষায় কথা বলেই বড় হয়েছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বদলে যায় পরিচিত পরিবেশ। শিক্ষক ও সহপাঠীরা কথা বলতেন বাংলায়, শুরুতে অনেক কথাই বুঝতে পারতেন না তিনি।

কাজল বলেন, “প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখি সবাই বাংলা কথা বলছে। আমার মাতৃভাষায় কথা বলেই আমি অভ্যস্ত ছিলাম। শিক্ষক ও সহপাঠীদের কথা বুঝতে শুরুতে সমস্যা হতো।”

ধীরে ধীরে বাংলা আয়ত্ত করে পড়াশোনায় মনোযোগ দেন তিনি। কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছিল আরও বড় বাধা, অভাব।

কাজলের বাবা নরেশ পাঁড়ে কৃষিকাজ করেন। কিন্তু এলাকায় সারা বছর কাজ থাকে না। ছেলের পড়ার খরচ জোগাতে তাঁকে নড়াইল, খুলনা ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় গিয়ে শ্রমিকের কাজ করতে হয়েছে। কখনো গরুও বিক্রি করেছেন।

নরেশ পাঁড়ে বলেন, “হামাদের কী যে আনন্দ হোইছে, কহিতে পারবো না। হামাদের বেটা যানি অনেক বড় হইয়া গরিবের উপকারে লাগে। বেটার জন্যি বুক গর্বে ফুলে উঠিছে।”

কাজলের ছোট বোন স্বপ্নার মনে এখনো জ্বলজ্বল করছে পরিবারের সেই কষ্টের দিনগুলো। উচ্চমাধ্যমিকের পর কাজল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কথা জানালে পরিবারের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। এত দরিদ্র পরিবারের পক্ষে ছেলেকে রাজশাহী শহরে রেখে পড়ানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বপ্না বলেন, “আমরা ভাইকে বলেছিলাম, আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা কোথায় পাব? রাজশাহী গিয়ে পড়তে হবে না। তখন ভাই বলেছিল, “দিদি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে আমার টাকা লাগবে না।”

কাজল কথা রেখেছেন। টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন, অভাবের দিনগুলোতেও থামেননি।

স্বপ্না বলেন, “কত দিন আমরা পান্তা ভাত খেয়ে দিন পার করেছি। আজ আমার ভাই জজ হওয়ার পথে। এতে আমরা খুব খুশি।”

২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন কাজল। সেখান থেকে আইনে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু করেন জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি। দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষা, চেষ্টা ও অনিশ্চয়তার পর সেই স্বপ্ন এখন বাস্তবের দোরগোড়ায়।

বাড়ি ফেরার দিন কাজলকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেয় গ্রামের শিক্ষার্থীরা। সঙ্গে ছিলেন মা পঞ্চমী জেড়ি ও বড় বোন কল্পনা পাঁড়ে।

গ্রামের প্রবীণ জরাধন পাঁড়ে (৭০) আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আনন্দেতে কান্দন আসছে রে ভাই। এ রকম জাগাতে হামাদের জাতিগোষ্ঠীর আর কেহু যাইতে পারিনি।”

মাধাই গ্রামের মোড়ল নিরঞ্জন তিরকি বলেন, “কাজলের সাফল্য গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় উৎসাহ জোগাবে।“

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক বিভূতিভূষণ মাহাতো বলেন, “তুরি জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাজল পাঁড়েই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় ভর্তি হয়েছেন।“ তার ভাষ্য, “উত্তরবঙ্গের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও কাজলই প্রথম জুডিশিয়াল সার্ভিসে সুপারিশপ্রাপ্ত হলেন।“

যে পরিবার নিজের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেয়েও সন্তানের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেই পরিবারের সন্তান এখন মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের দায়িত্ব নেওয়ার অপেক্ষায়।

মাধাই গ্রামের খাস পুকুরপাড়ের ঘর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সেখান থেকে জুডিশিয়াল সার্ভিস, কাজলের এ পথচলা তাই শুধু তার একার নয়। এটি বাবা-মায়ের ত্যাগেরও জয়। গ্রামের ছোট শিক্ষার্থীদের জন্য এটি এক নীরব বার্তা: অভাব হয়তো পথ আটকে দিতে পারে, কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে সেই পথ পেরোনো সম্ভব।