ঢাকার আশুলিয়ায় তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে নবজাতকসহ তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার মূল আসামি মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়ের বিরুদ্ধে আগেও দুটি হত্যা মামলার তথ্য পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ এ তথ্য জানান।
তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন তিনি। এ সময় আশপাশের লোকজনের সঙ্গেও কথা বলেন।
পরিদর্শন শেষে এম এন মোর্শেদ জানান, মনিরুজ্জামান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “মনিরুজ্জামানের চলাফেরার বিভিন্ন তথ্য ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে। ঘটনার আগে ও পরে তিনি যাদের সঙ্গে যোগাযোগ বা দেখা করেছেন, তাদের বিষয়ে তথ্য যাচাই চলছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষী হিসেবে তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করারও চেষ্টা করা হচ্ছে।“
পিবিআই জানায়, পূর্বের মামলার নথি এবং মনিরুজ্জামানের পিসিপিআর (পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও পূর্ব অপরাধের রেকর্ড) যাচাই করে তার বিরুদ্ধে আগের দুটি হত্যা মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ফরিদপুরের নগরকান্দায় স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় তিনি কারাগারে ছিলেন এবং পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হন।
এরপর ২০২২ সালে আশুলিয়া থানায় গণধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়। সেই মামলাতেও তিনি আসামি ছিলেন এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে পিবিআই। পরে ওই মামলাতেও তিনি জামিন পান।
পুলিশ সুপার বলেন, “আগের দুই মামলায় জামিনে বেরিয়ে আবারও মনিরুজ্জামান হত্যাকাণ্ডে জড়িয়েছেন, এ বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে”। তিনি আরও বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি তথ্য প্রমাণ এমনভাবে উপস্থাপন করতে, যাতে একটি পূর্ণাঙ্গ অভিযোগপত্র আদালতে দেওয়া যায়। এর মাধ্যমে মামলার বিচার নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম হয়।”
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের কারণ জানতে চাইলে এম এন মোর্শেদ বলেন, “হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রত্যক্ষ বা পারিপার্শ্বিক সাক্ষীদের বক্তব্য যাচাই করা হচ্ছে। তাদের অবস্থান ও চলাফেরা সংক্রান্ত কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতেও কিছু তথ্য মিলেছে। এসব তথ্য ঘটনাস্থলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।“
তিনি বলেন, “ক্লুলেস হত্যা মামলার তদন্তে ঘটনাভেদে হত্যার কারণ ও প্রেক্ষাপট আলাদা হয়। এই মামলাতেও হত্যাকাণ্ডের পেছনের সম্পর্ক ও ঘটনাপ্রবাহ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।“
পিবিআই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত নাজমার সঙ্গে মনিরুজ্জামানের আগে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। নাজমার দ্বিতীয় বিয়ের আগে তারা পাশাপাশি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন এবং তখন থেকেই তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি আরও বলেন, “অন্যান্য হত্যা মামলায় কখনো অটোরিকশা ছিনতাই বা লাভের উদ্দেশ্যে চালককে হত্যা, কখনো মাদকসংক্রান্ত বিরোধ, আবার কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের জেরে হত্যার ঘটনা পাওয়া যায়। তাই প্রতিটি মামলার প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে তদন্ত করতে হয়।“
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার জানান, এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বাড়িওয়ালার অসতর্কতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। তার ভাষ্য, বাড়িওয়ালা শুধু মুখের কথায় বাসা ভাড়া দিয়েছিলেন, ভাড়াটিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্রের কোনো কপি রাখেননি। ফলে শুরুতে ওই ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করতে তদন্তকারীদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
এম এন মোর্শেদ বলেন, “বাড়িওয়ালারা ভাড়াটিয়ার পরিচয়পত্র যাচাই করে কপি সংরক্ষণ করলে এ ধরনের ঘটনার তদন্ত দ্রুত করা সম্ভব। ভাড়াটিয়ার পরিচয় নথিভুক্ত থাকলে অপরাধ ঘটানোর ক্ষেত্রেও একধরনের নিরুৎসাহ তৈরি হতে পারে।“
তিনি বলেন, “অপরাধ প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। বাড়িওয়ালা, গণমাধ্যমকর্মীসহ সমাজের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব আছে। ভাড়াটিয়ার পরিচয় নিশ্চিত করে বাসা ভাড়া দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট থানায় পরিচয়পত্রের কপি দেওয়া উচিত।"